সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে জড়ো হচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।

এসসিও প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুই দিনের এই সম্মেলন সোমবার শুরু হচ্ছে। এমন এক সময়ে সম্মেলনটি হচ্ছে, যখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও অর্থনীতির বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও চলছে।

 

সম্মেলনে মূলত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলো বিশ্বে বহুমুখী শক্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করতে পারে।

কারা অংশ নিচ্ছেন

এবারের সম্মেলন বিশকেকে ‘টেকসই শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে’, এই স্লোগানকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শি চিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন, নরেন্দ্র মোদি ও ইরানের প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, বেলারুশ, কাজাখস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।

 

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং আসিয়ান মহাসচিব কাও কিম হর্নও সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, চলমান যুদ্ধগুলো আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর আরো চাপ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে এসসিও সম্মেলন চীন ও ভারতের মতো উদীয়মান শক্তিগুলোর জন্য নিজেদের আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়ানো এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা গভীর করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, বহু বছর ধরে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে চীন বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

 

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, শুরুতে এসসিওর কাজের পরিধি সীমিত ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সদস্য দেশগুলো সংস্থাটির কার্যক্রম ও সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে চলমান সংঘাতের মধ্যে এবারের সম্মেলনকে চীন নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করেন ইয়াং। তার মতে, চীন নিজেকে এমন একটি শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইবে, যারা সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে নিজেদের পার্থক্যও তুলে ধরতে পারে চীন।

তবে ইয়াং মনে করেন, এসব উদ্যোগ মূলত বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। সংঘাত সমাধানে বড় কোনো বাস্তব পদক্ষেপ বা প্রস্তাব আসার সম্ভাবনা কম।

ফরাসি বিনিয়োগ ব্যাংক ন্যাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, এসসিওর ২৫ বছর পূর্তি হওয়ায় এবারের সম্মেলন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল। এবার সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, একই বৈঠকে মোদি, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও চীনের সীমান্ত নিয়ে আলোচনা এখনও চলছে। পাশাপাশি মোদি ও পুতিনের মধ্যে আলাদা বৈঠকও হওয়ার কথা রয়েছে।

তার মতে, এসব বৈঠকের মাধ্যমে বোঝা যাবে ভারত-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক উন্নতি কতটা এগিয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর না করে ইউরেশিয়ার দেশগুলো নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও বাণিজ্য নিয়ে কীভাবে নিজেদের সহযোগিতা বাড়াতে চায়, সেটিও স্পষ্ট হতে পারে।

এসসিও কী, কী নিয়ে আলোচনা হবে?

সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসএসসিও) ১৯৯৬ সালে ‘সাংহাই ফাইভ’ নামে যাত্রা শুরু করে। চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান মিলে এটি গঠন করেছিল।

২০০১ সালে উজবেকিস্তান যোগ দেওয়ার পর জোটটির নাম হয় এসসিও। পরে ভারত ও পাকিস্তান ২০১৭ সালে, ইরান ২০২৩ সালে এবং বেলারুশ ২০২৪ সালে পূর্ণ সদস্য হয়। সংস্থাটির সদর দপ্তর চীনের বেইজিংয়ে। এসসিওর সদস্য দেশগুলোতে বিশ্বের প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ বাস করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ২৩ শতাংশ তাদের দখলে। শুরুতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করলেও এখন বাণিজ্য, অর্থনীতি, পরিবহন ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করছে এসসিও। 

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বা পশ্চিমাবিরোধী জোট নয়। বরং সদস্য দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থান শক্ত করার জন্য এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে।

এবারের সম্মেলনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আফগানিস্তানের পরিস্থিতি গুরুত্ব পাবে। ভারত-চীন ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও নতুন পরিবহনপথ নিয়েও আলোচনা হবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

ভারত, ইরান ও রাশিয়াকে যুক্ত করা আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর এবং আর্কটিক অঞ্চলের নর্দার্ন সি রুট নিয়েও আলোচনা হতে পারে। এসসিও ইউরেশিয়াজুড়ে পণ্য পরিবহন সহজ করতে নতুন পরিবহন নেটওয়ার্ক ও ‘সিল্ক রোড স্টেশন’ তৈরির পরিকল্পনাও এগিয়ে নিতে চায়।

এসসিও কি সব বিষয়ে একমত হতে পারে?

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সদস্য দেশগুলো সব আন্তর্জাতিক বিষয়ে একমত নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া বেশিরভাগ সদস্য দেশের সমর্থন পেলেও ভারত ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। দেশটি ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেলও কিনছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। রাশিয়ার কর্মকর্তা ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, কৃষ্ণ সাগরের পরিস্থিতি ও ইউক্রেন যুদ্ধ বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে এসসিও তুলনামূলকভাবে একক অবস্থান নিয়েছে। মার্চে সংস্থাটি ইরানের বিরুদ্ধে হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছিল, আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা উচিত।

ভারত অবশ্য ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়ে এসসিওর একটি যৌথ বিবৃতিতে সমর্থন দেয়নি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পুতিনের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। রাশিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। অন্যদিকে চীন ইরানের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক অংশীদার এবং দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনে থাকে।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে। কাশ্মীরসহ সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে দুই দেশ একে অপরকে দায়ী করে আসছে। গত বছরের তিয়ানজিন সম্মেলনে এসসিও ভারত ও পাকিস্তান, দুই দেশের সন্ত্রাসী হামলারই নিন্দা জানিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছিল।