শিব্বীর আহমেদ, জাতিসংঘ, নিউ ইয়র্ক: গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য সত্য, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। রোববার আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান নির্ধারণ এবং তাদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানে রাষ্ট্রগুলোর প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রতিবছর ৩০ আগস্ট দিবসটি পালিত হয়। এদিন গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করার পাশাপাশি তাদের পরিবার ও স্বজনদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, যন্ত্রণা এবং ন্যায়বিচারের দাবির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, গুমের ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়; এর প্রভাব পুরো পরিবার ও সমাজের ওপর পড়ে। কোনো ব্যক্তিকে আটক বা অপহরণের পর তার অবস্থান বা ভাগ্য সম্পর্কে তথ্য গোপন করা হলে পরিবারের সদস্যরা বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তিই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হওয়ায় পরিবারগুলো অর্থনৈতিক সংকটেও পড়ে।

২০ বছর পূর্ণ হলো আন্তর্জাতিক কনভেনশনের

২০২৬ সালের দিবসটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এ বছর International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance বা গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন গ্রহণের ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর এই কনভেনশন গ্রহণ করে। পরে ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর এটি কার্যকর হয়। কনভেনশনটি গুম প্রতিরোধ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, ভুক্তভোগীদের অধিকার রক্ষা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য একটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো তৈরি করে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা বলছে, কনভেনশনটি গুম প্রতিরোধ ও নির্মূলের জন্য বিশেষভাবে নিবেদিত একমাত্র বৈশ্বিক চুক্তি। এতে ভুক্তভোগীদের সত্য জানার অধিকার, ন্যায়বিচার ও প্রতিকারের বিষয়টি কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

গুম: গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন

আন্তর্জাতিক আইনে গুম বলতে সাধারণত রাষ্ট্রের কর্মকর্তা বা রাষ্ট্রের অনুমোদন, সমর্থন কিংবা সম্মতির সঙ্গে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণের পর তার আটক বা অবস্থান স্বীকার না করা কিংবা তার ভাগ্য ও অবস্থান গোপন করাকে বোঝায়। এর ফলে ভুক্তভোগী আইনের সুরক্ষা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। একই সঙ্গে তার পরিবার সত্য জানার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়।

জাতিসংঘ বলছে, গুমের ঘটনা একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার, নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকার অধিকার, জীবনের অধিকার, আইনের কাছে ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতির অধিকার এবং কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার অধিকারসহ একাধিক মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে।

পরিবারের অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা

গুমের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবগুলোর একটি পড়ে ভুক্তভোগীর পরিবারে। স্বজনরা জানেন না তাদের প্রিয় মানুষটি জীবিত নাকি মৃত, কোথায় আছেন কিংবা কী অবস্থায় আছেন। জাতিসংঘের মতে, এই অনিশ্চয়তা পরিবারগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা তৈরি করে। অনেক পরিবার বছরের পর বছর তাদের স্বজনের সন্ধান চালিয়ে যায় এবং সত্য জানার অপেক্ষায় থাকে। জাতিসংঘের গুম ও জোরপূর্বক নিখোঁজ বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এমন মামলার তথ্য গ্রহণ করে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান নির্ধারণে সহায়তার জন্য কাজ করে।

জাতিসংঘের আহ্বান

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে কেন্দ্র করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। জাতিসংঘের বার্তা হলো—গুমের কোনো ঘটনা যেন অমীমাংসিত অবস্থায় থেকে না যায়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, সত্য উদঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রগুলোকে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।