শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক — ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তার অভিযোগে রাশিয়ার অন্যতম বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভিটিবি ব্যাংকের (VTB Bank) বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (ওএফএসি) এ পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ভিটিবি ব্যাংককে ইরানের আর্থিক খাতে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। ব্যাংকটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপন করেছিল বলেও অভিযোগ করেছে ওএফএসি।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে আর্থিক, প্রযুক্তিগত বা অন্যান্য সহায়তা দিয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সহায়তা করে—এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সহযোগীদের শনাক্ত, প্রকাশ্যে চিহ্নিত এবং বিচ্ছিন্ন করার কথাও জানান তিনি।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, ভিটিবির বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে নির্বাহী আদেশ ১৩৯০২-এর আওতায়। ওই আদেশের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত, বিশেষ করে দেশটির আর্থিক খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রয়েছে।
এর আগে রাশিয়ার আর্থিক খাতে কার্যক্রম এবং রুশ সরকারের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ভিটিবির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আলাদা নিষেধাজ্ঞা ছিল। নতুন পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকটি এখন ইরান ও রাশিয়া—দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আরও কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়ল।
ইরানের সঙ্গে ভিটিবির ব্যাংকিং সম্পর্ক
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ভিটিবি ব্যাংক ইরানে তার কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয় এবং দেশটির নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক ব্যাংকিং সম্পর্ক গড়ে তোলে।
ওয়াশিংটনের দাবি, ভিটিবি ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্যে রুশ রুবল ও ইরানি রিয়ালে পারস্পরিক লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করেছে। একই সঙ্গে ইরানের জব্দ থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদ স্থানান্তরের উদ্যোগেও ব্যাংকটির ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিটিবি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে তেহরানে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করে।
‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’
ইরানের অর্থনৈতিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ককে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় গত ২৪ আগস্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করে। এর লক্ষ্য ইরানের তেল বিক্রি, নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীকে অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক নেটওয়ার্কগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা। মার্কিন কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, ইরানের পক্ষে অর্থ পাচার বা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কাজে সহায়তা করা যেকোনো প্রতিষ্ঠান মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ওয়াশিংটন আরও বলেছে, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা অব্যাহত রাখা বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বাড়তি নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি করবে। ভিটিবির সঙ্গে যেসব বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখনো সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তাদের সেই সম্পর্ক দ্রুত ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।
ভিটিবির সম্পদ অবরুদ্ধ
নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বা মার্কিন নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভিটিবি ব্যাংকের সব সম্পদ ও সম্পদ-সংশ্লিষ্ট স্বার্থ অবরুদ্ধ হবে এবং সেগুলো সম্পর্কে ওএফএসিকে জানাতে হবে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তিরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ বা তার বেশি মালিকানা রাখলে সেই প্রতিষ্ঠানও সাধারণভাবে একই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা কোনো নির্দিষ্ট ছাড় না থাকলে মার্কিন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পদ, অর্থ বা সেবা নিয়ে লেনদেন নিষিদ্ধ থাকবে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্দিষ্ট লেনদেনের ক্ষেত্রে পরবর্তী পর্যায়ের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।
সোমবারের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ আরও বাড়াল ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে বিদেশি ব্যাংক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বার্তাও স্পষ্ট করেছে যুক্তরাষ্ট্র—ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ব্যবস্থায় সহায়তা করলে তার পরিণতি হতে পারে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্নতা।


