শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের অচলাবস্থা বা ‘শাটডাউন’ এড়াতে স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন বিলটিতে স্বাক্ষর করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর তিনি বিলটিতে স্বাক্ষর করার ফলে আগামী ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও কার্যক্রম চালু রাখার অর্থ নিশ্চিত হলো। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য সরকারি অচলাবস্থা এড়াতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের অনুমোদনের পর ট্রাম্প বিলটিতে স্বাক্ষর করেন।

১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে সরকারের অর্থায়ন

নতুন আইনের আওতায় ফেডারেল সরকারের বর্তমান ব্যয়ের কাঠামো ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর ফলে ১ অক্টোবর নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার পরপরই সরকারি অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত দূর হলো। মার্কিন সরকারের অর্থবছর শুরু হয় ১ অক্টোবর। কিন্তু নতুন অর্থবছরের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ বাজেট এখনো কংগ্রেস চূড়ান্ত করতে পারেনি। তাই সাময়িকভাবে আগের অর্থায়নের কাঠামোই বহাল রাখা হয়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদে ৩৭০-৪৮ ভোটে অনুমোদন

বিলটি ১ সেপ্টেম্বর প্রতিনিধি পরিষদে ব্যাপক দ্বিদলীয় সমর্থনে পাস হয়। ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ৩৭০টি এবং বিপক্ষে ৪৮টি। এর আগে ৮ আগস্ট মার্কিন সিনেটও বিলটি অনুমোদন করেছিল। ফলে প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদনের পর বিলটি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য হোয়াইট হাউসে যায়। ট্রাম্পের স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিলটি আইনে পরিণত হয়েছে এবং ফেডারেল সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আইনি ভিত্তি নিশ্চিত হয়েছে।

কেন প্রয়োজন হলো এই সাময়িক অর্থ বিল?

মার্কিন কংগ্রেস এখনো সরকারের পূর্ণ অর্থবছরের ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ১২টি পৃথক বরাদ্দ বিলের কোনোটিই পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি। এসব বরাদ্দের আওতায় রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, আবাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তাসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কার্যক্রম। ফলে ৩০ সেপ্টেম্বর বর্তমান অর্থায়নের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত না হলে ১ অক্টোবর থেকে সরকারের একাংশের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। নতুন সাময়িক বিল সেই ঝুঁকি আপাতত ঠেকিয়েছে।

চতুর্থ শাটডাউন এড়াতে চেয়েছে দুই দল

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বাজেট ও সরকারি নীতিকে ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দিয়েছে। এর ফলে এরই মধ্যে তিনবার আংশিক সরকারি অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যার সম্মিলিত স্থায়িত্ব ছিল ১৬১ দিন। এবার নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নতুন করে শাটডাউন হলে উভয় দলের জন্যই তা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারত।

সরকারি সেবা বন্ধ হওয়া, কর্মীদের বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার প্রভাব সরাসরি ভোটারদের ওপর পড়তে পারে। তাই নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় পক্ষই আপাতত শাটডাউনের ঝুঁকি এড়ানোর পথে হাঁটেছে।

নির্বাচনের আগে স্বস্তি, কিন্তু সংকট কাটেনি

নতুন আইন সরকারের তাৎক্ষণিক অচলাবস্থা ঠেকালেও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বাজেট সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং মূল বাজেট বিতর্ক এখন ডিসেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে। ফলে কংগ্রেসকে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ১২টি পূর্ণ অর্থবছরের বরাদ্দ বিল নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। নভেম্বরের ৩ তারিখের কংগ্রেস নির্বাচন এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নির্বাচনের পর প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে কোন দলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তার ওপর ডিসেম্বরের বাজেট আলোচনায় রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।

৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে মার্কিন ঋণ

সরকারি অর্থায়ন নিয়ে এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। ফলে সরকারি ব্যয়, ঋণের সুদ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে ওয়াশিংটনে উদ্বেগ বাড়ছে। সাময়িক অর্থ বিল এসব মৌলিক আর্থিক সমস্যার সমাধান করছে না; এটি মূলত সরকারি কার্যক্রম সচল রাখার জন্য সময় কিনে দিচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ও রাজনৈতিক ইস্যু

মার্কিন ভোটারদের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বর্তমানে বড় রাজনৈতিক ইস্যু। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, শুল্কনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব। এ অবস্থায় নতুন করে সরকারি শাটডাউন হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল উভয় দলের নেতাদের মধ্যে। সেই কারণেই নির্বাচন সামনে রেখে সরকার সচল রাখাকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছে।

ডিসেম্বরেই বড় পরীক্ষা

নতুন অর্থ বিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি সমস্যার সমাধান করেনি, শুধু সময় বাড়িয়েছে। ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে কংগ্রেসকে পূর্ণ অর্থবছরের সরকারি ব্যয়ের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। তা না হলে আবারও সরকারি অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে ডিসেম্বরের আলোচনার রাজনৈতিক পরিবেশ এখনই অনুমান করা কঠিন। কারণ তার আগে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের ফল কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিলে বাজেট আলোচনার সমীকরণও বদলে যেতে পারে।

আপাতত শাটডাউন নেই

ট্রাম্পের স্বাক্ষরের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার ১ অক্টোবরের অর্থসংকটের মুখে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেল। তবে ওয়াশিংটনের মূল বাজেট সংকট এখনো বহাল। ডিসেম্বরের সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসবে, ততই কংগ্রেসের ওপর পূর্ণ অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্ত করার চাপ বাড়বে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের স্বাক্ষরে শাটডাউন আপাতত ঠেকানো গেলেও বাজেট-রাজনীতির লড়াই শেষ হয়নি—শুধু ডিসেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে।