শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তা ও অস্ত্রের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার দেওয়া এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয় ভাগাভাগি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মিত্রদের মধ্যে নতুন করে বিতর্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, ইউক্রেন ও ন্যাটোকে যুক্তরাষ্ট্র যে বিপুল পরিমাণ সামরিক সহায়তা দিয়েছে, তার জন্য ইউরোপের দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থ ফেরত চাওয়া হবে। তাঁর দাবি, এই সহায়তার মূল্য শত শত বিলিয়ন ডলার এবং ইউরোপকে শুরু থেকেই এর অর্থ পরিশোধ করা উচিত ছিল। ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে আছে এবং মার্কিন অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

মার্কিন অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ

ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রের মজুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে মিত্র দেশগুলোর কাছে কিছু অস্ত্র বিক্রি সাময়িকভাবে সীমিত করা হলেও ভবিষ্যতে তা আবার শুরু হতে পারে বলে তিনি জানান।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এতে ওয়াশিংটনের সামনে একটি জটিল প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—একদিকে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক অভিযানের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র সংরক্ষণ করা।

ইউরোপকে কেন অর্থ দিতে বলছেন ট্রাম্প?

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা ও ন্যাটোর প্রতিরক্ষায় আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান সামরিক সহায়তাকারী। তবে ইউরোপও গত কয়েক বছরে বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও মানবিক সহায়তা দিয়েছে। ট্রাম্পের নতুন বক্তব্যের বিশেষত্ব হলো—তিনি শুধু ভবিষ্যতের সহায়তার ব্যয় ইউরোপের ওপর চাপানোর কথা বলছেন না; বরং অতীতে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক সহায়তা দিয়েছে, তার জন্যও পেছন থেকে অর্থ ফেরত নেওয়ার কথা বলছেন। এটি বাস্তবায়ন করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের আর্থিক দায়ভার নিয়ে বড় ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হতে পারে।

ইউক্রেনের জন্য কী অর্থ বহন করে?

ইউক্রেনের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য উন্নত অস্ত্রের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং ইউরোপকে ভবিষ্যতের সহায়তার বড় অংশের অর্থ বহন করতে হয়, তাহলে ইউক্রেনের জন্য ইউরোপীয় মিত্রদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ ট্রাম্পের বক্তব্যের ফলে ইউক্রেনকে সহায়তার দায়িত্ব ওয়াশিংটন থেকে আরও বেশি করে ইউরোপের দিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

ইউরোপ অবশ্য ইতোমধ্যে বড় ভূমিকা নিচ্ছে

তবে ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে সহায়তা করছে না—এমন চিত্রও সঠিক নয়। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউরোপের দেশগুলো সামরিক, আর্থিক ও মানবিক সহায়তায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেটও বাড়িয়েছে। এ ছাড়া ন্যাটোর মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থাও চালু হয়েছে, যেখানে ইউরোপীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কেনার অর্থ প্রদান করে এবং সেই অস্ত্র ইউক্রেনের কাছে পাঠানো হয়।

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বদলেছে এবং ইউরোপকে আরও বড় দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। ফলে ট্রাম্পের নতুন দাবি ইউরোপের কাছে সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা নয়, তবে অতীতের সহায়তার জন্য অর্থ ফেরত চাওয়ার বিষয়টি নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

শত শত বিলিয়ন ডলারের দাবি

ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে ইউক্রেন ও ন্যাটোকে দেওয়া মার্কিন সহায়তার মূল্য শত শত বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এই অঙ্কের মধ্যে ঠিক কোন কোন খাত অন্তর্ভুক্ত হবে, তা ট্রাম্প বিস্তারিতভাবে জানাননি। ইউক্রেন যুদ্ধসংক্রান্ত মার্কিন সরকারি ব্যয়ের সবটাই সরাসরি ইউক্রেনের হাতে দেওয়া অর্থ নয়। এর একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যয় হয়েছে, যেখানে ইউক্রেনে পাঠানো অস্ত্রের পরিবর্তে নতুন অস্ত্র উৎপাদন ও মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূরণ করা হয়েছে।

কংগ্রেসের বরাদ্দের হিসাবেও ইউক্রেন-সংক্রান্ত ব্যয়ের মধ্যে সামরিক সহায়তা ছাড়াও মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি, অস্ত্র উৎপাদন, লজিস্টিকস ও অন্যান্য খাত রয়েছে। তাই ট্রাম্প যে অর্থ ফেরতের কথা বলছেন, সেটি কীভাবে হিসাব করা হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ন্যাটো জোটে নতুন চাপ

ট্রাম্পের বক্তব্য ন্যাটোর ভেতরেও নতুন করে বোঝাপড়ার প্রশ্ন তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে ন্যাটোর সামরিক শক্তির প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা ব্যয়ও অনেক বেশি। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ইউরোপীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল এবং নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করে না। ইউক্রেন যুদ্ধ সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।

এখন ট্রাম্প যদি অতীতের মার্কিন সামরিক সহায়তার জন্যও ইউরোপকে অর্থ দিতে বলেন, তাহলে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামো এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব

ট্রাম্পের বৃহস্পতিবারের ঘোষণা ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ইরান সংঘাতের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের চাহিদা আরও বাড়বে। ফলে ইউক্রেনসহ অন্যান্য মিত্র দেশকে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। এই বাস্তবতা ইউরোপের ওপর আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের জন্য মার্কিন অস্ত্রের সরবরাহ কতটা অব্যাহত থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপের সামনে কঠিন সমীকরণ

ইউরোপীয় দেশগুলোর সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তা দেওয়া। দ্বিতীয়ত, নিজেদের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপ ইতোমধ্যেই প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে মার্কিন অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে সময় লাগবে। এ অবস্থায় ট্রাম্পের অর্থ ফেরতের দাবি ইউরোপীয় সরকারগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও আর্থিক চাপ আরও বাড়াতে পারে।

রাশিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

ওয়াশিংটন ও ইউরোপের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে মতপার্থক্য রাশিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মস্কো দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে ইউক্রেন ইস্যুতে বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপকে আরও বেশি আর্থিক ও সামরিক দায়িত্ব নিতে বাধ্য করে, তাহলে ইউরোপের দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করতে হবে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের সামরিক সহায়তায় কোনো বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে তা যুদ্ধক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

ট্রাম্পের বক্তব্যের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ইউরোপীয় দেশগুলো এই দাবি কীভাবে গ্রহণ করবে। তারা কি অতীতে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তার জন্য অর্থ ফেরতের নীতিতে সম্মত হবে, নাকি বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করবে—তা এখনো পরিষ্কার নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি ও সামরিক সহায়তার কাঠামো কীভাবে পরিবর্তিত হবে।

ইরান যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে মার্কিন অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেই ক্ষেত্রে ইউক্রেনের জন্য ইউরোপীয় অর্থায়ন এবং ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।

বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্ক

ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্য শুধু ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক হিসাব নিয়ে নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্কের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তার মিত্ররা নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও বেশি অর্থ ব্যয় করুক এবং মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরতা কমাক। ইউক্রেন যুদ্ধ সেই পরিবর্তনের গতি আরও বাড়িয়েছে।

ট্রাম্পের ভাষায়, ইউরোপকে এখন শুধু ভবিষ্যতের সহায়তার ব্যয় নয়, অতীতে যুক্তরাষ্ট্র যে সহায়তা দিয়েছে তার মূল্যও বিবেচনা করতে হবে। তবে এই দাবি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতিক্রিয়া এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের আলোচনার ওপর।

একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে, অন্যদিকে ইরান সংঘাত মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে ট্রাম্পের অর্থ ফেরতের দাবি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা সামরিক নিরাপত্তার ব্যয় আরও বড় পরিসরে নিজেদের কাঁধে নিক। ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্ক—দুটির ওপরই এই নীতির প্রভাব পড়তে পারে।