শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: সহিংস উগ্র বামপন্থী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগে কয়েকটি সংগঠন ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (Office of Foreign Assets Control—OFAC) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে ইতালিভিত্তিক অটিস্টিচি/ইনভেন্তাতি (Autistici/Inventati—A/I Collective), যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্যালেস্টাইন অ্যাকশন (Palestine Action) এবং মাসার বাদিল (Masar Badil)-কে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।
এ ছাড়া মাসার বাদিলের দুই নেতা রাওয়া আলসাঘির (Rawa Alsagheer) ও জায়েদ আবদুলনাসের (Zaid Abdulnasser)-এর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংশোধিত নির্বাহী আদেশ ১৩২২৪ (Executive Order 13224)-এর অধীনে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই আদেশের আওতায় সন্ত্রাসী সংগঠন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং সন্ত্রাসীদের আর্থিক, বস্তুগত বা প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়।
অটিস্টিচি/ইনভেন্তাতিকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পৃথক এক তথ্যপত্রে অটিস্টিচি/ইনভেন্তাতিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী (Specially Designated Global Terrorist—SDGT) হিসেবে ঘোষণা করেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের অভিযোগ, ইতালিভিত্তিক এই সংগঠন সহিংস অ্যান্টিফা (Antifa) সেল এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্যান্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীকে ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সেবা দিয়ে থাকে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, সংগঠনটি এনক্রিপ্টেড ই-মেইল ও বার্তা আদান-প্রদান, ওয়েবসাইট পরিচালনা, নিরাপদ ভিডিও সম্মেলন ও সম্প্রচার, পরিচয় গোপন রাখার প্রযুক্তি এবং অন্যান্য ডিজিটাল সেবা সরবরাহ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কগুলো সংগঠিত হওয়া, সদস্য সংগ্রহ, যোগাযোগ, প্রচারণা চালানো, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তথ্য প্রকাশ এবং সহিংস হামলার দায় স্বীকারের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, অটিস্টিচি/ইনভেন্তাতি তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১৬ হাজার ই-মেইল বাক্স, ১ হাজার ৫০০ ওয়েবসাইট, ৫ হাজার ৫০০ মেইলিং তালিকা এবং ১০ হাজার ব্লগ পরিচালনার দাবি করে।
ইউরোপের অবকাঠামোতে নাশকতার অভিযোগ
স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, বিভিন্ন উগ্র বামপন্থী ও নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠী অটিস্টিচি/ইনভেন্তাতির ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করে হামলার দায় স্বীকার, বিবৃতি প্রকাশ এবং নাশকতা-সংক্রান্ত তথ্য প্রচার করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ। মন্ত্রণালয়ের দাবি, ২০২৬ সালে ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে রেল অবকাঠামোতে নাশকতার সঙ্গে জড়িত কয়েকটি নৈরাজ্যবাদী সেল অটিস্টিচি/ইনভেন্তাতির সেবা ব্যবহার করেছে।
স্টেট ডিপার্টমেন্ট আরও অভিযোগ করেছে, মার্চ ২০২৬ সালে ট্রান্সআল্পাইন পাইপলাইন (Transalpine Pipeline—TAL)-এ নাশকতার সঙ্গে জড়িত একটি নৈরাজ্যবাদী সেলও ওই ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহার করে হামলার দায় স্বীকার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ভবিষ্যৎ হামলার আহ্বান জানিয়েছিল। জার্মানির রেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন নাশকতা ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত একটি উগ্র বামপন্থী নেটওয়ার্কও অটিস্টিচি/ইনভেন্তাতির সেবা ব্যবহার করেছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
রোজ সিটি অ্যান্টিফা ও জেনস রিভেঞ্জের প্রসঙ্গ
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের অভিযোগের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীর কথাও উল্লেখ করেছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, ওরেগনভিত্তিক রোজ সিটি অ্যান্টিফা (Rose City Antifa) অটিস্টিচি/ইনভেন্তাতির সেবা ব্যবহার করে সহিংস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংগঠিত ও উৎসাহিত করেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের অভিযোগ, সংগঠনটি ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার (Immigration and Customs Enforcement—ICE) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হামলার আহ্বান জানাতেও এসব ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করেছে।
এ ছাড়া জেনস রিভেঞ্জ (Jane's Revenge) নামের একটি উগ্র বামপন্থী নেটওয়ার্কের কথাও উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। স্টেট ডিপার্টমেন্টের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গর্ভপাতবিরোধী সংকটকালীন সহায়তা কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত এই নেটওয়ার্ক অটিস্টিচি/ইনভেন্তাতির সেবা ব্যবহার করে হামলার দায় স্বীকার এবং একই ধরনের হামলায় উৎসাহ দিয়েছিল।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্র প্যালেস্টাইন অ্যাকশন (Palestine Action) নামের যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠনকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্যালেস্টাইন অ্যাকশন যুক্তরাজ্যে প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত স্থাপনা ও সামরিক সরঞ্জামের বিরুদ্ধে এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে, যেগুলোকে মার্কিন কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তা হিসেবে বিবেচনা করছে। এই সংগঠনের বিরুদ্ধেও নির্বাহী আদেশ ১৩২২৪ (Executive Order 13224)-এর অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মাসার বাদিল ও দুই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
যুক্তরাষ্ট্র মাসার বাদিল (Masar Badil)-কেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মাসার বাদিল একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, যা পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (Popular Front for the Liberation of Palestine—PFLP)-এর হয়ে বা তার স্বার্থে কাজ করে। পিএফএলপিকে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৭ সাল থেকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন (Foreign Terrorist Organization—FTO) হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, মাসার বাদিলের সঙ্গে সামিদুন ফিলিস্তিনি বন্দি সংহতি নেটওয়ার্ক (Samidoun Palestinian Prisoner Solidarity Network)-এর সম্পর্ক রয়েছে। সামিদুনকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছিল। মাসার বাদিলের নেতা বা কর্মকর্তা হিসেবে রাওয়া আলসাঘির এবং জায়েদ আবদুলনাসের-এর বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞায় আর্থিক লেনদেনে বিধিনিষেধ
নিষেধাজ্ঞার ফলে তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠনের যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন সম্পদ এবং সম্পদের ওপর তাদের স্বার্থ সাধারণভাবে অবরুদ্ধ করা হবে। মার্কিন নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত অনুমোদন ছাড়া নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করতে পারবে না। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে, নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত সংগঠনগুলোর সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের লেনদেন বা আর্থিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলে বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য পক্ষও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
সহিংস উগ্র বামপন্থী সন্ত্রাস মোকাবিলায় নতুন পদক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এসব নিষেধাজ্ঞা আন্তঃদেশীয় সহিংস উগ্র বামপন্থী নেটওয়ার্ক মোকাবিলায় বৃহত্তর মার্কিন সরকারি উদ্যোগের অংশ। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, সহিংস উগ্র বামপন্থী নেটওয়ার্কগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে। তবে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, শুধু রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ বা সংবিধান-সুরক্ষিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হচ্ছে না। তাদের দাবি, যেসব ব্যক্তি ও সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাদের কর্মকাণ্ড প্রযোজ্য সন্ত্রাসবিরোধী আইনি কর্তৃত্বের আওতায় পড়ে।
নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের আরেকটি উদাহরণ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলোর ওপর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত চাপ বাড়ানোরও ইঙ্গিত দিচ্ছে এই পদক্ষেপ।


