শিব্বীর আহমেদ, জাতিসংঘ, নিউ ইয়র্ক: সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের আমলের রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির অবশিষ্টাংশ ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সিরিয়া। আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রাসায়নিক অস্ত্র নির্মূলের এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে জানানো হয়, অর্গানাইজেশন ফর দ্য প্রহিবিশন অব কেমিক্যাল উইপনস (OPCW) সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্রের গোলাবারুদ ধ্বংসের বিষয়টি ২০১৪ সালের পর প্রথমবারের মতো যাচাই করেছে।

জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ধ্বংস করা অস্ত্রের মধ্যে ৪২টি বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমা রয়েছে। পাশাপাশি রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদন ও সংরক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনাও ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

আসাদ সরকারের রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির অবশিষ্টাংশ

সিরিয়ার সাবেক সরকারের রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে OPCW-এর একটি বিশেষজ্ঞ দল সিরিয়ায় পূর্বে ঘোষণা না করা রাসায়নিক অস্ত্র, রাসায়নিক উপাদান, সরঞ্জাম এবং বিপুল পরিমাণ নথিপত্রের সন্ধান পায়। OPCW-এর অনুসন্ধানে এমন কিছু রাসায়নিক অস্ত্রেরও সন্ধান পাওয়া যায়, যেগুলোর ধরন ২০১৭ সালের লতামেনাহ ও খান শায়খুন হামলার সঙ্গে এবং কিছু রকেট ২০১৩ সালের ঘৌতা রাসায়নিক হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ধ্বংস কার্যক্রম

সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ OPCW-এর সঙ্গে সহযোগিতা করছে এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দেশটিতে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে। রাসায়নিক অস্ত্র শনাক্তকরণ, নিরাপদে সংরক্ষণ এবং ধ্বংসের ক্ষেত্রে OPCW গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। OPCW-এর যাচাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু কোনো অস্ত্র ধ্বংসের ঘোষণা দেওয়া আর আন্তর্জাতিকভাবে তার ধ্বংস যাচাই করা এক বিষয় নয়। বর্তমান প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো সাবেক সরকারের রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির সম্পূর্ণ চিত্র বের করা, অঘোষিত অস্ত্র ও উপাদান শনাক্ত করা এবং সেগুলো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ধ্বংস করা।

জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে

রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংসের পাশাপাশি এসব অস্ত্র তৈরির ও ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়া ১৮ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাদের সাবেক সরকারের রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ফলে বর্তমান উদ্যোগটি শুধু অস্ত্র ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অতীতের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য দায়ীদের বিচারের বিষয়টিও যুক্ত হচ্ছে।

ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সিরিয়ার প্রতিনিধি ইসরায়েলের সামরিক অভিযানেরও সমালোচনা করেন। দামেস্কের দাবি, সিরিয়ায় সামরিক হামলা রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংসের কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তুরস্কও রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংসের কার্যক্রমের ওপর আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এক দশকের বেশি সময় পর গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি

২০১৩ সালে রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনে যোগ দেওয়ার পর সিরিয়ার ঘোষিত রাসায়নিক অস্ত্রের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে অপসারণ ও ধ্বংস করা হয়েছিল। তবে দেশটির রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির সম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে বছরের পর বছর প্রশ্ন ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত ও OPCW-এর সঙ্গে নতুন করে সহযোগিতার পথ খুলে দেয়।

এখন সেই সহযোগিতার ফল হিসেবে রাসায়নিক অস্ত্রের অবশিষ্টাংশ শনাক্ত ও ধ্বংসের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। ২০১৪ সালের পর প্রথমবারের মতো সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস OPCW-এর মাধ্যমে যাচাই হওয়াকে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তবে রাসায়নিক অস্ত্রের পুরো কর্মসূচির অবশিষ্টাংশ শনাক্ত, নথিভুক্ত ও ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না।