শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি — ইরান ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িতদের যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরে সহায়তার অভিযোগে এ-৭ নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যাপক ব্যবস্থা নিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। বৃহস্পতিবার ঘোষিত এ পদক্ষেপের আওতায় এ-৭ নেটওয়ার্কের আর্থিক কর্মকাণ্ডের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নেটওয়ার্কটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া নেটওয়ার্কটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃদেশীয় অপরাধী সংগঠন হিসেবে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করেছে ট্রেজারি বিভাগের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (OFAC)।

ট্রেজারি বিভাগের আর্থিক অপরাধ দমন নেটওয়ার্ক (FinCEN) এ-৭ নেটওয়ার্কের উপ-এজেন্টদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট ধরনের আর্থিক লেনদেন বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি প্রস্তাবিত বিধিমালা প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত আর্থিক ব্যবস্থাগুলো চিহ্নিত ও বন্ধ করা।

এ-৭ নেটওয়ার্কের আর্থিক কাঠামো

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কয়েকজন ব্যক্তির মাধ্যমে এ-৭ নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে এবং অর্থায়ন পায়। পরে নেটওয়ার্কটি বিভিন্ন দেশে একাধিক কোম্পানি গড়ে তোলে বা সেগুলোকে নিজেদের কার্যক্রমে যুক্ত করে। এসব প্রতিষ্ঠানকে নেটওয়ার্কটির উপ-এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

ট্রেজারির অভিযোগ, এসব কোম্পানির মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ লেনদেনকে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম হিসেবে দেখানো হতো। এর ফলে অবৈধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত অর্থ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে স্থানান্তরের সুযোগ পেত। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, ইরান, বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC), এবং অন্যান্য অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা এ-৭ নেটওয়ার্কের এই ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট এ-৭ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে এ-৭ এলএলসি (A7 LLC) ও ওল্ড ভেক্টর এলএলসি (Old Vector LLC) রয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছিল যুক্তরাষ্ট্র। নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে নেটওয়ার্কটির আর্থিক কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন

আর্থিক অপরাধ দমন নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, তাদের তদন্তে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এ-৭ নেটওয়ার্কের উপ-এজেন্টদের মাধ্যমে ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ, এসব লেনদেন আড়াল করতে তৃতীয় দেশের কোম্পানি ব্যবহার, বাণিজ্যিক নথি জাল করা, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তন এবং পণ্যের বিভ্রান্তিকর বিবরণ দেওয়ার মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত বা অবৈধ অর্থকে বৈধ বাণিজ্যিক লেনদেন হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।

ট্রেজারির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এ-৭ নেটওয়ার্ক প্রতিদিন ২ হাজারের বেশি লেনদেন প্রক্রিয়াজাত করার দাবি করেছিল। সে সময় নেটওয়ার্কটির মোট লেনদেনের পরিমাণ ৭ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন রুশ রুবেলের বেশি বলে জানানো হয়। ট্রেজারি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই অর্থের মূল্য প্রায় ৯১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তাদের দাবি, এই পরিমাণ ২০২৫ সালে রাশিয়ার মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৩ শতাংশের সমান।

ইরানের তেল ও অস্ত্র সংগ্রহে অর্থায়নের অভিযোগ

মার্কিন ট্রেজারি জানিয়েছে, এ-৭ নেটওয়ার্কের উপ-এজেন্টদের মাধ্যমে ইরানের তেল বিক্রি এবং অস্ত্র সংগ্রহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনও পরিচালিত হয়েছে। ট্রেজারির দাবি, নেটওয়ার্কটির একটি উপ-এজেন্ট ইরানের তথাকথিত ‘ছায়া নৌবহর’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন করেছে। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানি তেল পরিবহন ও বিক্রির কাজে ব্যবহৃত জাহাজ, কোম্পানি ও বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে এই ছায়া নৌবহরের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই উপ-এজেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট আরেকটি কোম্পানি ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কর্মকাণ্ডে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ১৪ কোটি ডলার পেয়েছে। আরেকটি ঘটনায় এ-৭ নেটওয়ার্কের একটি উপ-এজেন্ট ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং অস্ত্র সংগ্রহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৬ লাখ ডলার পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রেজারি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সতর্কতা

এ-৭ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সতর্কতা জারি করেছে আর্থিক অপরাধ দমন নেটওয়ার্ক। সংস্থাটি জানিয়েছে, এ-৭ নেটওয়ার্ক বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নেটওয়ার্কটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেন শনাক্ত করতে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার অর্থপাচারবিরোধী আইনের একটি ধারার অধীনে প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালাটি জারি করা হয়েছে। সরকারি নিবন্ধনে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর এ বিষয়ে জনসাধারণের মতামত দেওয়ার জন্য ৩০ দিন সময় থাকবে।

এ-৭ নেটওয়ার্ককে গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃদেশীয় অপরাধী সংগঠন ঘোষণা

বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর এ-৭ নেটওয়ার্ককে ‘গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃদেশীয় অপরাধী সংগঠন’ হিসেবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এবং প্রতারণার দায়ে দণ্ডিত ইলান মিরোনোভিচ শোরকে নেটওয়ার্কটির নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, নেটওয়ার্কটির বিভিন্ন উপ-এজেন্ট প্রতিষ্ঠান অবৈধ অর্থ লেনদেনকে বৈধ বাণিজ্যিক কার্যক্রম হিসেবে আড়াল করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

ট্রেজারি আরও জানিয়েছে, এ-৭ নেটওয়ার্ক ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং হামাসসহ ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। নেটওয়ার্কটির সঙ্গে ইরানের ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেন প্রতিষ্ঠান নোবিটেক্সেরও সম্পর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের জুনে নোবিটেক্সকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছিল বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর। এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্মে সাইবার হামলাসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এ-৭ নেটওয়ার্কের লেনদেনের সম্পর্ক থাকার অভিযোগও করেছে ট্রেজারি বিভাগ।

এ-৭এ৫ ডিজিটাল মুদ্রাও নিষেধাজ্ঞার আওতায়

এ-৭ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ-৭এ৫ (A7A5) নামের রুশ রুবল-সমর্থিত ডিজিটাল মুদ্রাকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওল্ড ভেক্টর এলএলসি এই ডিজিটাল মুদ্রা চালু করে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন সহজ করা এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বিভিন্ন অবকাঠামো সরবরাহকারীকে অর্থ দিতে এটি ব্যবহার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও বিদেশি ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব

বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বা মার্কিন নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণাধীন এ-৭ নেটওয়ার্কের সম্পদ ও সম্পদ-স্বার্থ অবরুদ্ধ থাকবে। এসব সম্পদের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। মার্কিন নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণভাবে সরকারি অনুমোদন ছাড়া এসব অবরুদ্ধ সম্পদের সঙ্গে লেনদেন করতে পারবে না। ট্রেজারি বিভাগ সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে দেওয়ানি বা ফৌজদারি শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর দেওয়ানি জরিমানাও আরোপ করতে পারে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি মার্কিন নাগরিকদের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনে সহায়তা করে অথবা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উদ্দেশ্যে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তারাও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে ট্রেজারি বিভাগ। ইরান, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং অবৈধ অর্থপ্রবাহে সহায়তাকারী আর্থিক নেটওয়ার্কগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।