নিউইয়র্ক: জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নিউইয়র্কে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমান। তাঁর নিউইয়র্ক অবস্থান ও দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আবাসন, দৈনিক ভাতা, সরকারি যানবাহন এবং অন্যান্য ব্যয়ের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালিলুর রহমানের নিউইয়র্কের আবাসনের জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাসে ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়িভাড়া অনুমোদন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যানহাটনে তাঁর জন্য একটি বাসা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির সরকারি বাসাভাড়া মাসে ১২ হাজার ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সরকারি আদেশে খালিলুর রহমানের নিউইয়র্কে দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের ওই আদেশে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কাল ৩১ আগস্ট থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নিউইয়র্কে তাঁর সরকারি স্থানীয় যাতায়াতের জন্য একটি মার্সিডিজ-বেঞ্জ গাড়ির ব্যবস্থার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গাড়িটি তাঁর দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের একজন পূর্ণ মন্ত্রীর বিদেশে সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দৈনিক ভাতা ৪২০ মার্কিন ডলার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খালিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিদেশে সরকারি দায়িত্ব পালন করায় এই হারে দৈনিক ভাতা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আট মাসের হিসাব ধরে তাঁর দৈনিক ভাতা প্রায় ১ লাখ ৮০০ ডলার হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। তবে এই অঙ্কটি ৪২০ ডলার দৈনিক ধরে করা হিসাব; এটি সরকারি অর্থপ্রদানের চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে আলাদাভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। জাতিসংঘের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতি জাতিসংঘের কর্মচারী নন এবং তিনি জাতিসংঘ থেকে কোনো বেতন পান না। খালিলুর রহমান ২ জুন ২০২৬ জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

এর অর্থ হলো, সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে থাকার জন্য খালিলুর রহমান জাতিসংঘের কাছ থেকে কোনো নিয়মিত বেতন পান না। তাঁর মূল সরকারি বেতন বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকেই আসে। তাঁর নিউইয়র্কের অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস একক নয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর সরকারি বেতন, বিদেশে দায়িত্ব পালনের দৈনিক ভাতা এবং প্রতিবেদনে উল্লেখিত আবাসন ও সরকারি যানবাহনের ব্যয় বহন করা হচ্ছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তর পরিচালনার জন্য জাতিসংঘের নিজস্ব নিয়মিত বাজেটের পাশাপাশি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অনুদানে একটি তহবিল রয়েছে। জাতিসংঘের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরের তহবিলে ১০টি দেশ মোট ১২ লাখ ৮৮ হাজার ২৩৭ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুত অর্থ ২ লাখ ডলার। এই তহবিল সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রম, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও পরামর্শ, ভ্রমণ এবং অধিবেশনের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয়। তবে বাংলাদেশের ২ লাখ ডলারের এই অবদানকে খালিলুর রহমানের ব্যক্তিগত বেতন, বাসাভাড়া বা দৈনিক ভাতা হিসেবে দেখানো হয়নি।

সাধারণ পরিষদের সভাপতির সরকারি ভ্রমণের অর্থায়নের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশ ভ্রমণের ব্যয় বহন করতে পারে, আবার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরের নিয়মিত বাজেট থেকেও ব্যয় করা হতে পারে। ফলে খালিলুর রহমানের প্রতিটি সরকারি ভ্রমণের অর্থ বাংলাদেশ সরকারই দিয়েছে বা সব ভ্রমণের অর্থ জাতিসংঘ দিয়েছে—এমন সাধারণীকরণ করা যায় না।

জাতিসংঘের ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরে মোট ৪০ জন কর্মকর্তা ও কর্মী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেট থেকে অর্থ পান, কেউ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা থেকে সাময়িকভাবে নিয়োজিত এবং কেউ সদস্যরাষ্ট্রের মাধ্যমে নিয়োজিত হয়েছেন। সভাপতির দপ্তরের নিজস্ব তহবিল থেকেও কয়েকজনের ব্যয় বহন করা হচ্ছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিউইয়র্কে খালিলুর রহমানকে সহায়তা করতে ছয়জন বাংলাদেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এসেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বেতন, বিদেশে অবস্থানকালীন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাংলাদেশের সরকারি কাঠামোর অধীনে থাকার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সব মিলিয়ে খালিলুর রহমানের নিউইয়র্কের দায়িত্ব পালনের ব্যয়কে পুরোপুরি জাতিসংঘের অর্থ বা পুরোপুরি বাংলাদেশের অর্থ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর সরকারি বেতন এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত আবাসন, দৈনিক ভাতা ও যানবাহনের ব্যয় বাংলাদেশের সরকারি অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেট এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অবদানে পরিচালিত হচ্ছে।

জাতিসংঘের নিশ্চিত তথ্য অনুযায়ী, খালিলুর রহমান জাতিসংঘের বেতনভোগী কর্মচারী নন; তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ৮১তম সাধারণ পরিষদের নির্বাচিত সভাপতি। অন্যদিকে, মাসে ২০ হাজার ডলারের বাসাভাড়া, দৈনিক ৪২০ ডলারের ভাতা এবং মার্সিডিজ-বেঞ্জ গাড়ির তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথির ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। এসব ব্যয়ের মূল সরকারি নথি প্রকাশ্যে যাচাই করা গেলে তাঁর নিউইয়র্ক অবস্থানের মোট সরকারি ব্যয় এবং প্রতিটি খাতে অর্থের সুনির্দিষ্ট উৎস আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।