NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২৬ | ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
আজ ১৫ আগস্ট সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘অগ্রগতি হলে জানানো হবে’, প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে বলল দিল্লি খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আজ হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড করা হবে : ট্রাম্প শোকাবহ ১৫ আগস্ট আজ ডালাস-ফোর্ট ওর্থ বিমানবন্দরে অজুর বিশেষ ব্যবস্থা: চলতি বছরের শেষেই চালু হচ্ছে নতুন প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গণিত অলিম্পিয়াডে পদকজয়ীদের সাক্ষাৎ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন ব্যবসায়ীদের আলোচনা, বাণিজ্য-বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহ উত্তরাখণ্ডে নির্মাণাধীন সুড়ঙ্গে ধস, নিহত ৬ কোন ছবির জন্য পারিশ্রমিক বাড়ালেন শ্রদ্ধা কাপুর?
Logo
logo

তালেবান শাসনের ৫ বছর: বদলে গেছে আফগান নারীদের জীবনধারা


খবর   প্রকাশিত:  ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৮ এএম

তালেবান শাসনের ৫ বছর: বদলে গেছে আফগান নারীদের জীবনধারা

তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পর দেশটির নারী ও মেয়েদের জীবন অনেকটাই বদলে গেছে। শিক্ষা, চাকরি, চলাফেরা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ জীবনের নানা ক্ষেত্রে তারা কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়েছেন।

নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তায় আছেন অনেকে।

 

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। এর আগে প্রায় দুই দশক যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সঙ্গে লড়াইয়ের পর তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পর থেকেই নারী ও মেয়েদের ওপর একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তালেবান।

বিবিসি কাবুলসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন শহর ও প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের অনেকেই বলেছেন, তালেবান শাসনে তাদের জীবন আগের মতো নেই। তালেবানের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মেয়েদের শিক্ষা। ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার সুযোগ বন্ধ রয়েছে।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৬ লাখ মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি শেষ করার পর আর স্কুলে যেতে পারছে না। বর্তমানে আফগানিস্তানই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সরকারি ভাবে নিষিদ্ধ।

 

 

কাবুলের শাকিবা তালেবান ক্ষমতায় আসার দিনটিকে তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিনগুলোর একটি বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট এলেই তার মনে হয় পুরোনো ক্ষত আবার জেগে উঠেছে। বছরের পর বছর যে স্বপ্নগুলো তিনি মনে লালন করেছেন, সেগুলো এক মুহূর্তে তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়েছিল।

অনলাইনে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পেরেছেন শাকিবা। এটিকে তিনি নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন মনে করেন। তবে তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়া। এখন সেই স্বপ্ন পূরণ করা অসম্ভব বলেই মনে করেন তিনি। শাকিবা বলেন, ছোটবেলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেকে উড়োজাহাজ চালাতে কল্পনা করতেন। তিনি স্বাধীনভাবে উড়তে এবং সীমাহীন পৃথিবী দেখতে চেয়েছিলেন। তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি অবশ্য নারীদের শিক্ষা নিয়ে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বিবিসির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারীদের জন্য সবকিছু নিষিদ্ধ করা হয়নি।

 

মুত্তাকির দাবি, বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ মেয়ে স্কুল ও মাদরাসায় পড়ছে। তার ভাষ্য, নারীদের জীবন ও কাজের সব ক্ষেত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়নি; কিছু কার্যক্রম সাময়িকভাবে সীমিত করা হয়েছে। তবে তালেবানের এই বক্তব্যের সঙ্গে আফগান নারী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যের বড় পার্থক্য রয়েছে। শিক্ষার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও নারীদের ওপর নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে মাত্র ৭ শতাংশ নারী কর্মরত। তালেবানের বিভিন্ন নির্দেশের কারণে সংবাদ উপস্থাপক জুহাল তার চাকরি হারিয়েছেন। টেলিভিশনে সংবাদ পড়া ছিল তার কাছে শুধু একটি চাকরি নয়, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জুহাল বলেন, ক্যামেরার সামনে বসে সংবাদ পড়ার সময় তিনি গর্বিত ও আনন্দিত বোধ করতেন। কাজটি তার পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল। এখন তার সেই জীবন নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি জানেন, সারাদিন তাকে বাড়িতে থাকতে হবে।


 

তবে তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি দাবি করেছেন, নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বরং বেড়েছে। তার মতে, ২০২০ ও ২০২১ সালে আফগানিস্তানে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নারী ছিলেন প্রায় ৩০ হাজার। বর্তমানে এই সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজার হয়েছে। তালেবানের দাবি, নারীরা শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী ও উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। নারীদের স্বাধীন চলাফেরার ওপরও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। পুরুষ অভিভাবক ছাড়া দূরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে তাদের বাধার মুখে পড়তে হয়। এসব নিয়মের কারণে নারীদের নিজেদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও কমে গেছে বলে জানিয়েছেন অনেকে। কাবুলের এলা বলেন, দারিদ্র্য ও প্রতিদিনের নানা সমস্যা মানুষের জীবনকে এতটাই কঠিন করে তুলেছে যে অনেকে তাদের শিক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের আশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, এখন বেচে থাকাই অনেকের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার মতো সময় বা শক্তি অনেকেরই নেই।

তালেবান আবার প্রকাশ্যে শারীরিক শাস্তি কার্যকর করা শুরু করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে শত শত মানুষকে বেত্রাঘাত করা হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। শাইমা নামের এক নারী জানান, তাকে ৫০ বার বেত্রাঘাত করা হয়েছিল। এতে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর দাগ পড়ে। এই ঘটনার পর তার পুরো পরিবারও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শাইমার ভাষ্য, তাকে জোর করে একটি কাগজে স্বীকারোক্তি দিতে হয়েছিল। সেখানে তাকে ধর্মত্যাগী এবং অবিশ্বাসীদের সঙ্গে সহযোগিতাকারী হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। অপরিচিত পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার অভিযোগও আনা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, বেত্রাঘাতের সময় এত জোরে মারা হচ্ছিল যে তার মাথা বারবার মাটির দিকে নুয়ে যাচ্ছিল।


 

প্রায় ২০০ স্থানীয় মানুষ ওই শাস্তি দেখার জন্য জড়ো হয়েছিল। তাদের মধ্যে পুরুষ, কিশোর ও শিশুও ছিল। শাইমাকে সবার সামনে নিজের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়ার কথা বলতে হয়েছিল। এই ঘটনার প্রভাব তার মেয়ের ওপরও পড়েছে। শাইমা বলেন, তার বড় মেয়ে প্রায় প্রতি রাতেই ভয় পেয়ে ঘুম থেকে ওঠে। সে মাকে বলে, ‘তারা তোমাকে মারছে’ বা ‘তারা তোমাকে মেরে ফেলছে।’ মেয়ের এই ভয়ই শাইমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। আরেক নারী মানিজাকেও এক পুরুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে প্রকাশ্যে ৩৯ বার বেত্রাঘাত করা হয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। মানিজা জানান, ওই পুরুষের সঙ্গে তার বিয়ে হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তালেবানের গোয়েন্দারা তাদের গ্রেপ্তার করে। কারাগারে থাকার সময় তিনি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন বলে জানান। একপর্যায়ে তার বেচে থাকার ইচ্ছাও চলে গিয়েছিল। মানিজা বলেন, কারাগার থেকে বের হলে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবতেন তিনি। গ্রেপ্তার ও শাস্তির পর নিজেকে পরিবার ও বন্ধুদের জন্য লজ্জার কারণ মনে হতে শুরু করে তার।

আফগানিস্তানে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। দেশটিতে মাতৃমৃত্যুর হার বিশ্বের অন্যতম বেশি। নারী চিকিৎসকের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং পুরুষ চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে থাকা বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে অনেক নারী ও মেয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেন না। ধাত্রী মারজিয়া জানান, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে চিকিৎসাকেন্দ্রে আসা ৪৫ বছর বয়সী ছয় সন্তানের এক মাকে তার চোখের সামনে মারা যেতে দেখেছেন। শিশুটিকে বাঁচানো গেলেও মাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মারজিয়া বলেন, ওই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখনো চিন্তা করেন। মা ছাড়া শিশুটি এবং তার ভাইবোনেরা কীভাবে বড় হবে—এই প্রশ্ন তাকে ভাবায়। তার মতে, একজন রোগীকে হারানো চিকিৎসাকর্মীদের জন্য সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। এতে তারা শারীরিক ও মানসিক- দুই দিক থেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন।


 

মরিয়ম একটি কন্যাসন্তানের মা হতে চলেছেন। কিন্তু মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তিত। মরিয়ম বলেন, তালেবানের বর্তমান বিধিনিষেধ চলতে থাকলে তার মেয়ে হয়তো পড়াশোনা শেষ করার সুযোগও পাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া তো আরো কঠিন। তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে তার মেয়ে বিয়ে করে সন্তান জন্ম দিতে গেলে যদি একজন নারী চিকিৎসকের প্রয়োজন হয়, কিন্তু সেই সময় পর্যাপ্ত নারী চিকিৎসক না থাকেন, তাহলে পরিস্থিতি জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তালেবান শাসনের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু আফগান নারী এখনো আশা ধরে রেখেছেন। ২৪ বছর বয়সী নূরি নারীদের অধিকার রক্ষার জন্য আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়তে চেয়েছিলেন। তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর তার পড়াশোনা শেষ করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। আর্থিকভাবে স্বাধীন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি জ্যাম তৈরির প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিন বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। এখন নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন নূরি। তার লক্ষ্য, অন্য নারীদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করা। নূরি বলেন, তিনি চান অন্য নারীরা তাঁর মতো স্বাধীন, শক্তিশালী ও সফল হয়ে উঠুক। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে ১০ জন নারী কাজ করছেন। 


 

১৩ বছর বয়সী আসামার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। স্কুলে যেতে না পারলেও সে বিশ্বাস করে, একদিন পরিস্থিতি বদলাবে এবং সে চিকিৎসক হতে পারবে। আসামা বলে, একদিন সবকিছু বদলে যাবে। সেই সময়ের জন্য সবাইকে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে এবং আশা হারানো যাবে না। দাঁতের চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কাজ করা এলা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আফগান নারী ও মেয়েদের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের মানুষের উচিত আফগান নারীদের কথা বলা এবং তাদের শিক্ষা ও কাজের অধিকারকে সমর্থন করা। তাদের পরিস্থিতির ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর রাখা জরুরি। এলার মতে, আফগান নারীদের এখন নীরবতা নয়, সংহতি প্রয়োজন।