শুরুতে মাত্র তিন দিনে ৫ কোটি রুপির কিছু বেশি আয়। সেখান থেকে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, আর আট সপ্তাহের প্রেক্ষাগৃহ প্রদর্শন শেষে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০ কোটি রুপি আয়।
১২ জুন মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি, বিশাল প্রচারণা কিংবা চোখধাঁধানো অ্যাকশনের ওপর নির্ভর করেনি। বরং ৯৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের স্মৃতি, দেশভাগের ক্ষত, হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা এবং শিকড়ে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার গল্পই দর্শককে ধীরে ধীরে সিনেমাটির দিকে টেনে এনেছে।
শেষ পর্যন্ত ভারতের বাইরে থেকেই সিনেমাটি ২০ কোটির বেশি রুপি আয় করেছে।
কী নিয়ে সিনেমার গল্প?
‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’র গল্প ৯৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধকে ঘিরে। বয়সের সঙ্গে তার স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জীবনের একটি পুরোনো অধ্যায় তাঁকে বারবার টেনে নিয়ে যায় ফেলে আসা পাঞ্জাবের দিকে।
দেশভাগের কারণে যে ভূমি আজ সীমান্তের ওপারে, সেখানে রয়েছে তার কৈশোরের ভালোবাসার স্মৃতি। সেই মানুষটি এখনো বেঁচে আছেন কি না, সেটিও তাঁর জানা নেই। তবু স্মৃতি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগে একবার সেখানে ফিরে যেতে চান তিনি।
তবে সিনেমাটি শুধু হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প নয়। দেশভাগের সময় সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসা বিভাজন, অনিশ্চয়তা ও মানসিক ক্ষতের কথাও তুলে ধরেছে ছবিটি।
বৃদ্ধকে সেই যাত্রায় নিয়ে বের হয় তাঁর নাতি। দাদা-নাতির এই যাত্রাই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সিনেমার মূল গল্প। একই সঙ্গে এটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, শিকড়, হারানো সময় ও ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষার গল্প।
নাসিরুদ্দিন শাহর অভিনয়ে মুগ্ধ দর্শক
সিনেমাটির আবেগের বড় জায়গা দখল করে আছেন নাসিরুদ্দিন শাহ। ৯৫ বছর বয়সী বৃদ্ধের চরিত্রে তিনি শুধু স্মৃতিভ্রংশের অসহায়ত্ব তুলে ধরেননি, চরিত্রটির হাসি, দুষ্টুমি ও জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও ফুটিয়ে তুলেছেন।
দিলজিৎ দোসাঞ্জও সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন। তবে নাসিরুদ্দিন শাহর অভিনয়ই সিনেমাটির অন্যতম বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
এ আর রহমানের সংগীতেও আলাদা আবহ
সিনেমাটির আবেগকে আরও গভীর করেছে এ আর রহমানের সংগীত। ইমতিয়াজ আলীর ধীরগতির গল্প বলার সঙ্গে রহমানের সুর চরিত্রগুলোর স্মৃতি ও আবেগকে আরও গভীর করে তুলেছে।
গীতিকার ইরশাদ কামিলের লেখা গানও গল্পের সঙ্গে মিশে গেছে। ‘দরিয়া’ গানে বাংলা লাইন ব্যবহারের বিষয়টিও আলাদা করে নজর কেড়েছে। এর মধ্য দিয়ে ১৯৪৭-এর দেশভাগের স্মৃতিকে পাঞ্জাবের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাংলার অনুভূতির সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।
প্রেক্ষাগৃহের পর নেটফ্লিক্সে
৭ আগস্ট নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’। ফলে প্রেক্ষাগৃহের পর আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছে সিনেমাটি।
বিশেষ করে দেশভাগের সময় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর কাছে সিনেমাটির ঘরে ফেরার গল্পটি আলাদা আবেগ তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বলিউডে বড় বাজেটের অ্যাকশন ও জাঁকজমকপূর্ণ সিনেমার দাপটের মধ্যেও ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’র সাফল্য দেখিয়েছে, দর্শক এখনো ধীরগতির গল্প, আবেগ ও শক্তিশালী অভিনয়ের সিনেমাকে গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য ইমতিয়াজ আলীর সিনেমাটি তাই শুধু প্রায় ১০০ কোটি রুপি আয়ের গল্প নয়; বরং দেশভাগের ক্ষত, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক আর ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষাকে নরম ও মানবিকভাবে তুলে ধরে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়ার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছে।


