শিব্বীর আহমেদ, জাতিসংঘ, নিউ ইয়র্ক: নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ইউরোপের সাম্প্রতিক দাবানল বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে বলে মন্তব্য করেছেন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (GCF) নির্বাহী পরিচালক মাফালদা দুয়ার্তে। পালাউয়ে বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুয়ার্তে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বিষয়টি বিশ্ব রাজনীতিতে অন্যান্য সংকটের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। যুদ্ধ, সংঘাত ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হলেও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় একই ধরনের জরুরি উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্ব এমন কিছু ‘টিপিং পয়েন্ট’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। দুয়ার্তে বলেন, ‘আমরা যখন চাই, তখন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থ দ্রুত mobilise করতে পারি। কিন্তু জলবায়ুর ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না—যেন আমাদের অপেক্ষা করার সুযোগ আছে।’

নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যাকে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ইউরোপের সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ ও দাবানলের কথাও তুলে ধরেন তিনি। দুয়ার্তের ভাষায়, এসব ঘটনা এখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটছে। এটি আর শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের দেশকেই ক্রমবর্ধমানভাবে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

নেপালের দুর্যোগে নতুন করে উদ্বেগ

গত সপ্তাহে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ধসের ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হিমবাহ ও বরফ ধসের সঙ্গে সম্পর্কিত আকস্মিক পানির প্রবাহ ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহও এ ঘটনাকে সাধারণ বন্যা হিসেবে না দেখে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়তে থাকা ঝুঁকির একটি বড় সতর্কসংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ ও তুষারস্তরে পরিবর্তন ঘটছে। এর ফলে বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহ-সম্পর্কিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো দুর্যোগের একক কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে চিহ্নিত করতে বৈজ্ঞানিকভাবে আরও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

জলবায়ু তহবিলে অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ

গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, অভিযোজন এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে অর্থায়ন করে। BSS/AFP-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফান্ডটি ১৩৪টি উন্নয়নশীল দেশে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। তবে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারিতে ফান্ড থেকে সরে গেছে এবং যুক্তরাজ্য মে মাসে তাদের অবদান অর্ধেক করেছে। দুয়ার্তে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন আরও দ্রুত ও সহজলভ্য করা জরুরি।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাড়ছে বিনিয়োগ

দুয়ার্তে বর্তমানে পালাউয়ে রয়েছেন। সেখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশগুলোর নেতাদের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত। GCF প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম বাড়াচ্ছে। গত তিন বছরে ওই অঞ্চলে ফান্ডটির বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

তবে ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়ার প্রক্রিয়া এখনও যথেষ্ট সহজ নয় বলে স্বীকার করেছেন দুয়ার্তে। তিনি জানান, প্রক্রিয়াটি দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে অনুমোদনের ক্ষেত্রে গড়ে প্রায় নয় মাস সময় লাগছে।

এদিকে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের জলবায়ু দূত টিনা স্টেগ জলবায়ু অর্থায়নে দ্রুত ও বাস্তব অগ্রগতির আহ্বান জানিয়েছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তার জন্য গঠিত পৃথক জাতিসংঘের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের অর্থায়ন নিয়েও তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। দুয়ার্তে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এখনও আশা হারানোর সময় আসেনি। তবে বর্তমান ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলোকে আরও দ্রুত ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।