নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বাংলাদেশে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তবে এসব জিডির প্রতিটিকে বর্তমানে নিখোঁজ থাকা শিশুর সংখ্যা হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। তবে এসব জিডির একটি বড় অংশের শিশু পরবর্তী সময়ে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। কতজন শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারের কাছে নেই বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, নিখোঁজের ঘটনায় করা জিডির সংখ্যা এবং বর্তমানে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা এক নয়। কোনো শিশু হারিয়ে যাওয়ার পর পরিবার থানায় জিডি করতে পারে। পরে শিশুটি ফিরে এলেও অনেক ক্ষেত্রে পরিবার পুলিশকে বিষয়টি জানায় না। ফলে জিডির হিসাব থেকে বর্তমানে কত শিশু নিখোঁজ রয়েছে, তা সরাসরি নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৩ হাজার ৮৭৬টি জিডি হয়েছিল। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের জিডির সংখ্যা আগের সাত মাসের তুলনায় বেশি।

নিখোঁজের সঠিক হিসাব নিয়ে প্রশ্ন

শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডির সংখ্যা পাওয়া গেলেও কতজন শিশু উদ্ধার হয়েছে, কতজন নিজে থেকে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, কতজন এখনো নিখোঁজ এবং কতটি ঘটনায় অপহরণ বা পাচারের অভিযোগ উঠেছে—এসব তথ্য এক জায়গায় সমন্বিতভাবে সংরক্ষণের ঘাটতি রয়েছে।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ৯১৭টি জিডির কথা বলা হয়েছিল। তবে মঙ্গলবারের সরকারি ব্রিফিংয়ে তথ্য উপদেষ্টা ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডির কথা জানিয়েছেন। দুই তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় শিশু নিখোঁজের জাতীয় পরিসংখ্যান প্রকাশে তথ্য সমন্বয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জিডির সংখ্যা প্রকাশ করলে নিখোঁজ শিশু পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। প্রতিটি জিডির পরিণতি—শিশু উদ্ধার হয়েছে কি না, পরিবারের কাছে ফিরেছে কি না, অন্য কোথাও পাওয়া গেছে কি না, অপহরণ বা পাচারের অভিযোগ হয়েছে কি না কিংবা শিশু এখনো নিখোঁজ কি না—তা আলাদাভাবে নথিভুক্ত করা প্রয়োজন।

চালু হয়েছে ‘মুন অ্যালার্ট’

নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি ‘মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন’ বা ‘মুন অ্যালার্ট’ ব্যবস্থা চালু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা তথ্য দেওয়ার জন্য টোল-ফ্রি হেল্পলাইন ১৩২১৯ চালু করা হয়।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, কোনো শিশু নিখোঁজ বা অপহৃত হওয়ার যৌক্তিক আশঙ্কা থাকলে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে জরুরি সতর্কবার্তা প্রচার করা যায়। শিশুর ছবি, সর্বশেষ অবস্থানসহ প্রয়োজনীয় তথ্য বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে উদ্ধারে সাধারণ মানুষের সহায়তা নেওয়া হয়।

জুন মাসে রাজধানীর মিরপুরে এক শিশুকে উদ্ধারে মুন অ্যালার্টের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠানো অবস্থানভিত্তিক সতর্কবার্তা কার্যকর ভূমিকা রাখে। স্থানীয় এক ব্যক্তি ওই সতর্কবার্তা দেখে শিশুটিকে শনাক্ত করে পুলিশকে খবর দেন।

নিখোঁজ শিশু ও পাচার—একই বিষয় নয়

শিশু নিখোঁজের জিডির সংখ্যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ধরনের দাবি ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশ জানিয়েছে, এসব জিডির সঙ্গে শিশু পাচারের সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে পৃথক কোনো ঘটনায় পাচারের সম্ভাবনা থাকলে তা তদন্তের বিষয়।

শিশু অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিখোঁজ হওয়া এবং পাচারের শিকার হওয়াকে একই বিষয় হিসেবে দেখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনায় সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার

শিশু নিখোঁজের প্রকৃত চিত্র জানতে পুলিশ সদর দপ্তর, থানা, সিআইডি, পিবিআই, হাসপাতাল, মর্গ, সমাজসেবা বিভাগ এবং সীমান্তবর্তী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার জিডি থেকে শুরু করে উদ্ধার বা ফিরে আসা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ একই তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত থাকলে দেশে প্রকৃতপক্ষে কত শিশু নিখোঁজ হচ্ছে এবং তাদের কতজন ফিরে আসছে—তার নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে প্রকাশিত জিডির সংখ্যা তাই শিশু নিখোঁজ পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হলেও, এটিকে দেশে বর্তমানে নিখোঁজ থাকা শিশুর মোট সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।