খবর প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম

ঢাকা: চীন থেকে ২০টি জে-১০সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার জন্য চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ। প্রস্তাবিত এই ক্রয়ে ব্যয় হবে প্রায় ২ দশমিক ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। সরকারি বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আট অর্থবছরে ধাপে ধাপে এই অর্থ পরিশোধ করা হবে। প্রস্তাবিত ২০টি যুদ্ধবিমানের মধ্যে ১০টি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিদ্যমান ঘাটতি পূরণে এবং বাকি ১০টি নতুন একটি স্কোয়াড্রন গঠনের জন্য ব্যবহার করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, চীন থেকে জে-১০ যুদ্ধবিমান এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।
প্রতিটি বিমানের দাম ৭৭১ কোটি টাকা
সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রতিটি জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের দাম প্রায় ৬ কোটি ২৭ লাখ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে একটি বিমানের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৭১ কোটি টাকা। ২০টি যুদ্ধবিমানের মূল মূল্য প্রায় ১২৫ কোটি ৬২ লাখ ডলার। এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ, পরিবহন, অপারেশনাল সরঞ্জামসহ অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হবে। নথি অনুযায়ী, ২০টি বিমান পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অপারেশনাল সরঞ্জাম কিনতে আরও প্রায় ৮৮ লাখ ৮৩ হাজার ডলার ব্যয় হবে।
২০২৭ সালের মধ্যে ছয়টি বিমান
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা হবে। তবে সাম্প্রতিক সরকারি নথি অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ২০৩৪-৩৫ অর্থবছর পর্যন্ত পুরো ক্রয় ও অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়া চলবে। প্রতিরক্ষা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৭ সালের মধ্যে ছয়টি জে-১০সিই পেতে চায়। বাকি ১৪টি বিমান পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে দেশে আসার কথা রয়েছে।
চুক্তির খসড়া পাঠানো হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে
জে-১০ যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার জন্য গঠিত কমিটি দরকষাকষির বৈঠকের মাধ্যমে একটি খসড়া চুক্তিপত্র তৈরি করেছে। সেটি ইতোমধ্যে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বিমানবাহিনী বর্তমানে যুদ্ধবিমান কেনার কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন করছে। শুধু যুদ্ধবিমান নয়, একই সঙ্গে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, দূরপাল্লার রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং প্যাসিভ ডিফেন্স সিস্টেম কেনার কারিগরি মূল্যায়নও চলছে।
নতুন মাল্টিরোল কমব্যাট ইউনিট
চুক্তি চূড়ান্ত হলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে একটি নতুন মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট ইউনিট গঠন করা হবে। এ ছাড়া এয়ার ওয়ারফেয়ার সেন্টার, ফিল্ড ইউনিট ও বিমানবাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটি পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি একটি অ্যারোস্পেস গবেষণা ও উন্নয়ন কমপ্লেক্স স্থাপনের কিছু কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বিমানবাহিনীর কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য বগুড়ায় পূর্ণাঙ্গ বিমানঘাঁটি স্থাপনের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণের কাজও চলছে বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিটুজি পদ্ধতিতে কেনার পরিকল্পনা
নথি অনুযায়ী, চীন থেকে সরকার-টু-সরকার (G2G) পদ্ধতিতে অথবা চীনের যুদ্ধবিমান প্রস্তুতকারী ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইম্পোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (CATIC)-এর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছরের ৫ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকার এই ক্রয় প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল। এরপর গত বছরের অক্টোবরে চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। তবে তখন ক্রয়টি সরাসরি নাকি G2G পদ্ধতিতে হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর জে-১০ নিয়ে আগ্রহ
চীনের জে-১০ যুদ্ধবিমান নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের পেছনে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওই সংঘাতে পাকিস্তান চীনের তৈরি জে-১০সি সিরিজের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে। পাকিস্তান দাবি করেছিল, এসব বিমান ব্যবহার করে তারা ভারতের কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, যার মধ্যে রাফালও ছিল।
ভারত সংঘাতে যুদ্ধবিমান হারানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও নির্দিষ্ট সংখ্যা বা কোন ধরনের বিমান কীভাবে ধ্বংস হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ভারতীয় যুদ্ধবিমান ক্ষতির বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে যুদ্ধের সময় জে-১০-এর কার্যক্রম চীনা যুদ্ধবিমানটির সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করে।
রাফালের বিকল্প হিসেবে জে-১০সিই
জে-১০সিই চীনের জে-১০সি-এর রপ্তানি সংস্করণ। এটি আকাশযুদ্ধের পাশাপাশি স্থল লক্ষ্যবস্তুতে হামলাসহ বিভিন্ন ধরনের মিশনে ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। জে-১০সিই শব্দের চেয়ে বেশি গতিতে উড়তে পারে এবং উন্নত রাডার, ইলেকট্রনিক সিস্টেম ও আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষণে জে-১০সিইকে সাধারণত ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফ্রান্সের রাফালও একই ধরনের ৪.৫ প্রজন্মের শ্রেণিতে পড়ে।
এর আগে রাফাল ও ইউরোফাইটার নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশ বেশ কয়েক বছর ধরেই আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের চেষ্টা করছে। ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে ফ্রান্সের রাফাল, ইউরোপের ইউরোফাইটার টাইফুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরের সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ রাফাল যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাবের বিষয়টি সামনে এনেছিলেন। তবে বর্তমান পরিকল্পনায় চীনের জে-১০সিই যুদ্ধবিমানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিমানবাহিনী আধুনিকায়নে বড় পদক্ষেপ
বাংলাদেশের বর্তমান যুদ্ধবিমান বহরের অধিকাংশই পুরোনো। আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সক্ষমতা বাড়াতে নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে সরকার।জে-১০সিই ছাড়াও অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং ইউএভি সিস্টেম সংগ্রহের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। জে-১০সিই কেনার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নের অন্যতম বড় প্রকল্প এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও গভীর করবে। তবে চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি সম্পন্ন করতে এখনও কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন, দরকষাকষি এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের ধাপ রয়েছে।