NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০২৬ | ৫ ভাদ্র ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ছাড়াল ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার কোনো আলোচনা নয়, বন্ধ হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তায় হুমকি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রেসিডেন্টসহ দুই কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সবাই এগিয়ে এলে অনেক বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব : প্রধানমন্ত্রী হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন ভূখণ্ড’ দেখিয়ে ট্রাম্পের পোস্ট রুশ হুমকির মুখে ইউক্রেনকে ‘শতভাগ’ সমর্থনের ঘোষণা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক রদ্রি এখন বার্সেলোনার সড়ক-বাঁধ সুরক্ষায় বিন্না ঘাস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত ইরান চান ট্রাম্প, জানালেন কুশনার অবশেষে বিয়ের গুঞ্জন নিয়ে মুখ খুললেন পূজা চেরী
Logo
logo

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রেসিডেন্টসহ দুই কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা


Shibbir Ahmed   প্রকাশিত:  ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রেসিডেন্টসহ দুই কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

শিব্বীর আহমেদ, নিউ ইয়র্ক: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে এবং আদালটির সিনিয়র ট্রায়াল লয়ার আবদুলায়ে সেয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। বুধবার (১৯ আগস্ট) এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাপান, আইসিসি ও নেদারল্যান্ডস।

মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, আকানে ও সেয়ে এমন কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, যার মাধ্যমে এমন দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত, গ্রেপ্তার, আটক বা বিচার করার চেষ্টা করা হচ্ছে—যেসব দেশ আইসিসির এখতিয়ার মেনে নেয়নি। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে কেন্দ্র করেই ওয়াশিংটন ও আদালটির মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় আকানে ও সেয়ে

জাপানের নাগরিক তোমোকো আকানে ২০২৪ সাল থেকে আইসিসির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আদালতের ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট এবং এই পদে দায়িত্ব পালন করা প্রথম জাপানি নাগরিক।

অন্যদিকে সেনেগালের নাগরিক আবদুলায়ে সেয়ে আইসিসির একজন সিনিয়র ট্রায়াল লয়ার। তিনি সেই প্রসিকিউশন দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছিল। সেয়েকে আইসিসির বিচারক পদে নির্বাচনের জন্যও মনোনীত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞার তালিকা অনুযায়ী, আকানে ও সেয়েকে ‘স্পেশালি ডিজিগনেটেড ন্যাশনালস’ (এসডিএন) তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন তাদের যেকোনো সম্পদ বা সম্পদে স্বার্থ জব্দ হবে এবং মার্কিন নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সঙ্গে লেনদেন করতে পারবে না।

এ ছাড়া মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ১৮ আগস্ট একটি সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে। এর আওতায় আকানে ও সেয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু লেনদেন গুটিয়ে নেওয়ার জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।

কেন নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, আকানে ও সেয়ে এমন কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, যার মাধ্যমে আইসিসি এমন দেশের কর্মকর্তাদের তদন্ত, গ্রেপ্তার, আটক বা বিচারের চেষ্টা করছে, যাদের সরকার আদালটির এখতিয়ার মেনে নেয়নি।

রুবিওর অভিযোগ, আইসিসি তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে এবং আদালটির কার্যক্রম মার্কিন সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে নিজের এখতিয়ার বাড়িয়ে তুলছে।

যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়। ইসরায়েলও আদালটির সদস্য রাষ্ট্র নয়। তবে আইসিসির রোম সংবিধি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আদালত সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিষয়ে বিচারিক এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে, এমনকি অভিযুক্ত ব্যক্তি অ-সদস্য দেশের নাগরিক হলেও।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের নভেম্বরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি।

ওই সিদ্ধান্তের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও আইসিসির মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়। ট্রাম্প প্রশাসন আদালটির বিরুদ্ধে একাধিক দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

এর আগে সাবেক আইসিসি প্রধান কৌঁসুলি করিম খান এবং আদালটির একাধিক বিচারক ও প্রসিকিউশন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়। নতুন দুই ব্যক্তিকে যুক্ত করার ফলে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা আইসিসি কর্মকর্তার সংখ্যা আরও বেড়েছে।

আইসিসির তীব্র প্রতিবাদ

নতুন নিষেধাজ্ঞার পর বুধবার আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। আদালত বলেছে, এই পদক্ষেপ বিচারিক স্বাধীনতার ওপর ‘নির্লজ্জ আক্রমণ’ এবং আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি।

আইসিসির ভাষ্য, বিচারিক কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগ করার কারণে যদি হুমকি ও চাপের মুখে পড়েন, তাহলে শুধু আদালতের স্বাধীনতাই নয়, পুরো আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে।

আদালত আরও বলেছে, এ ধরনের হুমকি ও জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ যুদ্ধাপরাধ ও অন্যান্য গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

জাপানের বিরল সমালোচনা

নিজ দেশের নাগরিক ও আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানের ওপর নিষেধাজ্ঞার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছে জাপান।

বুধবার জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন সিদ্ধান্তকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছে। দেশটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জাপান দীর্ঘদিন ধরে আইসিসিকে সমর্থন করে আসছে।

জাপান আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আইনের শাসন শক্তিশালী করার বিষয়ে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপানের এমন প্রকাশ্য সমালোচনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসের সমর্থন

আইসিসির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেনও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছেন।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোকে তাদের দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করতে দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানেকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং আদালটির প্রতি নেদারল্যান্ডসের অব্যাহত সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের আইসিসিবিরোধী অভিযান

আইসিসির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান পদক্ষেপ শুরু হয় ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ইমপোজিং স্যাংশনস অন দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট’ শীর্ষক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। এই নির্বাহী আদেশের অধীনেই পরবর্তী সময়ে আইসিসির একাধিক কর্মকর্তা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসেন। নতুন করে আকানে ও সেয়েকে তালিকাভুক্ত করার মাধ্যমে আদালটির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের চাপ আরও বাড়ল।

জুলাইয়ে রুবিও আরও কঠোর অবস্থান ঘোষণা করে বলেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির বিরুদ্ধে তাদের অভিযান জোরদার করবে। অন্যান্য দেশকে আদালটি থেকে বেরিয়ে আসার জন্যও ওয়াশিংটন কূটনৈতিকভাবে উৎসাহিত করছে।

আইসিসি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভাজন বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা আইসিসি নিয়ে পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যেও মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট করেছে। জাপান ও নেদারল্যান্ডসের পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি দেশ আদালটির স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। একই সময়ে আইসিসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও আদালটি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্র আদালটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

অন্যদিকে, আইসিসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বৈধতা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে আইনি লড়াই চলছে। জুন মাসে আইসিসির তিন বিচারক ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও পৃথক মামলা করা হয়েছে।

তোমোকো আকানে ও আবদুলায়ে সেয়ের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আইসিসির সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের চলমান সংঘাতকে আরও গভীর করেছে। ওয়াশিংটন বলছে, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে। বিপরীতে আইসিসি বলছে, বিচারিক কর্মকর্তাদের ওপর এমন চাপ আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।