শিব্বীর আহমেদ, নিউ ইয়র্ক: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে অচলাবস্থা আরও গভীর হওয়ায় ইরানের সঙ্গে তাৎক্ষণিক কোনো আলোচনা হবে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না এবং শিগগিরই কোনো আলোচনা হওয়ারও কথা নেই। এর বিপরীতে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এখনো বন্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের দাবি পূরণ না করা পর্যন্ত এই জলপথ স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়া হবে না।

দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী অবস্থান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে দীর্ঘস্থায়ীভাবে এই পথের জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তা জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়

ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ আবার শুরু হতে পারে—এমন আগের ইঙ্গিত থেকে ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যকে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান জানিয়েছে, তারা সংকট নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে স্বাভাবিকভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরুর আগে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দাবি করছে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে—এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে।

এর আগে দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর একটি সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে ৬০ দিনের একটি মার্কিন-ইরান সমঝোতা কার্যকর ছিল। কিন্তু কোনো স্থায়ী শান্তি বা সমঝোতা ছাড়াই সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থান আরও দূরে সরে গেছে।

হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে

ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকার কথা বললেও বাস্তবে জলপথটিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের উদ্ধৃত কেপলার ডেটা অনুযায়ী, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। এর আগের দিন এই সংখ্যা ছিল নয়টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১টি পণ্যবাহী জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করছিল।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বড় বড় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলছে। জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির অন্যতম বড় ক্রেতা চীনও এই সংকটে বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। চীনের দুটি বড় শিপিং কোম্পানি, যারা আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে তেলের বড় অংশ পরিবহন করত, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব জলপথ দিয়ে চলাচল বন্ধ করেছে।

চাপে বৈশ্বিক তেলের বাজার

হরমুজকে ঘিরে অনিশ্চয়তার প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে। বুধবার (১৯ আগস্ট) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯১ দশমিক ২০ ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) প্রায় ৮৫ দশমিক ১০ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল। এর আগে উভয় বেঞ্চমার্কই জুলাইয়ের শেষ দিকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে অব্যাহত ঝুঁকির কারণে তেলের দামের সঙ্গে অতিরিক্ত ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি-প্রিমিয়াম যুক্ত হয়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে কিংবা সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়লে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

এর প্রভাব শুধু পেট্রোল বা পরিবহন ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ইরান: হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবি পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। তেহরানের এই অবস্থান ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প বলছেন, বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য প্রণালিটি উন্মুক্ত ও নিরাপদ। অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হবে না।

ফলে সংকটের মধ্যে দুটি ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন বলছে, জাহাজ চলাচল করতে পারে; আর তেহরান বলছে, শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক চলাচল হবে না। এই অনিশ্চয়তাই জাহাজ মালিক, বীমা কোম্পানি এবং জ্বালানি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে

সংকট এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানের সঙ্গে আর্থিক ও অর্থনৈতিক লেনদেন স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। দেশটি জানিয়েছে, সামুদ্রিক এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ইরান ইউএইর অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইউএই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র হওয়ায় আবুধাবির এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইউএই ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আর্থিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।

এদিকে সংকটের প্রভাব পারস্য উপসাগরের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থান এখনও বিপরীতমুখী

সর্বশেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়ায় দ্রুত কোনো সমাধানের সম্ভাবনা কমে গেছে। ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন অবরোধের অবসান, জব্দ করা সম্পদ ফেরত এবং সংঘাতের কারণে ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। তবে ট্রাম্প এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছেন।

দুই পক্ষই একে অপরকে শান্তির পথ বন্ধ করার জন্য দায়ী করছে। ফলে একটি বিপজ্জনক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি এবং বৃহত্তর নিরাপত্তা ইস্যুতে একটি চুক্তিতে সম্মত হোক। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে তার সামরিক ও অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন করতে হবে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাবের আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালির সংকট এখন মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো বড় ধরনের সরবরাহ সংকটে পড়তে পারে।

অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য নীতি নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আর্থিক বাজারেও প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ঋণের খরচ বৃদ্ধি এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কূটনীতির জন্য বড় পরীক্ষা

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—হরমুজ সংকট বৈশ্বিক বাণিজ্যে দীর্ঘস্থায়ী বাধায় পরিণত হওয়ার আগে ওয়াশিংটন ও তেহরান আবার আলোচনায় ফিরতে পারবে কি না। ট্রাম্প বর্তমানে কোনো আলোচনা বা নির্ধারিত বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়টিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবির সঙ্গে যুক্ত রেখেছে।

এদিকে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো জলপথটি এড়িয়ে চলছে, তেলের দাম তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, হরমুজ প্রণালি ততই শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার উৎস হয়ে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য তাই এই সংকটের গুরুত্ব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানার অনেক বাইরে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথের ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে—ওয়াশিংটন ও তেহরান আবার কূটনীতির টেবিলে ফিরতে পারে কি না, তার ওপর।