নিউজিল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচনে কোনো দল বা জোট স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক ফলাফলে ক্ষমতাসীন ডানপন্থী জোট এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত ফল জানতে অপেক্ষা করতে হবে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর সরকার গঠন নিয়ে শুরু হতে পারে কয়েক সপ্তাহের দর-কষাকষি।

শনিবার রাতে প্রায় সব সাধারণ ভোট গণনা শেষে প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুকসনের নেতৃত্বাধীন মধ্যডানপন্থী ন্যাশনাল পার্টি পেয়েছে ৪২টি আসন। তাদের জোটসঙ্গী অ্যাক্ট পার্টি পেয়েছে ১৩টি এবং পপুলিস্ট দল নিউজিল্যান্ড ফার্স্ট পেয়েছে ১২টি আসন। সব মিলিয়ে ডানপন্থী জোটের আসনসংখ্যা ৬৭।

অন্যদিকে বিরোধী লেবার পার্টি পেয়েছে ৩৫টি আসন। দলটির নেতা ক্রিস হিপকিনস। তাদের ঐতিহ্যগত জোটসঙ্গী গ্রিনস পার্টি পেয়েছে ১৬টি এবং মাওরি পার্টি পেয়েছে পাঁচটি আসন। এ ছাড়া নতুন মধ্যপন্থী দল অপরচুনিটি পেয়েছে সাতটি আসন। সব মিলিয়ে বামপন্থী জোটের আসনসংখ্যা ডানপন্থীদের চেয়ে মাত্র তিনটি কম।

 

 
 

 

 

অকল্যান্ডের ভায়াডাক্ট ইভেন্টস সেন্টারে দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ক্রিস্টোফার লুকসন বলেন, নির্বাচনের ফল এখনো চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না। বিশেষ ভোট গণনার পরই সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ন্যাশনাল পার্টি এখনো পার্লামেন্টের বৃহত্তম দল এবং নতুন সরকার গঠনের সুযোগ তাদের রয়েছে। দলটি জাতীয় পর্যায়ের দলীয় ভোটে লেবার পার্টিকে মাত্র ০.০২ শতাংশ ব্যবধানে পেছনে ফেলেছে।

অন্যদিকে লেবার পার্টির নেতা ক্রিস হিপকিনস বলেন, নিউজিল্যান্ডের জনগণ তাদের মতামত জানিয়েছেন, তবে সেই মতামতের চূড়ান্ত অর্থ বুঝতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। চূড়ান্ত ফল তাদের পক্ষে এলে দ্রুত সরকার গঠনের কাজে নামার কথাও জানান তিনি।

বিশেষ ভোটেই নির্ধারিত হতে পারে ক্ষমতা

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিশেষ ভোট। বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের ভোট এবং নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে দেওয়া ভোটকে বিশেষ ভোট হিসেবে গণ্য করা হয়।

২০২৩ সালের নির্বাচনে প্রায় ছয় লাখ বিশেষ ভোট পড়েছিল, যা মোট ভোটের ২১ শতাংশ। এসব ভোট সাধারণত বামপন্থী দলগুলোর পক্ষে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ওই নির্বাচনে বিশেষ ভোটের কারণে মাওরি পার্টি ও গ্রিনস পার্টি সম্মিলিতভাবে অতিরিক্ত তিনটি আসন পেয়েছিল।

এবারও বিশেষ ভোটের ফলাফলে আসনসংখ্যার হিসাব বদলে যেতে পারে। ফলে প্রাথমিকভাবে এগিয়ে থাকা ডানপন্থী জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

নতুন দল হতে পারে ক্ষমতার চাবিকাঠি

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি নতুন মধ্যপন্থী দল অপরচুনিটির পার্লামেন্টে প্রবেশ। দলটি ৫.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে। ১৯৯৬ সালে নিউজিল্যান্ডে মিশ্র-সদস্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা এমএমপি পদ্ধতি চালুর পর এই প্রথম কোনো নতুন দল সরাসরি এই সীমা অতিক্রম করে পার্লামেন্টে প্রবেশ করল।

দলটির নেতা কিউলে ওং অকল্যান্ডে সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, তাদের জন্য ফলাফল বেশ আশাব্যঞ্জক। বাকি ভোট গণনার পর পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে অপরচুনিটিকে সম্ভাব্য ‘কিংমেকার’ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। অর্থাৎ সরকার গঠনে দলটির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদিও প্রাথমিক ফল অনুযায়ী ডানপন্থী জোটের সরকার গঠনে দলটির প্রয়োজন হচ্ছে না, বিশেষ ভোটের পর পরিস্থিতি বদলে গেলে অপরচুনিটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পার্লামেন্টে আসন বাড়তে পারে ১৩০টি

নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা দুটি ভোট দেন। একটি নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীকে এবং অন্যটি পছন্দের রাজনৈতিক দলকে। জাতীয় পর্যায়ে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে পার্লামেন্টে আসন বণ্টন করা হয়।

তবে কোনো দল দলীয় ভোটের অনুপাতে প্রাপ্য আসনের চেয়ে বেশি নির্বাচনী আসন পেলে অতিরিক্ত আসনগুলোও ধরে রাখতে পারে। একে বলা হয় ‘ওভারহ্যাং’।

এবার ন্যাশনাল পার্টি দলীয় ভোটের অনুপাতে প্রাপ্য আসনের চেয়ে বেশি নির্বাচনী আসন পেয়েছে। ফলে তাদের অতিরিক্ত পাঁচটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে মাওরি পার্টিও অতিরিক্ত আসন পেয়েছে।

সব মিলিয়ে নতুন পার্লামেন্টে আসনসংখ্যা ১৩০-এ পৌঁছাতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন হবে অন্তত ৬৫টি আসন।

তবে নির্বাচনের ফলাফলে ন্যাশনাল পার্টির জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। দলটির চারজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী নিকোলা উইলিস, পল গোল্ডস্মিথ, ক্রিস বিশপ ও জেরি ব্রাউনলি নতুন পার্লামেন্টে ফিরতে পারছেন না।

বিশেষ ভোটের ফল প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও প্রায় দুই সপ্তাহ। এরপর সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়ম মেনেই রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন কার্যক্রম চলবে বলে জানিয়েছেন লুকসন।