ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী হুতি বিদ্রোহীরা সম্প্রতি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিশ্বের বৃহত্তম তেল কম্পানি ‘সৌদি আরামকো’র সদর দপ্তরে সিরিজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুরতা যেমন উন্মোচিত হয়েছে, তেমনই তেলভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের যে লক্ষ্য নিয়ে রিয়াদ এগোচ্ছিল, সেই নিরাপদ ভাবমূর্তিতেও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
সামরিক ও অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় অনভিজ্ঞ বা অনিয়মিত যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত হুতিরা বছরের পর বছর ধরে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে আজ সৌদি আরবের মতো বড় পরাশক্তির জন্য এক ভয়ংকর স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ইয়েমেনের হুতিরা কিভাবে এত কার্যকরভাবে সৌদি আরবে হামলা চালাচ্ছে?
প্রথমত, জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরান হুতিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে এসেছে। যদিও তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি অস্বীকার করে, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন—ইরান শুধু হুতিদের তৈরি করা মারণাস্ত্র সরবরাহ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তাদের আধুনিক অস্ত্র ও ড্রোন অ্যাসেম্বল বা তৈরি করার কারিগরি বিদ্যা শিখিয়ে দিয়েছে।
কিং’স কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ বলেন, ‘ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড এবং হিজবুল্লাহর সহায়তায় স্থানীয় সামরিক প্রকৌশলীরা একটি নিজস্ব সামরিক-শিল্পব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
ফলে সরাসরি ইরান থেকে সরবরাহের পথ বন্ধ বা ব্যাহত হলেও হুতিদের অস্ত্র উৎপাদন কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব।’ ইরানের সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হামিদ নিকু রূপক অর্থে বলেন, “ইরান মূলত হুতিদের ‘মাছ ধরে দেওয়ার’ বদলে ‘মাছ ধরা’ শিখিয়ে দিয়েছে।”
এরপর হুতিরা এখন শুধু ইরানের ওপর নির্ভর না করে সাপ্লাই চেইনে বৈচিত্র্য আনছে। অনুসন্ধানী সংস্থা ‘কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, চীনের বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে সংগৃহীত পার্টস ব্যবহার করে তারা মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
এমনকি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে হুতিরা একধাপ এগিয়ে গেছে। মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’ জানিয়েছে, ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের একটি গোষ্ঠী তাদের তৈরি ‘ক্লদ’ এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করে দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বের গাইডেড রকেট ও হাইপারসনিক গ্লাইড প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রের সফটওয়্যার প্রস্তুত করার চেষ্টা চালিয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বিশাল অংশের ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরক্ষামূলক মিসাইল ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ফলে সৌদি আরবের মতো পশ্চিমা মিত্ররা এখন আকাশপথে বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।
জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফারজান সাবেত জানান, ইসরায়েল বা ইউক্রেনের তুলনায় সৌদি আরবের আয়তন অনেক বড় হওয়ায় এর আকাশসীমা পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত কঠিন।
তদুপরি, গত দুই বছরে লোহিত সাগরে জাহাজ ও ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে হুতিরা তাদের দূরপাল্লার ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বহু গুণ বাড়িয়ে নিয়েছে।