NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬ | ১২ কার্তিক ১৪৩৩
Logo
logo

শিব্বীর সাতান্ন: স্মৃতি, সৃষ্টি ও নীরব জীবনের মহাকাব্য


Mujibur Rahman   প্রকাশিত:  ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:১০ পিএম

শিব্বীর সাতান্ন: স্মৃতি, সৃষ্টি ও নীরব জীবনের মহাকাব্য

দুলাল রহমান, লাকসাম – মানুষের জীবনের বয়স বাড়ে ক্যালেন্ডারের পাতায়, কিন্তু তার প্রকৃত বয়স জমা থাকে স্মৃতিতে, সৃষ্টিতে, ভালোবাসায়, অভিমানে আর ফেলে আসা সময়ের গল্পে। কেউ জীবনের হিসাব মেলান প্রাপ্তির খাতায়, কেউবা হারানোর বেদনায়। কেউ নিজের অর্জনকে দৃশ্যমান করে তুলতে ব্যস্ত থাকেন, আবার কেউ অর্জনের চেয়েও বড় করে দেখেন নিজের ভেতরের মানুষটিকে। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনকে শুধু পেশা, পরিচয় কিংবা সাফল্যের পরিসংখ্যানে বিচার করা যায় না। তাঁদের জীবনের গল্পে জড়িয়ে থাকে বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতা, শিকড়ের প্রতি টান, স্মৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা এবং একান্ত নিজস্ব জগতে বেঁচে থাকার দর্শন।


কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

শিব্বীর আহমেদ তেমনই এক বহুমাত্রিক মানুষ। সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক ও গীতিকবি—প্রতিটি পরিচয় তাঁর জীবনের আলাদা আলাদা জানালা খুলে দেয়। সংবাদ বিশ্লেষণের যুক্তি, কবিতার আবেগ, কথাসাহিত্যের কল্পনা, উপন্যাসের বিস্তৃত ক্যানভাস আর গানের কথায় অনুভূতির প্রকাশ—সব মিলিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন নিজের একটি সৃজনভুবন। তাঁর জীবনের ৫৭ বছরে পদার্পণ তাই কেবল জন্মদিনের একটি উপলক্ষ নয়; বরং এটি একজন সৃষ্টিশীল মানুষের পথচলা, অভিজ্ঞতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং আগামী দিনের স্বপ্নের দিকে ফিরে তাকানোর একটি মুহূর্ত।

কাগজে কলমে ১ নভেম্বর জন্ম নেওয়া শিব্বীর আহমেদ এই নভেম্বর ৫৭ বছর পূর্ণ করছেন। সংখ্যার হিসাবে এটি জীবনের আরেকটি বছর পূর্ণ হওয়ার আনন্দ। কিন্তু ‘শিব্বীর সাতান্ন’কে যদি কেবল বয়সের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয়ের অনেকটাই অদেখা থেকে যাবে। কারণ তাঁর জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সাহিত্য, সাংবাদিকতা, সংগীত, শিক্ষা, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের এক নিজস্ব দর্শন। এসবের সম্মিলিত পাঠেই ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মানুষ শিব্বীর আহমেদের অন্তর্গত অবয়ব।

একজন মানুষ যখন একাধিক সৃজনশীল মাধ্যমে নিজের ভাবনা প্রকাশ করেন, তখন তাঁর প্রতিটি পরিচয় অন্য পরিচয়কে সমৃদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করে। শিব্বীর আহমেদের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকতা, কবিতা, কথাসাহিত্য ও গীতিকবিতার জগৎকে আলাদা আলাদা ঘরে আটকে রাখা কঠিন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে শব্দের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। কোথাও শব্দ সংবাদ হয়ে বাস্তবতার কথা বলে, কোথাও কবিতা হয়ে অনুভূতির দরজা খোলে, কোথাও গল্প-উপন্যাসের চরিত্র ও ঘটনা হয়ে জীবনের নানা দিককে তুলে ধরে, আবার কোথাও সুরের সঙ্গে মিশে গান হয়ে পৌঁছে যায় শ্রোতার হৃদয়ে।


হোয়াইট হাউজের একটি অনুষ্ঠানে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪২। এই গ্রন্থসম্ভারের বিষয়বৈচিত্র্য তাঁর সৃষ্টিশীল আগ্রহের বিস্তৃত পরিসরকে নির্দেশ করে। থ্রিলার, প্রেমের উপন্যাস, ভ্রমণ, গবেষণা, কবিতা, ছড়া, শিশুসাহিত্য, ফ্যান্টাসি, চিঠিপত্র, রম্যরচনা, প্রবন্ধ ও কলাম—বিভিন্ন ধরনের লেখালেখিতে রয়েছে তাঁর পদচারণা। একেকটি সাহিত্যধারা একেক রকম মনোযোগ, নির্মাণশৈলী ও ভাষার ব্যবহার দাবি করে। থ্রিলারে প্রয়োজন রহস্য ও উত্তেজনা, প্রেমের উপন্যাসে অনুভূতির সূক্ষ্মতা, গবেষণায় তথ্য ও বিশ্লেষণ, আর শিশুসাহিত্যে প্রয়োজন কল্পনাশক্তির সঙ্গে সহজ ভাষার মেলবন্ধন। নানা ধারায় লেখার এই প্রয়াস তাঁর সাহিত্যচর্চার বহুমুখী চরিত্রকে সামনে নিয়ে আসে।

বইয়ের সংখ্যা অবশ্য একজন লেখকের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। প্রতিটি বইয়ের পেছনে থাকে ভাবনার জন্ম, লেখার শ্রম, সংশোধন, প্রকাশ এবং পাঠকের কাছে পৌঁছানোর অপেক্ষা। একটি বই প্রকাশিত হওয়ার পর লেখক তার পাঠকের হাতে নিজের সৃষ্টিকে তুলে দেন; তারপর সেই সৃষ্টি পাঠকের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি করে। ৪২টি প্রকাশিত বইয়ের হিসাব তাই শুধু গ্রন্থসংখ্যা নয়, দীর্ঘ সৃজনপ্রক্রিয়ার একটি দৃশ্যমান চিহ্ন।

সাহিত্যচর্চার এই বৈচিত্র্যের মধ্যে রয়েছে নিজের ভাবনা প্রকাশের একাধিক পথ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা। কখনো কল্পনার আশ্রয়ে রহস্যের জগৎ নির্মাণ, কখনো প্রেমের আবেগকে ভাষা দেওয়া, কখনো ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নতুন ভূগোলের সঙ্গে পরিচয়, আবার কখনো প্রবন্ধ ও কলামের মাধ্যমে সমকালীন বিষয় নিয়ে ভাবনার প্রকাশ—এসবই লেখকের সৃজনশীল পরিসরকে বিস্তৃত করে। শিব্বীর আহমেদের সাহিত্যিক পরিচয়কে বুঝতে হলে এই বহুমাত্রিকতাকে গুরুত্ব দিতে হয়।


ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের একটি অনুষ্ঠানে মূলধারার সংবাদিকদের সাথে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

কবিতা মানুষের মনের এমন কিছু অনুভূতির ভাষা, যা অনেক সময় সরাসরি কথায় প্রকাশ করা কঠিন। কখনো একটি শব্দ, কখনো একটি দৃশ্য, কখনো একটি স্মৃতি কিংবা একটি দীর্ঘশ্বাস কবিতার জন্ম দেয়। কবি তাঁর অভিজ্ঞতাকে ভাষায় রূপ দেন, আর পাঠক সেই ভাষার ভেতর নিজের জীবনের প্রতিধ্বনি খুঁজে পান। কবিতার এই ব্যক্তিগত অথচ সর্বজনীন শক্তিই তাকে সময়ের সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখে।

শিব্বীর আহমেদের প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সংখ্যা পাঁচ। তাঁর রচিত কবিতার সংখ্যা হাজারেরও বেশি। এই পরিসংখ্যান তাঁর কবিতাচর্চার ব্যাপ্তির পরিচয় বহন করে। হাজারেরও বেশি কবিতা লেখা মানে দীর্ঘ সময় ধরে শব্দ, অনুভূতি ও ভাবনার সঙ্গে এক ধরনের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক বজায় রাখা। কবিতার বিষয়, ভাষা কিংবা প্রকাশভঙ্গি নিয়ে বিস্তারিত পাঠ ও মূল্যায়ন সাহিত্যসমালোচনার বিষয়; তবে তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ থেকেই বোঝা যায়, কবিতা তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কবিতা লেখার জন্য শুধু ভাষাজ্ঞান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পর্যবেক্ষণ, অনুভব এবং পরিচিত পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখার ক্ষমতা। একই ঘটনা একজনের কাছে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, আরেকজনের কাছে হয়ে উঠতে পারে কবিতার উপাদান। কবির কাজ সেই সাধারণ অভিজ্ঞতার মধ্যে অসাধারণ অর্থ খুঁজে পাওয়া। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় জমে থাকা স্মৃতি, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, সময়ের পরিবর্তন এবং নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব—সবকিছুই কবিতার সম্ভাব্য উপাদান।


যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক এসিস্টেন্ট সেক্রেটারি বিথানি মরিসনের সাথে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

শিব্বীর আহমেদের ৫৭তম জন্মদিনে তাঁর কবিতার জগতের দিকে ফিরে তাকানো তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বয়সের সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়; পুরোনো স্মৃতির অর্থ বদলে যেতে পারে, নতুন উপলব্ধি জন্ম নিতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের সৃষ্টিতে কীভাবে প্রতিফলিত হবে, সেটিই হতে পারে তাঁর সাহিত্যযাত্রার পরবর্তী অধ্যায়ের একটি আকর্ষণীয় দিক।

কবিতার সঙ্গে গীতিকবিতার আত্মীয়তা রয়েছে, কিন্তু দুটির প্রকাশের পথ এক নয়। কবিতা পাঠকের মনে নিজস্ব ছন্দ ও অনুরণন তৈরি করে; গানের কথা সুর, কণ্ঠ ও সংগীতের সঙ্গে মিলিত হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা নির্মাণ করে। একজন গীতিকবিকে শব্দের অর্থের পাশাপাশি তার উচ্চারণ, ছন্দ, আবেগ এবং সুরের সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হয়। কয়েকটি শব্দ কখনো একটি গানের প্রাণ হয়ে ওঠে, আবার সেই গানই শ্রোতার ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে থাকতে পারে বহু বছর।

শিব্বীর আহমেদ একজন গীতিকবি হিসেবেও পরিচিত। তাঁর লেখা প্রকাশিত গানের সংখ্যা একশর বেশি। তাঁর লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন বাংলাদেশের পরিচিত ও বরেণ্য শিল্পীদের মধ্যে সামিনা চৌধুরী, মানাম আহমেদ, শফিক তুহিন, বিবেক মজুমদার, রুমানা ইতি, মুন রহমান, ফাগুন, তুহিন, হৃদয়, ইরফানা ও তামান্না হক বর্ণাসহ আরও অনেকে।


বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির সাথে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

গীতিকবির জন্য নিজের লেখা অন্যের কণ্ঠে শুনতে পাওয়া এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। লেখার সময় যে অনুভূতি কাগজে শব্দ হয়ে জন্ম নেয়, শিল্পীর কণ্ঠে তা নতুন মাত্রা পায়। সংগীতের মাধ্যমে সেই শব্দ পৌঁছে যায় এমন মানুষের কাছে, যাঁদের সঙ্গে লেখকের কখনো ব্যক্তিগত পরিচয়ও নাও থাকতে পারে। এখানেই গানের শক্তি—এটি ব্যক্তিগত সৃষ্টিকে সম্মিলিত অনুভূতির অংশে পরিণত করতে পারে।

একশর বেশি প্রকাশিত গান শিব্বীর আহমেদের সৃজনশীল পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সাহিত্য ও সংগীতের এই সংযোগ তাঁর কাজের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। কবিতা, গল্প কিংবা উপন্যাসের মতো গানও তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র, যার মাধ্যমে তিনি শব্দকে ভিন্ন এক শিল্পমাধ্যমে পৌঁছে দিয়েছেন।

শিব্বীর আহমেদের বহুমাত্রিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাংলা অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা। ইন্টারনেট যখন বাংলা ভাষায় সংবাদ প্রকাশ ও পাঠের ক্ষেত্রে আজকের মতো বিস্তৃত পরিসর তৈরি করতে পারেনি, সেই সময়েই অনলাইনে বাংলা সংবাদ প্রচারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। ২০০১ সালে তাঁর উদ্যোগে শুরু হয় বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ নেটওয়ার্ক। বাংলা ভাষাকে ইন্টারনেটে সংবাদ পরিবেশনের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা তিনি শুরু করেছিলেন, তা তাঁর পেশাগত জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।


যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সাবেক এসিস্টেন্ট সেক্রেটারি রবার্ট ও ব্ল্যাকের সাথে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা ভাষায় সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ছিল। বাংলা কনটেন্টের সহজলভ্যতা, অনলাইন পাঠকের অভ্যাস তৈরি, ওয়েবসাইট পরিচালনা এবং প্রবাসী বাঙালিদের কাছে বাংলা সংবাদ পৌঁছে দেওয়া—সবকিছুই ছিল বিকাশমান একটি ক্ষেত্রের অংশ। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষায় অনলাইন সংবাদ প্রচারের উদ্যোগ ছিল সময়ের পরিবর্তনকে ধারণ করার একটি প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শিব্বীর আহমেদ নেটমেলা, বিডিমেলা, খবর, লাকসাম, ওয়াশিংটন বাংলা, ফ্লোরিডা বাংলা, ক্যালিফোর্নিয়া বাংলা, জর্জিয়া বাংলা, বোস্টন বাংলা, কালি ও কলমসহ প্রায় শতাধিক ডোমেইন নিবন্ধন করে অনলাইনে বাংলা সংবাদ ও কনটেন্ট প্রকাশের উদ্যোগ নেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকেন্দ্রিক সংবাদ এবং প্রবাসী বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে অনলাইন পরিসরে তুলে ধরার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়।


অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করছেন কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

প্রবাসী বাঙালিদের জীবনে ভাষা ও সংবাদ কেবল তথ্য জানার মাধ্যম নয়; এগুলো শিকড়ের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখারও গুরুত্বপূর্ণ উপায়। দূরদেশে বসবাস করেও নিজের দেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের খবর জানার আকাঙ্ক্ষা প্রবাসী সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে। বাংলা ভাষায় অনলাইন সংবাদ সেই প্রয়োজন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিব্বীর আহমেদের উদ্যোগকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করা যায়।

ইন্টারনেটের প্রাথমিক যুগে কোনো ভাষায় সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলার অর্থ শুধু একটি ওয়েবসাইট চালু করা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পাঠক তৈরি, কনটেন্ট প্রকাশ, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত সংবাদ পরিবেশনের চ্যালেঞ্জ। বাংলা ভাষার সংবাদকে ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ তাই প্রযুক্তি ও ভাষার মধ্যে একটি সেতু নির্মাণের প্রচেষ্টা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।


অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করছেন কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

অনলাইন সাংবাদিকতার সেই যাত্রা এক জায়গায় থেমে থাকেনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনো তিনি খবর বাংলা-ইংরেজি, দেয়াল পত্রিকা, নিউজনাউ ও বাংলামিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রযুক্তি ও পাঠাভ্যাস বদলেছে, সংবাদ পরিবেশনের গতি বেড়েছে, আর ডিজিটাল সাংবাদিকতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। সেই পরিবর্তনশীল পরিবেশে তাঁর সম্পাদকীয় কর্মকাণ্ড সাংবাদিকতার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে।

একজন সাংবাদিকের জীবনে সংবাদ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলা, সম্পাদনা করা এবং পাঠকের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। শিব্বীর আহমেদের ক্ষেত্রে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে এই দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁর পেশাগত পরিচয়কে আরও বিস্তৃত করেছে।

বাংলা অনলাইন সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর অবদান মূল্যায়নের জন্য ২০০১ সালে শুরু হওয়া উদ্যোগগুলোর নথি, সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটগুলোর প্রকাশনা-রেকর্ড এবং ডোমেইন নিবন্ধনের তথ্য সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ইতিহাসের অনেক প্রাথমিক উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে। তাই সেই সময়ের সংবাদ, ওয়েবসাইটের সংরক্ষিত সংস্করণ এবং সংশ্লিষ্ট দলিল ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।

শিব্বীর আহমেদের সাংবাদিকতা কেবল বাংলা ভাষার সংবাদমাধ্যম কিংবা সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতি, প্রশাসন, কূটনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে তাঁর সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা। সাংবাদিক হিসেবে তিনি হোয়াইট হাউস, মার্কিন সিনেট, কংগ্রেস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ফরেন প্রেস সেন্টার, কমার্স ডিপার্টমেন্ট, জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট, জাতিসংঘ, ফেডারেল রিজার্ভ এবং বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় সংবাদ সংগ্রহ করেছেন।

এসব প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন, পররাষ্ট্রনীতি, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। হোয়াইট হাউস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের কেন্দ্র; সিনেট ও কংগ্রেসের কার্যক্রম দেশটির আইন প্রণয়ন ও জাতীয় নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত। স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতির নানা দিক। অন্যদিকে কমার্স ডিপার্টমেন্ট, জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এবং ফেডারেল রিজার্ভের কার্যক্রম অর্থনীতি, আইন প্রয়োগ ও আর্থিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসে।

জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বৈশ্বিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক নীতি এবং বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সংবাদ সাধারণত একটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

সাংবাদিকতার এই পরিসরে কাজ করার জন্য প্রয়োজন ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপট বোঝা, নীতিগত সিদ্ধান্তের তাৎপর্য অনুধাবন করা এবং জটিল বিষয়কে পাঠকের কাছে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা। একটি সংবাদ সম্মেলনে উচ্চারিত বক্তব্য, একটি নীতিগত ঘোষণা কিংবা একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনে থাকতে পারে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। সংবাদ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সেই প্রেক্ষাপটকে যথাযথভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।


যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে বাংলাদেশের সাবেক স্পিকার ও প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সাথে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

শিব্বীর আহমেদের পেশাগত পরিচয়ের এই দিকটি তাঁর সাংবাদিকতার ভৌগোলিক ও বিষয়গত বিস্তারের কথা তুলে ধরে। বাংলা ভাষায় সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রকাশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা তাঁকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তাঁর ৫৭ বছরের জীবনপথের দিকে ফিরে তাকালে তাই সাংবাদিকতার এই অধ্যায়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যিক হিসেবে তিনি শব্দের মাধ্যমে মানুষের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে ধারণ করেন; আর সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কাজের পরিসরে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক ঘটনাবলির সংবাদ। এই দুই পরিচয় মিলিয়ে তাঁর পেশাগত জীবনের একটি বিস্তৃত চিত্র ফুটে ওঠে।

‘শিব্বীর সাতান্ন’ তাই শুধু কবিতা, বই, গান ও ব্যক্তিগত জীবনদর্শনের আখ্যান নয়; এটি প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলা ভাষার সংবাদজগতকে যুক্ত করার প্রচেষ্টার কথাও বলে।

সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে প্রতিদিন নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কেবল ঘটনা জানানো নয়; ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝা, তথ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং পাঠকের সামনে বিষয়টিকে বোধগম্য করে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রয়োজন তথ্য, যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও প্রাসঙ্গিকতার সমন্বয়।


হোয়াইট হাউজের প্রেসব্রিফিং রুমে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

শিব্বীর আহমেদের পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁর সাংবাদিকতা। তিনি একজন সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিত। সাহিত্যিক হিসেবে শব্দের আবেগময় ব্যবহারের যে অভিজ্ঞতা, সাংবাদিক হিসেবে তার সঙ্গে যুক্ত হয় তথ্যের নির্ভুলতা ও বক্তব্যের স্পষ্টতার প্রয়োজন। এই দুই জগতের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ভাষা ও পর্যবেক্ষণ উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

সাহিত্য মানুষের অন্তর্জগৎকে অনুসন্ধান করে, আর সাংবাদিকতা অনেক সময় সেই অন্তর্জগৎকে প্রভাবিত করা বাইরের ঘটনাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। একজন মানুষ যখন দুই ক্ষেত্রেই কাজ করেন, তখন তাঁর সামনে বাস্তবতা ও অনুভূতির ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা উন্মোচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার নিজস্ব নীতি ও দায়বদ্ধতা রয়েছে; একটি অন্যটির বিকল্প নয়। বরং সততা, পর্যবেক্ষণ এবং ভাষার প্রতি যত্ন—এই গুণগুলো দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

শিব্বীর আহমেদের বহুমুখী পরিচয়ে সাংবাদিকতা ও সাহিত্য পাশাপাশি অবস্থান করছে। তাঁর জন্মদিন তাই কেবল একজন লেখকের সৃষ্টিকে স্মরণ করার উপলক্ষ নয়, একজন সাংবাদিকের পেশাগত পরিচয় ও সংবাদ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও তাঁর পথচলাকে বিবেচনা করার সময়।

কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের জীবনে পুরস্কার ও সম্মাননা তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে পুরস্কারই সৃষ্টির চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করে না। একটি বইয়ের প্রকৃত জীবন শুরু হয় পাঠকের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে; একটি গান বেঁচে থাকে শ্রোতার স্মৃতিতে; একটি প্রতিবেদন কিংবা বিশ্লেষণ তার গুরুত্ব পায় তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে। স্বীকৃতি এই যাত্রায় অনুপ্রেরণা যোগাতে পারে, কিন্তু সৃষ্টিশীলতার পথ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে কাজের ধারাবাহিকতার ওপর।

সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, কমিউনিটি সেবা ও কর্মক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য শিব্বীর আহমেদ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ আমেরিকা মিডিয়া ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড, অন্বয় অ্যাওয়ার্ড, ক্লোজআপ ওয়ান অ্যাওয়ার্ড, ফোবানা অ্যাওয়ার্ড, গুড সিটিজেন অ্যাওয়ার্ড, একতারা অ্যাওয়ার্ড এবং বাংলা নববর্ষ সম্মাননা। এসব স্বীকৃতি তাঁর বহুমুখী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রকে নির্দেশ করে।


বরণ্য কবি নির্মলেন্দু গুনের সাথে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

তবে একজন মানুষের জীবনকে শুধু পুরস্কারের তালিকায় সীমাবদ্ধ করলে তাঁর অভিজ্ঞতার অনেক দিক অজানাই থেকে যায়। সম্মাননার মঞ্চে যে পরিচয় দৃশ্যমান হয়, ব্যক্তিগত জীবনের নিভৃত পরিসরে সেই মানুষটির অনুভূতি, স্মৃতি ও চিন্তার জগৎ অনেক বেশি জটিল হতে পারে। শিব্বীর আহমেদের জীবনকে বুঝতে তাই অর্জনের পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব জীবনদর্শনের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

মানুষের পরিচয় গড়ে ওঠে নিজের কাজ ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে, কিন্তু তার শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্কও সেই পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবার, শৈশব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেড়ে ওঠার পরিবেশ এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মের অভিজ্ঞতা মানুষের জীবনকে নানা ভাবে প্রভাবিত করতে পারে। সেই প্রভাব সব সময় সরাসরি দৃশ্যমান হয় না; কখনো তা প্রকাশ পায় মূল্যবোধে, কখনো স্মৃতির প্রতি টানে, কখনো নিজের অতীতকে ভুলে না যাওয়ার প্রবণতায়।

শিব্বীর আহমেদ কুমিল্লা-৯ আসনের—লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ এলাকার—সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাক্ষরকারী মরহুম আলহাজ জালাল আহমেদের সন্তান। তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, জনপ্রতিনিধিত্ব এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

এ ধরনের উত্তরাধিকার একজন মানুষের জীবনের প্রেক্ষাপট বুঝতে সহায়তা করে। তবে উত্তরাধিকার পাওয়া আর নিজের পরিচয় নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। পূর্ববর্তী প্রজন্মের পরিচয় ইতিহাসের অংশ; পরবর্তী প্রজন্মের কাজ ও সৃষ্টিই তাকে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করে। শিব্বীর আহমেদের ক্ষেত্রেও তাঁর পারিবারিক শিকড়ের পাশাপাশি সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সংগীতের জগতে নিজের কাজের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা পরিচয়টি সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নিজের শিকড়কে মনে রাখা মানে অতীতের মধ্যে আটকে থাকা নয়। বরং কোথা থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল, কোন পরিবেশ মানুষকে গড়ে তুলেছিল এবং সময়ের সঙ্গে নিজের অবস্থান কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে—এসব উপলব্ধি বর্তমানকে বুঝতে সাহায্য করে। ‘শিব্বীর সাতান্ন’ সেই অর্থে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি প্রতীকী সেতু।


মিষ্টি মেয়ে অভিনেত্রী কবরীর সাথে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

শিব্বীর আহমেদের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে লাকসাম পাইলট বালিকা বিদ্যালয়, বাবুরবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লাকসাম পাইলট হাইস্কুল, লাকসাম নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স অব কমার্স (এমকম) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স অব সফটওয়্যার সিস্টেমস (এমএসএস) ডিগ্রিও অর্জন করেন।

এই শিক্ষাগত পথচলায় রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় ও জ্ঞানচর্চার পরিসর। ব্যবস্থাপনা ও সফটওয়্যার সিস্টেমসের মতো ক্ষেত্রের সঙ্গে সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও গীতিকবিতার সংযোগ একজন মানুষের বহুমাত্রিক আগ্রহের পরিচয় দেয়। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি পর্যায় তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ, যদিও কোনো ডিগ্রি একাই একজন মানুষের সৃষ্টিশীলতা বা পেশাগত দক্ষতার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হতে পারে না।

শিক্ষা কেবল সনদ অর্জনের বিষয় নয়; এটি চিন্তার পরিসর প্রসারিত করারও একটি মাধ্যম। বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন মানুষের সামনে নতুন প্রশ্ন ও সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। শিব্বীর আহমেদের শিক্ষাজীবনের বিবরণ তাঁর পেশা ও সৃষ্টির বহুমাত্রিকতার পাশাপাশি তাঁর একাডেমিক যাত্রার পরিচয়ও তুলে ধরে।

শৈশব ও কৈশোরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের স্মৃতিতে বিশেষ জায়গা দখল করে থাকে। সেই সময়ের বন্ধু, শিক্ষক, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনের স্মৃতির সঙ্গে মিশে যায়। লাকসাম থেকে উচ্চশিক্ষা এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার পথচলা তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের পরিচয় বহন করে। এই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর পরবর্তী পেশাগত ও সৃজনশীল জীবনের প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

শিব্বীর আহমেদের ব্যক্তিত্বের যে দিকটি তাঁর জীবনকথাকে সবচেয়ে বেশি মানবিক করে তোলে, তা হলো অতীতের প্রতি তাঁর টান এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার প্রবণতা। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, ভালোবাসায় সিক্ত পথে হেঁটে সামনে এগিয়ে যাওয়া অনেক মানুষ সময়ের সঙ্গে অতীতকে ভুলে যান; আবার কেউ কেউ কোনো দিনই তা ভোলেন না। শিব্বীর আহমেদ তাঁদেরই একজন—এমন একটি ধারণা তাঁর ব্যক্তিত্বের বর্ণনায় বিশেষ জায়গা করে নেয়।


ভয়েস অফ আমেরিকা বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান রোকেয়া হায়দারের সাথে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

তাঁর জীবন যেন অনেকটাই নিঃশব্দ। নিজের তৈরি করা একটি ছোট্ট জগতের মধ্যে, নিজেরই নির্মিত বৃত্তে তাঁর বসবাস। বাইরের মানুষ কখনো সেই নীরবতাকে ভুল বুঝতে পারেন। কেউ কেউ হয়তো সেটিকে অহংকার বলে মনে করেন। অথচ নীরব থাকা আর অহংকারী হওয়া এক কথা নয়। মানুষের অন্তর্জগত সম্পর্কে বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, কিন্তু তার ভেতরে জমে থাকা স্মৃতি, অভিমান কিংবা ভালোবাসার গভীরতা বোঝা অনেক কঠিন।

শিব্বীর আহমেদের জীবন সম্পর্কে এই বর্ণনায় ক্রোধ, হিংসা কিংবা বিদ্বেষের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে এক বুক ভালোবাসা এবং নীরব অভিমানের কথা। তিনি নিজের বৃত্তে নিঃশব্দে এগিয়ে চলেন—এমন একটি চিত্র ফুটে ওঠে, যেখানে বাইরের স্বীকৃতি বা ভুল বোঝাবুঝির চেয়ে নিজের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নীরবতারও নানা ভাষা আছে। কেউ নীরব থাকেন অভিমানে, কেউ ক্লান্তিতে, কেউ নিজের ব্যক্তিগত পরিসরকে আগলে রাখতে। আবার কেউ নিজের ভাবনা প্রকাশের জন্য বেছে নেন লেখার জগৎকে। শিব্বীর আহমেদের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা, কবিতা, কথাসাহিত্য ও গানের কথা তাঁর সৃষ্টিশীল প্রকাশের মাধ্যম। ব্যক্তিগত জীবনের নীরবতা এবং সৃষ্টির জগতে শব্দের বিস্তার—এই দুইয়ের সহাবস্থান তাঁর ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ভাবার একটি সাহিত্যিক অবকাশ তৈরি করে।

তবে তাঁর নীরবতাকে একমাত্র নিঃসঙ্গতা হিসেবে ব্যাখ্যা করাও যথার্থ হবে না। নিজের মতো করে বেঁচে থাকার মধ্যে স্বাধীনতা থাকতে পারে, থাকতে পারে স্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা, থাকতে পারে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতি দায়বদ্ধতা। বাইরের চোখে যা দূরত্ব, ভেতরের মানুষটির কাছে তা হয়তো নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর একটি উপায়। এই অনুভূতির প্রকৃত অর্থ কেবল তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন।

ভালোবাসা মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, কিন্তু অতীতের স্মৃতি অনেক সময় তাকে বারবার পেছনে তাকাতেও শেখায়। কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, কিছু অভিজ্ঞতা দূরত্ব তৈরি করে, আবার কিছু মুহূর্ত স্মৃতিতে অমলিন থেকে যায়। অতীতকে ভুলে না যাওয়ার মধ্যে যেমন বেদনা থাকতে পারে, তেমনি থাকতে পারে মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। শিব্বীর আহমেদের ব্যক্তিত্বের এই দিকটি তাঁর জন্মদিনের ফিচারকে কেবল অর্জনের বিবরণ থেকে বের করে এক মানবিক আখ্যানের দিকে নিয়ে যায়।


হোয়াইট হাউজের প্রেসব্রিফিং রুমে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ
জন্মদিনে মানুষ সাধারণত শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও অভিনন্দন পান। কিন্তু একটি বয়সের মাইলফলক কখনো কখনো আত্মপর্যালোচনারও সুযোগ এনে দেয়। পেছনে তাকালে দেখা যায়, কিছু স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, কিছু ইচ্ছা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, কিছু সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় টিকে আছে, আবার কিছু স্মৃতি হয়তো আজও একই রকম উজ্জ্বল। জীবনের অভিজ্ঞতা মানুষকে শেখায়, সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, সব প্রাপ্তির হিসাবও সহজে মেলানো যায় না।

শিব্বীর আহমেদের ৫৭তম জন্মদিনে তাঁর প্রকাশিত ৪২টি বই, পাঁচটি কবিতার বই, হাজারেরও বেশি কবিতা, একশর বেশি প্রকাশিত গান, সাংবাদিকতা এবং বিভিন্ন সম্মাননার কথা সামনে আসে। এগুলো তাঁর জীবনের দৃশ্যমান অধ্যায়। এর পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষাজীবন, পারিবারিক শিকড়, ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার দর্শন। এই সবকিছু মিলিয়েই একজন মানুষকে বোঝার চেষ্টা করা যায়।

তবে ৫৭ বছর কোনো সমাপ্তির রেখা নয়। বয়সের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বাড়ে, আর অভিজ্ঞতা নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য সামনে পড়ে থাকে আরও লেখার সম্ভাবনা, নতুন ভাবনার ক্ষেত্র এবং পুরোনো অভিজ্ঞতাকে নতুন ভাষায় প্রকাশ করার সুযোগ। ভবিষ্যতের কোন পথে তাঁর কলম এগোবে, কোন ভাবনা নতুন বইয়ের জন্ম দেবে, কিংবা কোন অনুভূতি গানের কথায় রূপ নেবে—তা সময়ই বলে দেবে।

জন্মদিনের তাৎপর্য এখানেই যে এটি অতীতকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর সুযোগ দেয়। অর্জনের জন্য কৃতজ্ঞতা, অসম্পূর্ণতার স্বীকৃতি এবং নতুন কাজের প্রত্যাশা—এই তিনের সমন্বয়েই জীবনের পরবর্তী অধ্যায় অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।


জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের সাংবাদিক গ্যালারিতে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ

সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য বয়স কখনো কেবল সময়ের পরিমাপ নয়; এটি অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ও। বহু বছর ধরে লেখা কবিতা, প্রকাশিত বই, গানের কথা, সংবাদ বিশ্লেষণ এবং সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁর সামনে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি করে। প্রতিটি নতুন দিনই নতুন কিছু ভাবার, শেখার এবং প্রকাশ করার সুযোগ এনে দেয়।

‘শিব্বীর সাতান্ন’ তাই কেবল একজন সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক ও গীতিকবির জন্মদিনের শিরোনাম নয়। এটি এমন একজন মানুষের জীবনপথের প্রতীক, যাঁর পরিচয় বহুমাত্রিক, যাঁর সৃষ্টির ভুবন বিস্তৃত এবং যাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নীরবতা, স্মৃতি ও ভালোবাসার নিজস্ব ভাষা।

জীবনের মহাকাব্য সব সময় উচ্চকণ্ঠে লেখা হয় না। কখনো তা লেখা হয় কবিতার পঙ্‌ক্তিতে, কখনো উপন্যাসের পাতায়, কখনো গানের কথায়, কখনো সংবাদ ও বিশ্লেষণের ভাষায়। আবার কখনো কোনো মানুষ তাঁর একান্ত জীবনযাপনের মধ্যেই বহন করেন এমন কিছু গল্প, যার সবটুকু বাইরের পৃথিবীর কাছে প্রকাশিত হয় না।

শিব্বীর আহমেদের ৫৭ বছরের এই মাইলফলক তাই অতীতের হিসাব মেলানোর পাশাপাশি নতুন দিনের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানানোর উপলক্ষ। তাঁর সৃষ্টিকর্ম, পেশাগত পরিচয়, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং ব্যক্তিগত জীবনদর্শন মিলিয়ে এই পথচলা হয়ে ওঠে একটি চলমান উপাখ্যান—যার কিছু অধ্যায় ইতিমধ্যে লেখা হয়েছে, কিছু অধ্যায় এখনো লেখা বাকি।


লাকসামে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ এর নাগরিক সম্বর্ধনা

সময় এগিয়ে যাবে, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলাবে, বয়সের সংখ্যাও একদিন নতুন হবে। কিন্তু একজন মানুষের সৃষ্টির প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে সেই সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর হলো, তার শব্দ কতটা অর্থবহ হয়ে উঠল এবং তার কাজ কতটা স্থায়ী ছাপ রেখে গেল তার ওপর।

শিব্বীর আহমেদের জীবনকে তাই কেবল অর্জনের তালিকায় আটকে রাখা যায় না। তাঁর পরিচয়ের একটি অংশ দৃশ্যমান—বইয়ের সংখ্যা, কবিতার ভাণ্ডার, প্রকাশিত গান, সাংবাদিকতার কাজ, সম্পাদকীয় দায়িত্ব এবং সম্মাননা। আরেকটি অংশ ব্যক্তিগত—স্মৃতির প্রতি টান, অতীতকে ধরে রাখা, ভালোবাসা, নীরব অভিমান এবং নিজের তৈরি বৃত্তে বসবাসের প্রবণতা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই তাঁর জীবনকাহিনি পায় আলাদা মাত্রা।

৫৭ বছরে এসে তাঁর সামনে রয়েছে আরও লেখার, আরও ভাবার, আরও সৃষ্টির সম্ভাবনা। পুরোনো অভিজ্ঞতা নতুন ভাষা পেতে পারে, নতুন প্রজন্মের পাঠক তাঁর বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, আর ডিজিটাল পরিসরে বাংলা ভাষার সংবাদ ও সাহিত্য নতুন নতুন রূপে বিস্তৃত হতে পারে। সৃষ্টির পথ কখনো সম্পূর্ণ হয় না; প্রতিটি সমাপ্তির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আরেকটি শুরুর সম্ভাবনা।

শিব্বীর সাতান্ন—সময়কে পেছনে ফেলে নয়, সময়কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলার নাম। স্মৃতিকে অস্বীকার না করে, সৃষ্টিকে থামতে না দিয়ে, নিজের মতো করে বেঁচে থাকার এক নীরব প্রত্যয়। জন্মদিনের শুভেচ্ছা শিব্বীর আহমেদকে—তাঁর সৃষ্টির পথ আরও দীর্ঘ হোক, শব্দের ভুবন আরও সমৃদ্ধ হোক, আর জীবনের আগামী অধ্যায় ভরে উঠুক নতুন স্বপ্ন, নতুন ভাবনা ও নতুন সৃষ্টির আলোয়।

-কবি ও সাংবাদিক, লাকসাম।