তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যাতে আর না বাড়ে, সে জন্য সরকার জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে যথাসম্ভব সংযত থাকার চেষ্টা করেছে। সরকারের লক্ষ্য, অতীতের মূল্যস্ফীতির কারণে যারা দরিদ্র হয়েছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে যাদের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের দুর্ভোগ কমানো।
রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ১৩ শতাংশ
রাজস্ব খাত সংস্কার এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর বিষয়ে আইএমএফের পরামর্শ প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেই রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতীতে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি, কর অব্যাহতি ও কর জালিয়াতির কারণে রাজস্ব আহরণ বাড়েনি।
তিতুমীরের দাবি, এসব সমস্যা মোকাবেলায় সরকার ইতিমধ্যে টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এর ফলে রাজস্ব আহরণে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত অর্থবছরে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আর বর্তমান সরকার ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আয়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসছি। কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতি থেকে বেরিয়ে আসছি। আস্থা হয় কাজের মাধ্যমে।’
অতীতের সরকার আইএমএফের কর্মসূচিতে থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, সে সময় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বর্তমান সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কাজ করছে এবং তার ফলও দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাসের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিতুমীর বলেন, সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে অর্থনীতির যে পরিস্থিতি হতে পারে, আইএমএফের প্রক্ষেপণকে সেই প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের প্রক্ষেপণে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথাও রয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন সরকার আইএমএফের কাছে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি বজায় রাখা, কর অব্যাহতি দেওয়া এবং কর ফাঁকির সুযোগ রাখার কারণে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকারের সময় সরকারি হিসাব যাচাইযোগ্য করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইবাসসহ সরকারি ব্যবস্থায় সংরক্ষিত তথ্য যাচাই করা যায়। সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে হলে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তব ফলাফল দেখাতে হবে।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিতুমীর জানান, অতীতে ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাটের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবেলায় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এ পরিস্থিতির জন্য সাধারণ মানুষকে কেন মূল্য দিতে হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা তাদের প্রাপ্য অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন। আস্থা ফেরায় এখন অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের চাপ নেই, বরং অনেকে নতুন করে আমানত রাখছেন।
তিনি আরো বলেন, অন্য যেসব ব্যাংকে অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে রেজল্যুশন অ্যাক্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা সরকারের সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম অগ্রাধিকার।
প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রমাণ অর্থনৈতিক সূচকেও দেখা যাচ্ছে। ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমছে, যা ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়।
কর্মসংস্থানে ম্যানুফ্যাকচারিং হাব
দারিদ্র্য কমানো ও ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবেলার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারে অর্থনৈতিক কৌশলের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে উল্লেখ করেন তিতুমীর। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ম্যানুফ্যাকচারিং হাব ও এক্সপোর্ট গেটওয়ে গড়ে তোলার কথা বলেছেন। এর মাধ্যমে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে।
তিতুমীর বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের বিশেষত্ব হলো, প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানো, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ একই কৌশলের অংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে তিতুমীর বলেন, এসব সংকট বাংলাদেশের তৈরি নয়। তবে এর প্রভাব যাতে সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, সে জন্য সরকার চেষ্টা করছে। জ্বালানি, এলএনজি ও সার আমদানির ব্যয় বিবেচনার পাশাপাশি কৃষক ও পরিবহন খাতের ওপর এর প্রভাবও দেখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, আর কোনো মানুষ যেন দারিদ্র্যসীমার নিচে না চলে যায়।’
তিতুমীরের দাবি, অতীতের অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষতির দায় বর্তমান সরকারের তৈরি না হলেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকার তা মোকাবেলা করছে। ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরো দাবি করেন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সামাজিক সুরক্ষায় এ ধরনের কর্মসূচির কার্যকারিতা স্বীকার করছে। সরকারের লক্ষ্য, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন, তাদের সেখান থেকে বের করে আনা এবং নতুন করে মানুষের দরিদ্র হয়ে পড়া ঠেকানো।