শিব্বীর আহমেদ, নিউ ইয়র্ক: আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য তিনি দেশে ফিরতে চান। প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে (PTI) দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ গুরুতর জাতীয় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে, বিচারব্যবহার রাজনৈতিক প্রতিশোধের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। তিনি বলেন, সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন, উগ্রবাদী শক্তি আবার জায়গা করে নিয়েছে এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, কারখানা বন্ধ হয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে, বিনিয়োগ কমেছে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের চাপ সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর পড়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা জীবননাশের ঝুঁকি রয়েছে। ১৯৭৫ সালে তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড, ১৯৮১ সালে দেশে ফেরা এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব অভিজ্ঞতা তাঁর সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়া দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা জীবন রক্ষার জন্য দেশ ছেড়েছেন এবং দেশের ভেতরে থাকা নেতারাও চাপের মধ্যে রয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের দেশজুড়ে সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলটি গণতন্ত্র, আইনের শাসন, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, তাঁর ভাষায় মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা, উগ্রবাদ মোকাবিলা এবং অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার দাবি জানাচ্ছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরতে চায়। জনগণ অন্য কোনো দলকে নির্বাচিত করলে সেই সিদ্ধান্তও মেনে নিতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির ভিত্তিতে। তিনি ভারতকে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ও ঐতিহাসিক বন্ধু এবং চীনকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আসিয়ান ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
তিনি তাঁর সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা, যোগাযোগ, জ্বালানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, স্থলসীমান্ত চুক্তি, ছিটমহল বিনিময়, বাস ও ট্রেন যোগাযোগ, বন্দর ব্যবহার এবং জ্বালানি সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, প্রকল্পটি স্বচ্ছ, কারিগরিভাবে যথাযথ এবং পরিবেশের জন্য দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিস্তা নদীর পানি, কৃষি, পরিবেশ, মানুষের জীবিকা এবং দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে বিষয়টি জড়িত। তিনি বলেন, তিস্তার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে আলোচনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে হবে।
ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়াকে শেখ হাসিনা দুর্ভাগ্যজনক ও অপরিণত সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ হারিয়েছে। তিনি বলেন, পররাষ্ট্রনীতি ব্যক্তিগত বিষয় বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তাঁর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৭৮৪ ডলার হয়েছিল। দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার ২৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছিল।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট থেকে ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হয়েছিল। উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, সড়ক, সেতু, বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ভূমিহীন পরিবারের জন্য আবাসন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন তিনি। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে, বিনিয়োগ কমেছে এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি দাবি করেন, পাঁচ শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং দুই কোটির বেশি মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, অনেক শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী কারাগারে রয়েছেন অথবা আত্মগোপনে আছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার প্রতিদিন ব্যাংক থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় ৫০ থেকে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। হাম পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হয়েছে এবং শিশুদের টিকার ঘাটতি নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসকে সতর্ক করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, সময়মতো টিকা সংগ্রহ করা হয়নি এবং পরবর্তী সময়েও বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, এক হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে এবং এ পরিস্থিতির দায় মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানের।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, কোটা নিয়ে বিরোধের সমাধানে তাঁর সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল এবং ২০১৮ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দাবিগুলো সমাধানের পরও আন্দোলন চলতে থাকে এবং পরে তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। শেখ হাসিনা মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে আন্দোলনের পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও সহিংসতা সংগঠনের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সহিংসতার ঘটনা তদন্তে একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, অথচ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার নির্দেশদাতা, সংগঠক, অর্থায়নকারী এবং সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করতে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে তাঁর সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল। তিনি দাবি করেন, খালেদা জিয়াকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং নির্বাচনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিএনপি এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন বর্জন করে।
তিনি বিভিন্ন সময়ে যানবাহন, ট্রেন, স্কুল ও ভোটকেন্দ্রে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা তুলে ধরেন। ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, ২০১৪ সালের নির্বাচন-পূর্ব সহিংসতা, ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলা এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং জনগণের রায় মেনে নেওয়া উচিত।
শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বড় একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা, নেতাদের কারাগারে রাখা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং লাখ লাখ মানুষকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠন সম্ভব নয়। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন।


