অনিকেত আহমেদ — হুমায়ূন কবীর ঢালী সমকালীন বাংলা শিশুসাহিত্যের আকাশে এক দীপ্তিময় ধ্রুবতারা। ১৯৬৪ সালের ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে জন্মগ্রহণ করা এই প্রথিতযশা শিশুসাহিত্যিক, দূরদর্শী সংগঠক, সম্পাদক ও প্রাবন্ধিকের মূল শেকড় চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভার সিকিরচর গ্রামে। মেঘনা আর ধনাগোদার কলতান, সবুজে ঘেরা মেঠো পথ এবং পাখির কূজনে কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। 

গ্রামীণ জীবনের সেই রূপময় অভিজ্ঞতা ও মাটির গন্ধই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যিক সত্তার প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। চার দশকের বেশি সময় ধরে শব্দের কারুকাজে নতুন প্রজন্মের মনন গড়তে এবং শিশুদের সরল স্বপ্নে অপার কল্পনার রঙ মেশাতে তিনি নিজেকে অকৃত্রিম মমতায় সঁপে দিয়েছেন। বয়সের ফ্রেমে প্রবীণ হলেও হৃদয়ে শৈশবের নিষ্কলুষ সরলতা লালন করার কারণে প্রবীণ এই লেখক আজও অন্তরে চিরসবুজ এক শিল্প-সজ্জন।
পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মাসিক ‘বুড়িগঙ্গা’ দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতা শুরু, এরপর সাপ্তাহিক ‘সমীক্ষণ’র সহযোগী সম্পাদক এবং দৈনিক ‘সংবাদ’র নিয়মিত প্রদায়ক ছাড়াও ফ্রিল্যান্সার হিসেবে যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন পত্রিকায়। লিখেছেন কলাম ও ফিচার। 

পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘অন্বয় প্রকাশ’। ছড়া, গল্প, উপন্যাস, রূপকথা, ভৌতিক রহস্য, গবেষণা কিংবা ভ্রমণলেখার নিখুঁত বিন্যাসে তিনি গড়ে তুলেছেন শিশুমনের এক সুবিশাল মায়াভুবন। তাঁর লেখালেখির শুরুটা বড়দের জন্যও লিখে।  ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম প্রেমের উপন্যাস ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’। 

এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতক অতিক্রম করেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘দুষ্টু ছেলের গল্প’, ‘লজিংবাড়ি’, ‘নীলগ্রহের রহস্য’, ‘কালোমূর্তির রহস্য’, ‘টিয়ে পাখির জন্মদিনে’, ‘ক্লাসমেট’, ‘পরিকন্যা’, ‘কাটুস কুটুস’ সিরিজ, ‘কাকছানার বন্ধু মুরগিছানা’, ‘শহর দেখতে গিয়ে’, ‘দেশবিদেশের রূপকথা’, ‘সব ভূত অদ্ভুত’ এবং ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প’। তাঁর লেখার একটি বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বদেশের ঐতিহ্য, যা নবীন পাঠকদের মনে দেশপ্রেমের বীজ বপন করে। 

হুমায়ূন কবীর ঢালীর লেখনী কেবল দেশীয় সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক আঙিনায়। গ্রিসের পেল্লা পৌরসভার নিনিতসার নবম রাষ্ট্রীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাঁর শিশুতোষ বই ‘রাখাল ও জাদুর আমগাছ’ (A Cowboy and a Magic Mango Tree)। তাঁর সর্বজনীন মানবিক আবেগের অনন্য সৃষ্টি ‘বাবা’ গল্পটি ইতালি, হিন্দি, ওড়িয়া, অসমীয়া ও নেপালি ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রশংসিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্ল্যাটফর্ম ‘আমেরিকা পাবলিশার্স—অথর স্পটলাইট’ তাঁকে ‘দক্ষিণ এশীয় অতিপ্রাকৃতিক ও বৈশ্বিক কথাসাহিত্যের জাদুকর’ (South Asian Storyteller of the Supernatural) হিসেবে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে এবং তাঁর প্রশংসিত উপন্যাস ‘The Little Ghost in America’ (আমেরিকায় পিচ্চিভূত) অ্যামাজন, লুলু ও গুডরিডসের মতো বিশ্বমঞ্চে পাঠকদের মুগ্ধ করেছে। ভ্রমণপিপাসু এই লেখকের চোখে বিশ্ব সংস্কৃতি ধরা পড়েছে তাঁর ‘বাঙালের আমেরিকা দর্শন’, ‘ব্রিজ টু কানাডা’, ‘জার্নি টু তাজমহল’ ও ‘উড়ে যাই দূরে যাই’-এর মতো ভ্রমণগ্রন্থে।

কেবল একক সাধনায় মগ্ন না থেকে বাংলা শিশুসাহিত্যকে সুসংগঠিত করতে তিনি গ্রহণ করেছেন দূরদর্শী নেতৃত্ব। তিনি দেশের সর্ববৃহৎ সাহিত্য সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিশুসাহিত্যিক ফোরাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এছাড়া শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নিজ জন্মভিটা সিকিরচরে গড়ে তুলেছেন গ্রামীণ পাঠাগার ‘আমাদের পাঠাগার’। অনবদ্য সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইউনিসেফ প্রদত্ত মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড (২০১২), এম নূরুল কাদের ফাউন্ডেশন শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১৩), অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক (২০০৬), পদক্ষেপ শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১১), ভারতের ‘চোখ সাহিত্য পুরস্কার’ (২০১৩), সাউথ এশিয়ান রাইটার্স অ্যান্ড জার্নালিস্ট অ্যাওয়ার্ড (২০২১), নেপাল আন্তর্জাতিক শিশুসাহিত্য সম্মেলন পুরস্কার (২০২৪) এবং নিউইয়র্কের 'ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড'-এ সেরা গীতিকারের পুরস্কার (২০২৬)সহ অজস্র সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। সহধর্মিণী গুলশান আরা বাবলী এবং দুই কন‍্যা রুবাইয়াত শবনম অনিকা, ফারহা ফাওজিয়া অতসী ও ছেলে অনিরুদ্ধ কবীর অন্বয় উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। তাঁর পুরো পরিবারই সাহিত্য ও শিল্পের চর্চায় যুক্ত। বড়কন‍্যা অনুবাদক,  ফারহা ফাওজিয়া অতসী একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক ও চিত্রশিল্পী। 

শিশুসাহিত্যিক হুমায়ূন কবীর ঢালী সুস্থ ও দীর্ঘায়ু লাভ করে বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বমঞ্চে আমাদের আরও বেশি গৌরব উপহার দিন—এটাই সবার আন্তরিক প্রত্যাশা।