শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশটির ঋণবাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড পুনঃক্রয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে সরকারের এই পদক্ষেপে সাময়িক স্বস্তি এলেও সুদের হার আবারও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সরকারি ঋণ, বাজেট ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
কেন হঠাৎ এত অস্থিরতা?
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার দ্রুত বেড়েছে। বুধবার ত্রিশ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছায়, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পুনঃক্রয়ের ঘোষণা আসার পর সুদের হার কিছুটা কমে যায়। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি; পরবর্তী সময়ে সুদের হার আবার বাড়তে শুরু করে।
সুদের হার বেড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নতুন ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে গৃহঋণ, ব্যবসায়িক ঋণ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচ। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বন্ড পুনঃক্রয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ১০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ড পুনঃক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি দফায় কমপক্ষে ৪০০ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থ ব্যয় করা হবে। এর আগে প্রতিটি দফায় সর্বোচ্চ ২০০ কোটি ডলারের বন্ড পুনঃক্রয় করা হতো।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য হলো বাজারে অপেক্ষাকৃত কম লেনদেন হওয়া দীর্ঘমেয়াদি বন্ড নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে বাজারে লেনদেনের স্বাভাবিকতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদের হারের ওপর চাপ কমানো। বেসেন্ট জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে প্রতিটি দফায় ৪০০ কোটি ডলারের চেয়েও বেশি সরকারি বন্ড পুনঃক্রয় করা হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পর প্রথমে সরকারি বন্ডের সুদের হার কমে যায়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই পতন মুছে গিয়ে সুদের হার আবার বাড়তে শুরু করে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু সরকারি বন্ড পুনঃক্রয় করে বাজারের অস্থিরতার মূল কারণ দূর করা সম্ভব হচ্ছে না। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সরকারি ঋণ, বড় বাজেট ঘাটতি, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা এবং ভবিষ্যৎ সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ৪০ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে
এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় পটভূমিগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের বিশাল আকার। দেশটির মোট সরকারি ঋণ সম্প্রতি প্রথমবারের মতো ৪০ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। বিপুল ঋণের পাশাপাশি সরকারের বড় বাজেট ঘাটতিও বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। সরকারের ঋণের পরিমাণ যত বাড়বে, সেই ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও তত বাড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি বন্ড পুনঃক্রয় বাজারে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সরকারের ঋণ ও ঘাটতির মূল সমস্যার সমাধান করতে পারে না।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্ববাজারেও প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডকে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদের হার বাড়লে তার প্রভাব অন্যান্য দেশের ঋণবাজারেও পড়তে পারে।সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানি ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হারও বাড়ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের জন্য ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এশিয়ার বিভিন্ন বাজারেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপের দিকে বিনিয়োগকারীরা নজর রাখছেন। দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন বন্ডের সুদের হার কমলে অন্যান্য বাজারে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হতে পারে। কিন্তু সুদের হার আবার বাড়তে থাকলে বিশ্ববাজারে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—সরকারি বন্ড পুনঃক্রয়ের মাধ্যমে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় কি দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার স্থায়ীভাবে কমাতে পারবে? বিশ্লেষকদের মতে, বন্ড পুনঃক্রয় বাজারের তারল্য বাড়িয়ে সাময়িকভাবে চাপ কমাতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সরকারি ঋণ, বড় বাজেট ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার কমিয়ে রাখা কঠিন হবে। অর্থাৎ, বেসেন্টের পদক্ষেপ আপাতত বাজারকে কিছুটা সময় দিতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ও ঘাটতির মৌলিক সমস্যা সমাধান না হলে ট্রেজারি বন্ডের বাজারে অস্থিরতা আবারও ফিরে আসতে পারে। বিশ্ববাজারের জন্য তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্রের এই ঋণবাজারের অস্থিরতা কি সাময়িক, নাকি এটি বৈশ্বিক ঋণবাজারে আরও বড় চাপের সূচনা?


