জটিল ধারাবাহিক কারণেই গত মাসে নেপাল-চীন সীমান্তে বিপর্যয় ঘটেছিল। এর অনেকগুলোই মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আরো মারাত্মক রূপ নিয়েছিল।
গত আগস্টের শেষের দিকে সংকীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকাগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিধ্বংসী শিলা-বরফের হিমবাহ ধসের ক্ষত এখনো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে এই অঞ্চল। এই দুর্যোগে পুরো শহর, রাস্তাঘাট এবং সেতু ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে।
প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছিল, ২৬ আগস্ট ল্যাংটাং লিরুং পর্বত থেকে প্রায় ২ হাজার ফুট চওড়া একটি বিশাল পর্বতশিলা এবং হিমবাহের বরফ খণ্ড ধসে পড়ে এবং প্রায় ৭ হাজার ফুট নিচে থাকা নদীতে গিয়ে আঘাত হানে। এই পতনের ফলে রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান শক্তি নির্গত হয়েছিল। এটি এত তীব্র শক্তিতে আছড়ে পড়েছিল যে বরফটি মুহূর্তের মধ্যেই গলে যায়।
নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট ইউনিভার্সিটির পর্বত জলবিজ্ঞানী ওয়াল্টার ইমারজিল বলেন, ‘এটি ছিল হিমালয় অঞ্চলে একটি নজিরবিহীন দুর্যোগ।’
চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা পরীক্ষার কাজে নিয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’এর হিমবাহবিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিজ্ঞানীদের দলটি এই বিপর্য়য়ের পেছনের কারণ অনুসন্ধান করে গত বুধবার তাদের সমন্বিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনটি অনুসারে, এই দুর্যোগটি কোনো একক চরম আবহাওয়ার কারণে ঘটেনি।
প্রতিবেদনটিতে দেখা গেছে, তার পর থেকে পর্বতটিতে ভূমিধসের হার বেড়েছে। এরপর বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তন কী ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে তা খতিয়ে দেখেন এবং বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখেন।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা নেপালের উচ্চ পর্বতগুলোর পারমাফ্রস্টকে (বরফ, শিলা, বালি ও মাটির মিশ্রণ; যা আঠার মতো কাজ করে) দুর্বল করে দিচ্ছে, বিশেষ করে যে উচ্চতায় এই ধসটি ঘটেছে তার আশেপাশে।
ইমারজিল বলেন, ‘পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া শিলার শক্তি কমিয়ে দেয় এবং ঢালের গভীরে আরো বেশি পানি প্রবেশ করতে দেয়।’
হিমবাহের পরিবর্তনও এই বিপর্যয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ল্যাংটাং-লিরুং হিমবাহটি সাম্প্রতিক দশকগুলোতে, বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে, উল্লেখযোগ্যভাবে পাতলা এবং সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এটি ঢালটিকে কম স্থিতিশীল করে তুলেছে এবং গলিত পানি তৈরি করেছে যা শিলার ফাটলগুলোতে চুইয়ে প্রবেশ করতে পেরেছিল।
গবেষকরা ধসের আগের আবহাওয়াও পরীক্ষা করে দেখেছেন। গত বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে এবং নভেম্বরের শুরুতে এই অঞ্চলে ব্যতিক্রমী পরিমাণে তুষারপাত হয়েছিল। এর পরবর্তী জুলাই এবং আগস্ট মাস স্থানীয়ভাবে রেকর্ডকৃত ইতিহাসের উষ্ণতম ছিল, যা প্রচুর পরিমাণে গলিত পানি তৈরি করতে পারত এবং ঢালটিকে আরো দুর্বল করে দিয়েছিল।
ঐতিহাসিক উপাত্ত ও জলবায়ু মডেল ব্যবহার করে গবেষকরা দেখেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে জুলাই ও আগস্টের তাপমাত্রা এখন প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ। এই অঞ্চলের বার্ষিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেছেন, ‘এ নিয়ে একেবারেই কোনো সন্দেহ নেই যে মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এই দুর্যোগের পূর্বাবস্থা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।’
বিজ্ঞানীরা উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, এই ধসটি তার আকার, গতি এবং জটিলতার দিক থেকে এই অঞ্চলের আগে অভিজ্ঞতার চেয়ে মৌলিকভাবে ভিন্ন ছিল। তারা লিখেছেন, ‘বিদ্যমান কোনো প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থাপনাই পর্যাপ্ত সময় আগে সতর্কবার্তা দিতে পারত না।’
অটো বলেন, ‘এটি হচ্ছে এমন এক ধরনের ঘটনা যা কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে বা খাপ খাওয়াতে পারার সীমার সম্পূর্ণ বাইরে।’


