রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধের তীব্রতা কমাতে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। দেশটি দুই পক্ষের মধ্যে সীমিত সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে।
ভারতের প্রস্তাবে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করা, কৃষ্ণসাগরের বন্দর দিয়ে শস্য ও জ্বালানি পরিবহন নিরাপদ রাখা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করা। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কিয়েভ সফরের সময় ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভারতের প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে দেখছে ইউক্রেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, বর্তমানে আলোচনায় থাকা চারটি উদ্যোগের মধ্যে ভারতের প্রস্তাব সবচেয়ে বিস্তৃত। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, জ্বালানি স্থাপনা ও কৃষ্ণসাগরকে ঘিরে একটি যৌথ যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বিবেচনা করছে কিয়েভ।
তবে ভারতের এই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রাশিয়ার কর্মকর্তারা এর আগে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি হলে ইউক্রেন নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়ানো এবং নতুন অস্ত্র সংগ্রহের সুযোগ পাবে। ভারতের এই উদ্যোগের পেছনে শুধু যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি কাজ করছে না।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শস্য পরিবহনপথ কৃষ্ণসাগর। এই পথে বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে, জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে তেল ও অন্যান্য জ্বালানির বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
ভারত বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটি। তাই জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটলে দেশটির অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে। ফলে জ্বালানি ও বাণিজ্যব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের এই উদ্যোগের সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির জ্বালানি বাণিজ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে। রাশিয়া এখনো ভারতের অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিশোধিত জ্বালানির জন্য দেশটির আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ভারত থেকেও রাশিয়ায় পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
এতে দুই দেশের জ্বালানি খাতে পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা কমানো তাই ভারতের জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও মিসরও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দেশগুলোর স্বার্থ এক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরো বেড়ে যাওয়া ঠেকানো। তুরস্ক চায়, কৃষ্ণসাগর দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্য চালু থাকুক। এতে শস্য পরিবহনসহ আঞ্চলিক বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, মিসরের প্রধান উদ্বেগ খাদ্যনিরাপত্তা। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় শস্য আমদানিকারক। তাই ইউক্রেন থেকে নিয়মিত শস্য আমদানি চালু রাখা মিসরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রস্তাবে এসব বিষয়ের পাশাপাশি জ্বালানি স্থাপনা ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষার চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের ভূমিকা আরো বাড়ানোর সুযোগও দেখছে ভারত। রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রেখে আলোচনার পথ খোলা রাখতে চায় দেশটি।
তবে ভারতের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা রয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন—কোনো পক্ষই মনে করছে না যে তারা নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করেছে। দুই দেশই সামরিক চাপ বজায় রেখে আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়।
এ কারণে যুদ্ধবিরতিতে দুই পক্ষকে রাজি করানো কঠিন হতে পারে। ভারতের প্রস্তাবে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলেও তা রাশিয়া ও ইউক্রেনের সামরিক হিসাব-নিকাশ বদলাতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
তারপরও ভারতের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করে সীমিত সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে যুদ্ধের বাইরেও বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের সুবিধা পেতে পারে। এখন মূল প্রশ্ন, রাশিয়া ও ইউক্রেন নিজেদের সামরিক লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে এসব অর্থনৈতিক সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিতে রাজি হবে কি না। দুই পক্ষের সম্মতি ছাড়া ভারতের এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।


