শিব্বীর আহমেদ, নিউ ইয়র্ক: যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের সভাপতি কাজী আজিজুল হক খোকনের (৫৮) মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি প্রবাসী কমিউনিটিতে। দলমত-নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্নেহের পরশে শেষ বিদায় নিলেন দীর্ঘদিনের এই প্রবাসী রাজনৈতিক সংগঠক। ৯ অক্টোবর, শুক্রবার বাদ জুমা নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসের ডাইভার্সিটি প্লাজায় অনুষ্ঠিত তাঁর জানাজায় হাজারো মুসল্লি ও শোকাহত প্রবাসী অংশ নেন।
জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, পরিচিতজন এবং কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়ে মরহুমের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। দীর্ঘদিনের প্রবাসজীবনে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা খোকনের আকস্মিক মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন তাঁর সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ অক্টোবর কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় বাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কাজী আজিজুল হক খোকন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা না গেলে স্বজন, সহকর্মী ও পরিচিতজনদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। পরে তাঁর সন্ধান চেয়ে পুলিশকে জানানো হয়।
এদিকে, রাজনৈতিক সহকর্মী ও পরিচিতজনেরা বিভিন্ন স্থানে তাঁর খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে ৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের বেলভ্যু মর্গে তাঁর মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ায় স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে শোক আরও গভীর হয়। মাগুরার সন্তান কাজী আজিজুল হক খোকন ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন সংগঠক হিসেবে। তবে অভিবাসনসংক্রান্ত মর্যাদা না পাওয়ায় জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁকে ব্যাচেলর হিসেবেই কাটাতে হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
জানাজার আগে যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের সেক্রেটারি জুয়েল আহমেদ উপস্থিত সবার প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান। খোকনের সঙ্গে কারও কোনো দেনা-পাওনা বা আর্থিক লেনদেন থাকলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি। একইভাবে খোকনের কর্মস্থল জ্যাকসন হাইটসের অবসরের মালিক ও আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন রানা উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, খোকনের আচরণে কেউ কোনো সময় কষ্ট পেয়ে থাকলে তাঁকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান। মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি সহমর্মিতা ও ক্ষমাশীলতার মনোভাব প্রদর্শনের আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি জানান, খোকনের মরদেহের শেষকৃত্যসংক্রান্ত ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশে পাঠানোর যাবতীয় দায়িত্ব বাংলাদেশ সোসাইটি গ্রহণ করেছে। প্রবাসে মৃত্যুবরণ করা একজন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সংগঠনটির এই উদ্যোগ শোকাহত কমিউনিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হয়।
খোকনের জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার অ্যাট-লার্জ অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সেক্রেটারি আব্দুস সামাদ আজাদ, মুখপাত্র ডা. মাসুদুল হাসান, আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, হাজী এনাম, মিসবাহ আহমেদ প্রমুখ।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি ইমদাদ চৌধুরী, স্টেট আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান মিয়া ও সেক্রেটারি শাহীন আজমল, যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের প্রধান উপদেষ্টা আব্দুর রহিম বাদশা, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি এইচ এম ইকবাল ও সেক্রেটারি সৈয়দ কিবরিয়া জামান, সংগঠনটির সাবেক সভাপতি নুরুজ্জামান সর্দার এবং মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ শাহনাজ।
জানাজায় আরও অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহানারা রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু, যুক্তরাষ্ট্র ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদ হাসান ও সেক্রেটারি হৃদয় মিয়া, জেবিবিএর সভাপতি হারুন ভূইয়া ও সেক্রেটারি ফাহাদ সোলায়মান এবং বাংলাদেশ সোসাইটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মহিউদ্দিন দেওয়ান ও সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতি প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে খোকনের পরিচিতি ও তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।
জানাজা শেষে খোকনের মরদেহবাহী গাড়ি নিউইয়র্কের জন এফ. কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (জেএফকে) উদ্দেশে রওনা হয়। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই রাতেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি ফ্লাইটে মরদেহ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করার কথা ছিল। বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর তাঁর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর ও পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল।
এদিকে, খোকনের মৃত্যু এবং তাঁর মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়ে ৮ অক্টোবর রাতে শ্রমিক লীগের আহ্বানে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা নবান্ন পার্টি হলে একত্রিত হন। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রায় ১০ হাজার ডলারের মতো অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জুয়েল আহমেদ ও ডা. মাসুদুল হাসান জানান, সংগৃহীত অর্থের পাশাপাশি খোকনের পকেটে থাকা নগদ অর্থও তাঁর মাগুরায় বসবাসরত ভাই-বোনদের কাছে পাঠানো হবে। এই অর্থ তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
একজন প্রবাসী রাজনৈতিক সংগঠকের আকস্মিক মৃত্যু, কয়েক দিন নিখোঁজ থাকার পর মরদেহ শনাক্ত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সহকর্মী ও কমিউনিটির উদ্যোগে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে ঘটনাটি গভীর আবেগ ও শোকের সৃষ্টি করেছে। খোকনের জানাজায় বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের অংশগ্রহণ এবং তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ প্রবাসী কমিউনিটির পারস্পরিক সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।


