অ্যান্টোয়ান গ্যালোওয়ে মনে করতে পারেন সেই মুহূর্তটা। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি। নিউইয়র্কের ক্লিনটন কারেকশনাল ফ্যাসিলিটি। একজন কারারক্ষীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ দায়ের করার পর সাতজন অফিসার তাঁকে ঘিরে ধরেছিল।

প্রথমে ঘুষি এলো মুখে। তারপর বুকে কিল। স্টিলের বুট দিয়ে লাথি। ব্যাটন দিয়ে আঘাত পায়ের গোড়ালিতে। সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
"আমি মাথা ঢাকার চেষ্টা করছিলাম," ইস্ট ফ্ল্যাটবুশের বাসিন্দা গ্যালোওয়ে, এখন ৪৮ বছর বয়সী, দ্যা সিটি রিপোর্টার নামের সংবাদমাধ্যমকে বলেন। "দুইবার জ্ঞান হারিয়েছিলাম। ফিরে আসছিলাম, আবার হারাচ্ছিলাম। ওরা লাথি মারছিল, পা দিয়ে মাড়াচ্ছিল, জাতিবিদ্বেষী গালি দিচ্ছিল।"
আট বছর পর নিউইয়র্ক স্টেট তাঁকে দেড় লক্ষ ডলার দিয়ে মামলা মিটিয়েছে। বিনিময়ে কোনো দোষ স্বীকার নেই।

দ্যা সিটি রিপোর্টার  একটি তথ্য অধিকার আইনের আবেদনের মাধ্যমে যে নথি পেয়েছে, তা নিউইয়র্কের কারাব্যবস্থার এক অস্বস্তিকর ছবি এঁকেছে। গত পাঁচ বছরে অন্তত ১৭০টি মামলায় রাজ্য সরকার মোট ২৫.৭ মিলিয়ন ডলার — বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৮০ কোটি টাকা — ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। মামলাগুলোতে অভিযোগ ছিল কারারক্ষীদের মারধর থেকে শুরু করে চিকিৎসা অবহেলা, যার ফলে কোনো কোনো বন্দীর অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়েছে।

কিন্তু এই টাকার অর্থ কী? এর অর্থ হলো রাজ্য সরকার আদালতের বাইরে মিটমাট করেছে, দোষ না মেনেও দিয়েছে। যাকে আইনি ভাষায় বলে — নীরব স্বীকারোক্তি। গ্যালোওয়ের আইনজীবী ব্রায়ান ড্র্যাচ বলেন, "আমি রাজ্যের বিরুদ্ধে সবসময়ই মামলা করি। সপ্তাহে দুইবারও করি।" পনেরো বছর ধরে এই কাজ করছেন তিনি। বলেন মামলার সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে।

কিছু গল্প পরিসংখ্যানে আটকায় না। জর্ডান ওয়ার্নারের বয়স যখন ২০, তখন সে নিউইয়র্কের আপস্টেট কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে সাজা খাটছিল। একদিন গলার পাশে দলা দলা মাংস ফুলে উঠতে শুরু করল। ওজন কমছিল। সোজা দাঁড়াতে পারছিল না। রাতে ঘুমালেই ঘামে ভিজে যাচ্ছিল বিছানা।

"আমি প্রতিদিন ডাক্তার দেখাতে চাইতাম," ওয়ার্নার দ্যা সিটি রিপোর্টার-কে বলেন। "পাঁচ মাস ধরে আবেদন করেছি। কারারক্ষীরা বলেছে আমি মিথ্যে বলছি।" সেল দিয়ে ওষুধ বিতরণ করতে আসা নার্সরা তাঁর দরজার সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যেত।

একদিন করিডরে সে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল। তখন নার্স এলো। তখন হাসপাতালে নেওয়া হলো। তিন ঘণ্টা দূরের অ্যালবেনি মেডিকেল সেন্টারে জরুরি অস্ত্রোপচার করে ফুসফুসের চারপাশ থেকে জমা তরল বের করা হলো। তারপর ধরা পড়ল — স্টেজ ফোর-বি হজকিন্স লিম্ফোমা। ক্যান্সারের সবচেয়ে অগ্রসর পর্যায়।

মায়ের জন্মদিনে সে ফোন করল। মা ভেবেছিলেন ছেলে শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করেছে। জর্ডান বলল, মা আমার স্টেজ ফোর ক্যান্সার। একজন আইনজীবী ধর, এখনই। এরপরেও তিনবার কেমোথেরাপি অস্বীকার করার মিথ্যা রিপোর্ট লেখা হয়েছিল কারারক্ষীদের পক্ষ থেকে। "কে বেঁচে থাকার জন্য কেমো নিতে অস্বীকার করে?" ওয়ার্নার জিজ্ঞেস করেন।

২০২১ সালে মামলা করেছিলেন। চার বছর আদালতে লড়াইয়ের পর রাজ্য দিয়েছে ৯ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার। ওয়ার্নার বলেন, "আমি টাকার চেয়ে চেয়েছিলাম যারা দোষী তারা চাকরি হারাক।" ২০২০ সালে মুক্তি পেয়েছেন। সম্প্রতি ছেলের প্রথম জন্মদিন পালন করেছেন। বলেন, "ও দুই বছরের বাচ্চার মতো বড় হয়ে গেছে। সুস্থ, হৃষ্টপুষ্ট।"

দ্যা সিটি রিপোর্টার -এর পাওয়া নথিতে আরও কিছু মামলার বিবরণ আছে যা পড়লে গা শিউরে ওঠে। গ্রিন হেভেন কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে একজন বন্দীকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দেওয়ালে ও লোহার রডে বারবার মাথা ঠুকেছিল একজন রক্ষী। বডি ক্যামেরার ফুটেজ পরে প্রমাণ করে অফিসারদের লিখিত রিপোর্ট মিথ্যায় ভরা ছিল। একজন অফিসার ফেডারেল আদালতে দোষ স্বীকার করেছেন, কিন্তু যে অফিসার মিথ্যা রিপোর্ট লিখেছিলেন তিনি এখনো চাকরিতে আছেন। রাজ্য এই মামলায় দিয়েছে ৮ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার।

ক্লিনটন ফ্যাসিলিটিতে রিকো সান্তানা নামের আরেক বন্দীকে দুটো আলাদা হামলায় দুইবার চোয়ালের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়। প্রথমবার অস্ত্রোপচার এক সপ্তাহ ঠেকিয়ে রাখা হয়। সারার আগেই সাধারণ কক্ষে পাঠিয়ে দেওয়া হয় যেখানে আবার মার খেলেন। রাজ্য দিয়েছে ২ লক্ষ ডলার। ওয়াশিংটন কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে এক বন্দীর অণ্ডকোষে গুরুতর ব্যথা ও ফোলার পরও সময়মতো চিকিৎসা না করায় অবশেষে অস্ত্রোপচার করে অণ্ডকোষটি বাদ দিতে হয়। রাজ্য দিয়েছে ৯০ হাজার ডলার।

গভর্নর ক্যাথি হোকুল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন রাজ্যের ৪৪টি কারা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে সিকিউরিটি ক্যামেরা বসানো হবে। দুই বছর হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত মাত্র ১১টিতে ক্যামেরা বসানো সম্পন্ন হয়েছে। বাকিগুলো "ডিজাইন বা নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে।"

কারা বিশেষজ্ঞ ডিন উইলিয়ামস, যিনি কলোরাডো ও আলাস্কার কারাব্যবস্থা পরিচালনা করেছেন, দ্যা সিটি রিপোর্টার-কে বলেন সুস্থ কারাব্যবস্থায় বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো ব্যতিক্রম হয়। কিন্তু যখন বারবার একই ধরনের অভিযোগ আসে তখন সেটা আর ব্যতিক্রম থাকে না, সেটা হয়ে যায় স্বাভাবিক। "একটা ঘটনা, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা — এটা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু অকার্যকর ব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক হয়ে যায়।"

মামলাগুলো দায়ের থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত গড়ে ছয় বছর সময় লাগে। একটি মামলা ১৫ বছর ধরে চলেছিল — একজন বন্দীকে ১২ দিন বেশি একাকী কারাবাসে রাখার অভিযোগে। শেষ পর্যন্ত রাজ্য দিয়েছে ৭৪৮ ডলার।

অ্যান্টোয়ান গ্যালোওয়ে এখন ইস্ট ফ্ল্যাটবুশে থাকেন। গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্রে কাজ করেন। যে গলিতে বড় হয়েছেন সেখানে বন্ধুদের নিয়ে পাড়ার ছেলেমেয়েদের জন্য উৎসব করেন — খাবার দেন, স্কুলের সরঞ্জাম দেন। বলেন সাঁতার কাটতে ভালো লাগে, ভ্রমণ করতে ভালো লাগে, শান্তিতে থাকতে ভালো লাগে। কিন্তু গোড়ালির ব্যথা যায় না। প্রতিদিন সকালে উঠলেই টের পান।

"আমি কখনো সন্তুষ্ট হব না," তিনি বলেন। "আমি সারাজীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি আর ওরা চাকরি করে যাচ্ছে। আমি জানি ওরা এখনো এই কাজ করে যাচ্ছে অনেকের সঙ্গে। কয়েক হাজার ডলার দিয়ে এটা ঠিক হয় না।" দেড় লক্ষ ডলার পেয়েছেন। বিচার পাননি। পার্থক্যটা ছোট নয়।

# এই প্রতিবেদনটি দ্যা সিটি রিপোর্টার -এর Kennedy Sessions এবং Reuven Blau-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রচিত। ছবি কৃতিত্ব: Ben Fractenberg