ছেলেবেলায় আমার খুব ইচ্ছে ছিলো ঢাকায় যাওয়ার। কিন্তু উপায় ছিলো না। সম্ভাবনাও না। আমার জন্ম যে গ্রামে, তাকে তখন অজপাড়া গাঁ বলাই শ্রেয়। বিদ্যুৎ নেই, রেডিও, টেলিভিশন, পেপার-পত্রিকা নেই। বাড়ির ধারের আড়িয়াল খাঁ নদী তখন আমাদের আনন্দের সর্বময় উপলক্ষ্য। আমরা ছেলেপুলেরা ফুটবল, হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলে কাঁদামাখা শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ি তার প্রমত্তা বুকে। সাঁতার কাটি। জলখেলা খেলি। আরও কত কী! প্রায়ই দেখি তিনতলা বড় লঞ্চ ভেঁপু বাজিয়ে ঢাকায় যাচ্ছে। তাতে সুবেশী যাত্রীর ভিড়। আমাদের বুকের ভেতর তখন কেমন করে ওঠে। সেই কেমন করা জুড়ে ঢাকায় যেতে না পারার আক্ষেপ, লোভ যেমন আছে, তেমনি আছে ঘ্রাণও।
তো সেই আক্ষেপ বা ঘ্রাণ থেকেই আমি একবার অদ্ভুত এক ছেলেমানুষী করে ফেললাম। কাঁদা দিয়ে লঞ্চের গায়ে আমার নাম লিখে দিলাম। একদিন বাদে ঢাকার সদরঘাট হয়ে সেই লঞ্চ আবার ফিরে এলো গ্রামের ঘাটে। আমি অবাক হয়ে দেখি কাদা শুকিয়ে আমার নামটা তখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। সেই নাম হাত দিয়ে ছুঁতেই আমার শরীরজুড়ে কেমন অদ্ভুত এক কাঁপন তৈরি হলো। শিহরণ। আহা, আমি না হলেও আমার নামটাতো ঢাকা শহর ঘুরে এসেছে! ওই অনুভূতি বোঝানোর সাধ্য আমার নেই। তবে আমার শৈশবের সেই ছেলেমানুষী যে নেহাৎ ছেলেমানুষীই ছিল না, তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম আরও অনেক পরে। যখন আমি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছি। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু করে নানান দেশ। তো এই গল্প এখানে কেন? কিংবা আমি কীভাবে বুঝলাম যে ছেলেবেলার সেই ঘটনা নেহাৎ ছেলেমানুষী ছিলো না?
বুঝলাম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ৩৪তম আসর উদ্বোধন করতে এসে। এখানে একটু বলে রাখি, এটি এখন বলা আমার জন্য যতটা সহজ, তখন তা মোটেই এতো সহজ ছিল না। বরং বিষয়টা হজম করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার, কালকিনি থানার, কয়ারিয়া গ্রামের সেই টিনটিনে শিশুটিÑ যে কখনো ঢাকা শহর যেতে পারবে বলেই ভাবেনি, সে কিনা যাচ্ছে নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংল বইমেলা উদ্বোধন করতে! যে বইমেলা উদ্বোধন করেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদ, ড. আনিসুজ্জমান প্রমুখের মতো রথী-মহারথীরা! এবং আমি তার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ উদ্বোধক হতে যাচ্ছি! এই নিয়ে নিজের মধ্যে প্রবল আনন্দ ও উত্তেজনা যেমন ছিল,  ছিল দ্বিধা ও দ্বন্ধও। মুক্তধারা কর্ণধার বিশ্বজিত সাহা যখন এই প্রস্তাব আমাকে দিলেন এবং জানালেন যে মেলা পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের ভোটে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তখন তাঁর সঙ্গে আমার একাধিকবার দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আর তাতে প্রতিবারই তিনি আমার আনন্দ মিশ্রিত উত্তেজনার সঙ্গে আত্মজিজ্ঞাসা নিঃসৃত নানাবিধ সংশয়ের সঙ্গেও পরিচিত হয়েছিলেন। হয়তো অবাকও হয়েছিলেন। কিন্তু একথাওতো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কয়ারিয়া গ্রামের সেই ছেলেটির পক্ষে হুট করেই এমন ঘটনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। তা সে যত বড় স্বপ্নময় প্রাপ্তি বা সম্মানই হোক না কেন!
তো নিউ ইয়র্কের জন. এফ কেনেডি বিমানবন্দরে যেদিন নামলাম, সেদিন একুশে মে। আকাশে ঝকঝকে রোদ। হিমেল হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় গা শিউরে উঠছে। আমি সোয়েটারের ওপর ভারি জ্যাকেট চাপালাম। তারপরও গা শিরশির করছে। এরকম রোদে এর আগে এমন ঠাণ্ডা দেখেছিলাম ব্রাসেলস আর অ্যামস্টারডামে। দীর্ঘ বিমানযাত্রায় ক্লান্ত আমি বিশ্বজিত দাকে দেখে প্রথমেই বললাম, ‘আমার ঘুম পাচ্ছে, দাদা। আমি ঘুমাবো।’
বিশ্বজিত দা হাসলেন। যেন ঘরপালানো কোনো উদ্ভ্রান্ত ক্লান্ত-কিশোর তার সামনে অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে ঘুমানোর জায়গা খুঁজছে। তিনি বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই। সন্ধ্যা অবধি যতটা পারেন ঘুমিয়ে নেবেন।’
আমি আঁতকে উঠলাম, ‘সন্ধ্যা পর্যন্ত কেন? আমার একটানা সাত দিন ঘুমাতে হবে।’
তিনি বললেন, ‘সাত দিন না হলেও সাতটা পর্যন্ত আপনাকে ঘুমানোর অনুমতি দেওয়া হলো।’
আমি কিছুই বুঝলাম না। বললাম, ‘মানে কী! আজতো আর কোনো কাজ নেই।’
তিনি তারপরও জবাব দিলেন না। মৃদু হাসলেন কেবল। আমরা ছুটে গেলাম জ্যামাইকা। সেখান থেকে আমাকে ফোনের সিমকার্ড ও ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনে দিলেন বিশ্বজিত দা। তারপর বললেন, ‘নিশ্চয়ই ক্ষিদে পেয়েছে? কী খাবেন?’
আমি চট করে বলে ফেললাম, পুঁইশাক দিয়ে চিংড়ি মাছ আর ভাত।’
‘আর কিছু না?’
‘উহু। আর কিছু না?’
‘ডাল, পাবদা মাছ, আলুভর্তা, করল্লা ভাজি, ঢেঁড়স ভাজি...।’
তিনি লম্বা তালিকা বলতে লাগলেন। আমি অবাক হয়ে শুনতে লাগলাম। তিনি কী করে জানলেন যে এই বিদেশ বিভূঁইয়েও আমার এসব খাবার খেতে ইচ্ছে করছে?
খাওয়া শেষে যে বাসায় উঠলাম, তা সুনসান নীরব। আমি ছাড়া আর কোনো প্রাণীই সেখানে নেই। তবে সুন্দর গোছানো লিভিং রুম, ডাইনিং, কিচেন, বেডরুম দেখে ভাবলাম এআরবিএনবি হয়তো। কিন্তু সেই ভুল ভাঙল পরে। রাব্বানী ভাইয়ের বাসা এটি। তিনি নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এই ভদ্রলোকের সঙ্গে পরে আমার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের কিছুটা আমি আমার নীলকণ্ঠী উপন্যাসের উৎসর্গপত্রে উল্লেখ করেছি। বাকিটা পরে কখনো বলব। এখন আসি নিউইয়র্ক বইমেলা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে। তার আগে অবশ্য সেদিন সন্ধ্যা সাতটার ঘটনা বলার লোভ সামলাতে পারছি না।
আমাকে রেখে বিশ্বজিত দা কোথায় যেন চলে গেলেন। একা বাসায় আমি দীর্ঘ ঘুমের প্রস্তুতি নিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কী আশ্চর্য! এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে পারলাম না। এটা জেটলেগের কারণে কিনা জানি না। তবে সন্ধ্যা সাতটায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো জ্যাকসন হাইট। তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সেই বৃষ্টিতে জ্যাকসন হাইটের এক রে¯েঁÍারার হলরুমে গিয়ে আমি থতমত খেয়ে গেলাম। সেখানে মঞ্চ প্রস্তুত করা আছে। দর্শকসারীতে অনেক চেনা-অচেনা লোক বসে আছে। মঞ্চে পেছনের দেয়ালে আমার বিশাল ছবি দিয়ে ব্যানার টানানো হয়েছে। সেই ব্যানারে বড় বড় করে লেখা ‘আমাদের প্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের জন্মদিনে শুভেচ্ছা।’ আমি রীতিমতো হকচকিয়ে গেলাম। আজ একুশে মে। আমার জন্মদিন। এই সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারের এক দেশে, স্বজন-পরিজন বিহীন এই আমার প্রথম জন্মদিন, এর আগে পরিবার ছাড়া কখনো জন্মদিন কাটাইনি। স্বভাবতই মন খানিক ভার হয়ে ছিল। বিশেষ করে আমার কন্যা নোরার জন্য। সে অনেকগুলো ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছে। তাতে বলেছে, ‘তুমি নেই তো কী হয়েছে, আমি তোমার জন্মদিনের কেক কেটেছি বাবা। তারপর তোমার ছবির মুখে সেই কেক খাইয়েও দিয়েছে। মা অবশ্য বকা দিয়ে ছবি থেকে কেক মুছে ফেলতে চেয়েছিল। আমি দেইনি। বলেছি, বাবা এসে দেখবে। আমার তোমার জন্য মন কেমন করছে বাবা। ওখানে কি তোমার জন্মদিনে তুমি কেক কাটবে না?’
আমার নোরার কথা মনে পড়ে গেলো। চারদিক থেকে সকলে হইচই করে ছুটে এলো। রঙবেরঙের বেলুন উড়লো। কবিতা, গান, আবৃত্তি শুরু হলো। শুরু হলো আমাকে নিয়ে কী সব সুন্দর সুন্দর কথাও! সেসব শুনে কেমন লজ্জা লাগতে লাগল আমার। কিন্তু একই সঙ্গে বুকের ভেতর অদ্ভুত আর্দ্র এক অনুভবও তৈরি হলো। চোখে খানিক স্যাঁতসেঁতে ভাবও কি? কে জানে! নিশ্চিত নই আমি। হয়তো নোরার কথা মনে পড়েই অমন লাগছে। আমি অবশ্য তা কাউকে বুঝতে দিলাম না। আড়ালে চোখ লুকালাম। তবে ওই ঝলমলে মমতার্দ্র মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার অকস্মাৎ মনে হলো, আমি যেন দেশেই আছি। পরিবারের সঙ্গেই আছি। এই যে মানুষগুলো, তারা সবাই বাংলায় কথা বলে। আনন্দ প্রকাশ করে। উচ্ছ্বসিত হয়। তারা যে ভালোবাসে, তাও বাংলাতেই। সেই ভাষায় আমি লিখি। ভাবি। অনুভব করি। আর সে কারণেই তারা আমায় ভালোবাসে। ওই ভালোবাসার মূল্য আমি কী করে দেব?
২.
৩৪তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার উদ্বোধনের দিন ২৩ মে। বাইশে মে আমি দিনভর ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু হলো না। পরদিন রাতেও না। কে জানে, হতে পারে জায়গা পরিবর্তনের কারণে। আমার স্ত্রী নুসরাত অবশ্য ফোনে বলল, ‘তুমি সম্ভবত বইমেলা উদ্বোধন নিয়ে টেনশন করছো।’
আমি বললাম, ‘কেন টেনশন করব, কেন?’
‘কারণ তোমাকে দেখতে ভীষণ বাচ্চা লাগে।’ হাসতে হাসতে বলল সে ।
‘মানে কী!’ আমি কপালে চোখ তুলে বললাম।  
সে বলল, ‘এতোবড় একটা বইমেলা, তাও এর ৩৪তম আসর, কত কত নামী দামী মানুষ এটি আগে উদ্বোধন করেছেন। এবারও নিশ্চয়ই অনেক বিখ্যাত, বয়স্ক মানুষেরা থাকবেন অতিথির তালিকায়। এসব ভেবে ভেবে তোমার টেনশন হচ্ছে। তাছাড়া, নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশিরা তোমাকে কীভাবে গ্রহণ করবে, সম্ভবত সেটি ভেবেও দুশ্চিন্তা হচ্ছে তোমার। তাই না?’ বলে ঠোঁট টিপে হাসল সে। বলল, ‘সত্যি সত্যিই কিন্তু তোমাকে দেখতে লাগে সদ্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া ছাত্রের মতো...।’
আমি তার কথা অগ্রাহ্য করলাম। অস্বীকারও। বললাম, ‘একদমই তা নয়।’
কিন্তু নুসরাত যা যা বলেছে, তার সবই সত্যি। এসবই সারাক্ষণ কিলবিল করছিল আমার মাথায়। অদ্ভুত রকমের টেনশন হচ্ছিল। দেশের বাইরে বই নিয়ে অতো বড় আয়োজন। অতিথি তালিকায় বিশ্ববরেণ্য বাঙালি ব্যক্তিত্বদের নাম। তারা সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে ভীষণ সফল ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় মানুষ। ছেলেবেলা থেকেই ভাবতাম, ইশ কখনো যদি তাদের কারো সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সুযোগ পেতাম। কথা বলতে পারতাম! তাহলেই বুঝি জীবন ধন্য হতো। অথচ আজ কিনা সেইসব মানুষের উপস্থিতিতে নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইবেলা উদ্বোধন করবো আমি! সবকিছুই কেম স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছিল।
উদ্বোধনের দিন অবশ্য এক পলকে সেই টেনশন কেটে গেল। আর এর পুরো কৃতিত্ব বইমেলা আয়োজক কমিটি ও মেলায় আগত পাঠকদের। আমি গেট দিয়ে ঢুকতেই চারদিক থেকে যেন ছুটে এলো অভাবিত ভালোবাসার অপার স্রোত। জলের কলোরোলের মতো তাদের উচ্ছ্বাস, আবাহন। আমি তাতে অবগাহন করলাম আমার সর্বস্ব নিয়ে। মুহূর্তেই ভুলে গেলাম সকল সংশয়, দ্বিধা, সংকোচ, দুশ্চিন্তা। আমার অকস্মাৎ মনে হলো এরা সবাই আমার চেনা। ভীষণ আপন। পরিবার-পরিজন। এদের সঙ্গে আমার জনম জনমের পরিচয়। একথা অবশ্য মিথ্যেও নয়। আমরা তো সেই একই ভাষায় কথা বলি, ভাবি, ভালোবাসি। অনুভব করি মন ও মানুষ। ভাবনার ভুবন। জীবন ও জগৎ। আমি ফিতা কেটে উদ্বোধন করলাম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বইমেলার ৩৪তম আসর। তুমুল করতালি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো বইমেলা প্রাঙ্গণ।
ততক্ষণে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সঙ্গে তুমুল কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। আমরা তড়িঘড়ি করে খোলা মাঠ থেকে অডিটোরিয়ামের ভেতর ঢুকে পড়লাম। সেখানে অসংখ্য মানুষের ভিড়। অডিটোরিয়ামের ভেতর ও বাইরে যেন উপচে পড়ছে মানুষে। এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে বাংলা বই নিয়ে একটি আয়োজনে এতো মানুষের সমাগত ঘটতে পারেÑ এ আমার কাছে রীতিমতো অবিশ্বাস্য ঠেকতে লাগল। এর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়েছি বই নিয়ে নানা আয়োজনে। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের পর এতো বড় আয়োজন, এতো লোক-সমাগম, এতো উচ্ছ্বাস আর কোথাও দেখিনি।
মূল অনুষ্ঠান ততক্ষণে শুরু হয়েছে। মঞ্চে উপবিষ্ট স্বপ্নের সব মানুষ। অধ্যাপক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, বিশ্ববিখ্যাত কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁর লেখা বিশ্বাবিদ্যালয়ে সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ কোর্সে পড়েছি। এছাড়াও রয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম বীর প্রতীক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মার্কিন বন্ধু ফিলিস টেইলরসহ অসংখ্য গুণী মানুষ। তাদের সঙ্গে একমঞ্চে আসন ভাগাভাগি করাটা আমার এই ক্ষুদ্র লেখকজীবনের বিশাল প্রাপ্তি। সেই প্রাপ্তিতে যোগ হলো উদ্বোধনী বক্তব্যও। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, যখন উদ্বোধনী বক্তব্য দিতে আমার নাম ঘোষণা করা হলো, তখন রীতিমতো ঘামছিলাম আমি। কী বলব কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না। গলাও কাঁপছিল। সেই কাঁপা কাঁপা কণ্ঠেই আমি বলতে শুরু করলাম বহু বছর আগের বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার কয়ারিয়া গ্রামের সেই আদুল গায়ের টিনটিনে ছোট্ট কিশোরের কথা। যে তার ঢাকায় যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে ঢাকাগামী লঞ্চের গায়ে কাদা দিয়ে নিজের নাম লিখে দিয়েছিল। সেই ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে মার্কিন মুলুকের নিউ ইয়র্ক শহরের আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার মঞ্চে উদ্বোধনী বক্তৃতা দিতে। তার এই অবিশ্বাস্য স্বপ্নময় যাত্রা সম্ভব হয়েছে একটি মাত্র কারণে। সেই কারণটি হলো বাংলা ভাষা। এই ভাষায় সে লিখেছে বলেই বিশ্বব্যপী বাংলা ভাষাভাষী মানুষ তার লেখা পড়েছে। পড়ে আন্দোলিত অনুভব করেছে। একাত্ম বোধ করেছে। প্রবল গভীর স্পর্শে স্পর্শিত হয়েছে। তাকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়েছে। করেছে তাদের দিনযাপনের গহীন গোপন একান্ত অনুভবের সঙ্গী। সুতরাং সেই ভাষার প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আমি আমার বক্তব্য শেষ করলাম। আর সংশয়চিত্তে ভাবছিলাম, কী বলেছি আমি? এই বক্তব্য কি এখানকার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? উপস্থিত অতিথি ও দর্শকরা কি বিরক্ত হয়েছেন? কিংবা পছন্দ করেছেন আমার কথা? নাকি আমার ওই ভীরু, কাঁপা, সন্ত্রস্ত কণ্ঠস্বর শুনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন? কিন্তু আমার সব শঙ্কা, দ্বিধা মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উবে গেল। কারণ, বক্তব্য শেষ হতে না হতেই পুরো হলরুম ভর্তি প্রতিটি মানুষ তুমুল করতালিতে ভাসিয়ে দিলেন চারপাশ। চিৎকার করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন। তাদের সেই চিৎকার, হর্ষধ্বনি যেন আমার কানে সুমধুর সঙ্গীত হয়ে উঠলো। হয়ে উঠল অদ্ভুত অপার্থিব সুরের মুর্চ্ছনা।
৩.
পরের দিনগুলো হয়ে রইলো চির অমলিন স্মৃতির সোনালি স্বাক্ষর।  বিশ্বজিত দা মুক্তধারার স্টল দিয়েছেন বইমেলায়। সেখানে আমার বই আছে। আমি সেই স্টলে গিয়ে দাঁড়ালাম। আর তারপর অভূতপূর্ব এক দৃশ্যের সূচনা হলো। মুক্তধারা ঘিরে নানা বয়সী পাঠকের উপচে পড়া ভীড় হলো। তারা লাইন ধরে আমার বই, স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে লাগল। সঙ্গে সেলফি তো আছেই। দেখতে ছোট্ট কিশোরী এক মেয়ে এতো বই কিনল যে দু’হাতেও তুলতে পারছিল না সে। আমি তাকে বললাম, ‘কাউকে বলব গাড়িতে পৌঁছে দিতে?’
সে বলল, ‘না। আমি নিজেই এই বইগুলো ক্যারি করতে চাই। এগুলো আমার কাছে বিশেষ কিছু।’
আমার আচমকা মনে হলো, বাংলাদেশের অমর একুশে বইমেলা আর প্রায় সাড়ে সাত হাজার মাইল দূরের ওই নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বইমেলাকে যেন আলাদা করতে পারছিলাম না আমি। সেইতো চেনা সব মুখ। চেনা সব কথা। চেনা অনুভব। চেনা ব্যকুলতা। সেইতো ভালোবাসায় আর্দ্র চোখ। সেইতো বাংলা ভাষা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ মানুষ। এসবই আমার ভীষণ আপন। ভীষণ কাছের। গোপন গহীন অনুভব। আমি তাতে আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম। প্রতিটি মুহূর্ত শুষে নিতে থাকলাম তৃষ্ণার্ত পথিকের মতন। আর বুক ভরে টেনে নিতে চাইলাম স্বপ্নের সুবাস।
বিশ্বজিত দা বইমেলার প্রায় প্রতিটি দিন আমার সেশন রেখেছিলেন মঞ্চে। তাতে পাঠকের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব যেমন ছিল, তেমনি ছিল বিভিন্ন লেখকদের সঙ্গে আড্ডা, গল্প, সাহিত্য আলোচনা ও ভাবনা বিনিময়ও। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলা ভাষার কত কত লেখক যে এসেছেন এই মেলায়! তাদের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হল। আলোচনা হলো বই নিয়ে। সেসব মুগ্ধ হয়ে শুনলাম।  সঙ্গে নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি, গানতো ছিলই। এ যেন আস্ত এক বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি। সেই প্রতিচ্ছবি বুকে জমিয়ে রাখলাম সযত্নে। যখন খুব মন খারাপ হবে, কোনো কিছু নিয়ে বিষাদাক্রান্ত হবো তখন ওই ছবি, ওই অনুভব বুকের গহীন কোণ থেকে আলগোছে বের করে আনবো। আর তারপর রোমন্থন করব পরম মমতায়। ভালোবাসায়। ভাষায়।
প্রিয় নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা, এই যাত্রা অন্তহীন হোক। ছড়িয়ে পড়ুক প্রাণে প্রাণে, গানে গানে, ঘ্রাণে ঘ্রাণে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক