মেটা লুলার অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কিছু কারিগরি সমস্যার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পক্ষের নির্বাচনী প্রচারণা প্রভাবিত হয়েছিল।
আগামী রবিবার (২৫ অক্টোবর) দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের কয়েক দিন আগে এ বিতর্ক লুলা ও বোলসোনারোর মধ্যকার নির্বাচনী লড়াইকে আরো উত্তপ্ত করে তোলে। মেটার তত্ত্বাবধায়ক বোর্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বারবার নীতিমালা প্রয়োগে ব্যর্থতার ঘটনা তাদের উদ্বিগ্ন করেছে। বোর্ডটি আধা-স্বাধীন সংস্থা এবং এর সিদ্ধান্ত মেটার জন্য বাধ্যতামূলক।
বিবৃতিতে ব্রাজিলের নির্বাচন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘নো কিংস’ আন্দোলনের একটি ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোট দিতে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত বিক্ষোভের সময় আন্দোলনটির একটি অ্যাকাউন্ট কয়েক ঘণ্টার জন্য স্থগিত করা হয়েছিল।
মেটা জানায়, তাদের জালিয়াতি শনাক্তকরণব্যবস্থা ভুলবশত অ্যাকাউন্টটির কার্যক্রমকে বটের মাধ্যমে পরিচালিত বলে চিহ্নিত করেছিল। এ ভুলের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ক্ষমা চেয়েছে। বোর্ডটি আরো জানায়, ব্রাজিলেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নির্বাচনী প্রচারণার বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্টটি এক ঘণ্টারও বেশি সময়ের জন্য নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়।
বোর্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে মেটার জালিয়াতিবিরোধী নীতিমালা অতিরিক্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল। মেটা জানায়, জালিয়াতিবিরোধী পর্যালোচনার সময় একটি বিজ্ঞাপনকে ভুলবশত সরকারি সামাজিক কর্মসূচির পরিচয় ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অ্যাকাউন্টটি নিষ্ক্রিয় করার ঘটনা ছিল অনিচ্ছাকৃত এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না।
মেটার তত্ত্বাবধায়ক বোর্ড বলেছে, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ বা প্রচারণায় বাধা দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। তাই মেটাকে স্বচ্ছভাবে কাজ করতে হবে এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
থিংকট্যাংকের সমন্বয়কারী জোয়াও ভিক্টর আর্কেগাস বলেন, মেটা ব্রাজিলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা কঠিন। কারণ, কম্পানির অভ্যন্তরীণ তথ্য বাইরের কারো কাছে নেই।
এদিকে গুগল ও টিকটক রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখায় ব্রাজিলের নির্বাচনে অর্থের বিনিময়ে প্রচারণার জন্য মেটাই প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এ নির্বাচনে মেটার আয় হয়েছে ৪ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড, যা গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি।
মেটার হোয়াটসঅ্যাপের সাবেক এক কর্মকর্তার প্রতিষ্ঠিত নজরদারি সংস্থা সিটিআরএল প্লাস ডেড-এর প্রতিবেদনে বামপন্থী প্রোফাইলগুলোর বিরুদ্ধে এক হাজার ১২১টি অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে পোস্টের প্রচার কমানো, শেয়ারে বাধা এবং অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার বিষয় রয়েছে। তবে মেটা বলেছে, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ধারণার ভিত্তিতে করা অভিযোগ।
সংবাদমাধ্যমের এক পরীক্ষায় দেখা যায়, হোয়াটসঅ্যাপের এআই সহকারী লুলার নাম ও নির্বাচনী প্রতীক দিয়ে ছবি তৈরি করতে অস্বীকার করলেও ফ্লাভিওর ক্ষেত্রে তা করেছে। মেটা জানিয়েছে, এটি রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়, বরং তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি ত্রুটি।
লুলার সমর্থকদের অভিযোগ, মেটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ নিয়ে ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। লুলার আইনজীবীরাও মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, গত ৯ অক্টোবর লুলার প্রচারণার পোস্ট প্রায় ২৪ ঘণ্টা প্রচার করা যায়নি, অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বোলসোনারোর প্রচারণা স্বাভাবিক ছিল।
তবে মেটা বলেছে, এটি ছিল বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত সমস্যা, রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সব প্রার্থী ও দলের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ করা হয়।
এদিকে নেটল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেটা ব্রাজিলের বাইরে থেকে অন্তত ১ হাজার ৬০০টি নির্বাচনী বিজ্ঞাপনের প্রচার বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছে, যা দেশটির আইনবিরোধী। সংস্থাটি আরো কিছু ভুয়া বিজ্ঞাপন শনাক্ত করেছে, যেখানে অনলাইনে ভোট দেওয়ার মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়েছিল।
নেটল্যাবের সমন্বয়কারী ডেবোরা সালেস বলেন, মেটার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রমাণ না মিললেও নির্বাচনী আইন মানা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতা উদ্বেগজনক।