ফ্রান্সে যখন গির্জার চূড়ায় আগুন জ্বলতে এবং চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পাবে, তখন মনে রেখো, কট্টর ডেমোক্র্যাটরা আমেরিকার সঙ্গে এমনটাই করতে চায়।’
ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের বিদ্রূপ করে ‘ডুমোক্র্যাটস’ বলে ডাকেন। অভিবাসী ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে তার বক্তব্যের সমালোচনা করে আসছেন অধিকারকর্মীরা। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এ ধরনের বক্তব্য বৈষম্যমূলক মনোভাবকে উৎসাহিত করতে পারে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কানসাসে ১৬ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। গত ৯৪ বছরে এই রাজ্য থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত হননি। তবে এবার রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শাল কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন। তিনি একটি বড় মেথডিস্ট গির্জার যাজক।
হ্যামিলটন ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরোধিতা করেছেন। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বকে ‘খামখেয়ালি’ বলে সমালোচনা করেছেন। হ্যামিলটনকে আক্রমণ করে ট্রাম্প বলেন, ‘শ্বেতাঙ্গ হয়ে জন্মানোর জন্য তিনি চান আপনারা অনুতপ্ত হন।’
সমাবেশে মার্শালও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় সামনে আনেন। এর মধ্যে ছিল ‘কট্টর ইসলামের’ বিস্তার ঠেকানোর দাবি। সমকামীদের অধিকার ও গর্বের মিছিলের প্রতি সমর্থন দেওয়ায় হ্যামিলটনকে কানসাসের জন্য ‘অতিরিক্ত উদারপন্থী’ বলে মন্তব্য করেন মার্শাল। এ সময় সমাবেশে উপস্থিত লোকজন দুয়োধ্বনি দেন।
মার্শাল বলেন, ‘আমাদের এমন একজনকে দরকার, যিনি গরু ও ষাঁড় সামলাতে পারেন।’ এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হ্যামিলটনের নির্বাচনী প্রচারশিবির তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। সোমবার প্রকাশিত এক ভিডিওতে হ্যামিলটন ট্রাম্পকে কানসাসে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ট্রাম্পের সমর্থকদেরও তার নির্বাচনী প্রচারে স্বাগত জানানো হবে।
হ্যামিলটন বলেন, যেসব বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে তিনি সহযোগিতা করবেন। তবে ওয়াশিংটনের নীতির কারণে কৃষক ও গ্রামীণ এলাকার হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি কানসাসের মানুষের পক্ষে দাঁড়াবেন।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চেষ্টা করছে দলটি। ট্রাম্প টানা ৩২ দিনের নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে যেসব এলাকায় তিনি বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সেসব এলাকায় বারবার যাচ্ছেন তিনি।
ট্রাম্পের নির্বাচনী কৌশল সম্পর্কে জানেন, এমন এক রিপাবলিকান নেতা বলেছেন, গ্রামীণ এলাকায় ট্রাম্পের বাড়তি মনোযোগের পেছনে দলের অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপের ফল রয়েছে। ওই জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ এলাকায় ৫৫ বছর বা তার কম বয়সী পুরুষদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কিছুটা কমেছে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ে এই ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সোমবার প্রকাশিত রয়টার্স ও ইপসোসের জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। তার বর্তমান মেয়াদে এটি সর্বনিম্ন সমর্থনের হার।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিটি কক্ষে নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি।
কানসাসের উইচিটা শহরের কাছে পার্ক সিটিতে সমাবেশে যোগ দিতে অনেককে আন্তঃরাজ্য মহাসড়ক ১৩৫ পেরিয়ে এক মাইলেরও বেশি পথ হেঁটে যেতে হয়। সমাবেশস্থলের কাছে একটি জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্রের সাইনবোর্ডে পেট্রল ও ডিজেলের দাম দেখানো হচ্ছিল। সেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ছিল ৩ ডলার ৯৮ সেন্ট এবং ডিজেলের দাম ৫ ডলার ৭৮ সেন্ট।
ভ্রমণবিষয়ক সংস্থা এএএর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় কানসাসে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের মধ্যেও অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। কানসাসের হাচিনসন এলাকার ৫৯ বছর বয়সী রিপাবলিকান ভোটার মনিক মুলেন প্রতিবন্ধী ভাতা পান এবং তার বাবার দেখাশোনা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। আমার হাতে খুব বেশি টাকা নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম এখনো বাড়ছে। এসব দাম কমানো দরকার। খাবার জোগাড় করতে এখন মনে হয় যেন খুঁজে খুঁজে শিকার করতে হচ্ছে।’ সমাবেশস্থলের কাছে অল্প কয়েকজন বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তাঁদের একজন কানসাসের হালস্টেড এলাকার বাসিন্দা জেমস নাইটিঙ্গেল। তিনি নিজেকে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ বলে পরিচয় দেন।
নাইটিঙ্গেল বলেন, ‘আমি কানসাসের একজন কৃষক। ট্রাম্প প্রশাসন আমার এলাকার কৃষি অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তার শুল্কনীতির কারণে শস্য বিক্রির বাজার শুধু ধ্বংসই হয়নি, এখন তিনি দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা গরুর মাংসও নিয়ে আসছেন। ‘সবার আগে আমেরিকা’ নীতির কী হলো?’
কানসাসে দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়েও ভোট দেওয়ার নজির রয়েছে। রাজ্যটির ভোটাররা টানা দুই মেয়াদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী লরা কেলিকে গভর্নর নির্বাচিত করেছেন। কানসাসের টোয়ান্ডা এলাকার ট্রাম্প-সমর্থক জিনা সিম্যান বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এখানে নির্বাচনে জয়ী হওয়া কখনোই সহজ।’ তিনি বলেন, অতীতে রিপাবলিকান প্রার্থীরা অনেক সময় নিজেদের জনপ্রিয়তাকে নিশ্চিত বলে ধরে নিয়েছেন।