শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক: বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কর্মকর্তা পর্যায়ের ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল।
আগামী ২৬ থেকে ২৮ আগস্ট তিন দিনের সফরে মার্কিন প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবে। বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রতিনিধিদলের সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের সিনিয়র লেজিসলেটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট নোয়েল ডেইনা (Noelle Daina) প্রতিনিধিদলটির নেতৃত্ব দেবেন। সফরে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর দুই কর্মকর্তাও প্রতিনিধিদলের সঙ্গে থাকবেন। ইউএনএইচসিআরের ওয়াশিংটন কার্যালয়ের ন্যান্সি জ্যাকসন (Nancy Jackson) সফরটি সমন্বয় করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উখিয়ায় ছয়, টেকনাফে দুই ক্যাম্প
সফরসূচি অনুযায়ী, ২৬ ও ২৭ আগস্ট উখিয়ার ছয়টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবে মার্কিন প্রতিনিধিদল। এরপর ২৮ আগস্ট টেকনাফের দুটি ক্যাম্পে যাবে তারা। পরিদর্শনের সময় ক্যাম্পগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি, রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে সরেজমিনে ধারণা নেওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের ব্যবহার দেখবে প্রতিনিধিদল
আরআরআরসি কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, দেশটির করদাতাদের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচি কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা সরেজমিনে দেখতে প্রতিনিধিদলটি ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করবে। মিজানুর রহমান এই সফরকে অনেকটা ‘অডিটের মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন।
দীর্ঘ হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযান, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের মুখে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়। এর আগে থেকেই সেখানে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাস করছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আরও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৩ লাখ ছাড়িয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বাংলাদেশ নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে আসছে। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে প্রত্যাবাসন এখনো অনিশ্চিত। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরাও কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। এসব সফরে রোহিঙ্গাদের মানবিক পরিস্থিতি এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির দৃষ্টি
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও রোহিঙ্গা সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ইস্যু। বিশেষ করে নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা এবং সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকার দাবি জানিয়ে আসছেন। মার্কিন কংগ্রেসের কর্মকর্তা পর্যায়ের এই সফর তাই বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের আরও প্রত্যক্ষ ধারণা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তিন দিনের সফরে ক্যাম্পের বাস্তব পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত মানবিক কর্মসূচি এবং রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনীয়তা পর্যবেক্ষণের পর প্রতিনিধিদলটি তাদের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরবে বলে আশা করা হচ্ছে।


