প্রায় চার মাসের সংঘাত বন্ধে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে যুদ্ধ বন্ধে চূড়ান্ত আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইসরায়েলের অবস্থান—এই চার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু দুই দেশের মধ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাই বাড়ছে আগ্রহ ও অনিশ্চয়তা।

 

এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের নেতারা সম্প্রতি একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সম্মতি দিয়েছেন। তবে নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

 

পারমাণবিক কর্মসূচি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ–
আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।

ট্রাম্প এরই মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের অঙ্গীকারের কথা প্রচার করেছেন, কিন্তু তা মূলত তেহরানের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতিরই পুনরাবৃত্তি।

 

মূল বিরোধ দেখা দিয়েছে ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র চায় এসব ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হোক অথবা ধ্বংস করা হোক। অন্যদিকে ইরান এ দুই প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করেছে, যদিও উপাদানটির ঘনত্ব কমানোর বিষয়ে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছে।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো ভবিষ্যতে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম। ওয়াশিংটন এক পর্যায়ে ইরানে সম্পূর্ণভাবে সমৃদ্ধকরণ বন্ধের দাবি জানালেও তেহরান বলছে, তারা নিজেদের এ অধিকার ছাড়বে না।

 

 

সূত্রগুলোর দাবি, উভয় পক্ষ ৫ থেকে ২০ বছরের সম্ভাব্য স্থগিতাদেশ নিয়ে আলোচনা করেছে, তবে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। এ ছাড়া ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আওতায় থাকা আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থাও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তা–
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের সংকট তৈরি হয়।

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী শুক্রবার থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।

 

তবে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় প্রণালিটি টোলমুক্ত থাকুক, কিন্তু ইরান বলছে, যুদ্ধের পর অর্জিত প্রভাব বজায় রাখতে তারা এর ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখবে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দ সম্পদ নিয়ে মতপার্থক্য–
ইরান দ্রুত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ভিত্তিতে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে।
 

মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রকাশ করা সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরানকে অবিলম্বে আবার তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচকদের মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অতিরিক্ত ছাড় দিচ্ছে।

ইসরায়েল কি বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এরই মধ্যে স্পষ্ট করেছেন, লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কোনো চুক্তি ইসরায়েলের জন্য বাধ্যতামূলক হবে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের অবস্থান ভবিষ্যৎ সমঝোতার বাস্তবায়নে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। আসন্ন বৈঠকে কোনো অগ্রগতি অর্জিত হবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে গভীর মতপার্থক্য থাকায় চূড়ান্ত সমঝোতার পথ এখনো কঠিন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সূত্র : রয়টার্স