ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ব্রিকস জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা দিল্লিতে দুই দিনের বৈঠক করলেও শুক্রবার কোনো যৌথ বিবৃতি দিতে পারেননি। এর বদলে ভারত শুধু সভাপতির পক্ষ থেকে একটি আলাদা বিবৃতি প্রকাশ করে।
ইরান চাইছিল, ব্রিকস জোট যেন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের নিন্দা জানায়। এ ছাড়া ইরান অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই সামরিক অভিযানে জড়িত। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কয়েকবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ভারতের প্রকাশ করা বিবৃতিতে বলা হয়, পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভিন্নমত ছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম না নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ব্রিকসের একটি সদস্য দেশ বিবৃতির কিছু অংশ আটকে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ওই দেশের সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। চলমান যুদ্ধে তারা আমাদের লক্ষ্য ছিল না।
তিনি আরো বলেন, বছরের শেষ দিকে ব্রিকস নেতাদের বৈঠকে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘আমি আশা করি, শীর্ষ সম্মেলনের সময়ের মধ্যে তারা বুঝতে পারবে যে ইরান তাদের প্রতিবেশী। আমাদের একসঙ্গে থাকতে হবে। আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাস করেছি এবং ভবিষ্যতেও একসঙ্গে থাকতে হবে।
ভারতের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো নিজ নিজ জাতীয় অবস্থান তুলে ধরেছে এবং বিভিন্ন ধরনের মতামত ভাগাভাগি করেছে। এসব মতামতের মধ্যে ছিল দ্রুত সংকট সমাধানের প্রয়োজনীয়তা, আলোচনা ও কূটনীতির গুরুত্ব এবং বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানানোর বিষয়। বৈঠকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা, আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপদ ও বাধাহীন বাণিজ্য নিশ্চিত করা এবং বেসামরিক স্থাপনা ও মানুষের জীবন রক্ষার গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, গাজা উপত্যকা অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা পশ্চিম তীর ও গাজাকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে একত্র করার গুরুত্বের কথাও বলেছেন। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবির প্রতি আবারও সমর্থন জানানো হয়েছে।
তবে বিবৃতিতে কারো নাম না উল্লেখ করে বলা হয়, গাজা ইস্যুতে কিছু বিষয়ে একজন সদস্য দেশের আপত্তি ছিল। ২০২৬ সালের ব্রিকস সভাপতি দেশ হিসেবে ভারতের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট মোকাবেলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সদস্যরা।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘গ্লোবাল সাউথ ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।’ এতে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো বর্তমানে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক মন্দা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, সংরক্ষণবাদী নীতি এবং অভিবাসন সংকটসহ নানা আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব ভারতের ওপরও পড়েছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা দেশ হওয়ায়, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যকর অবরোধে ভারত বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে। সাধারণ সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
এই জলপথে ইরানের হামলার সঙ্গে অন্তত তিনজন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এই সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দিল্লি যাওয়ার পথে ভারতের পতাকাবাহী একটি জাহাজও ডুবিয়ে দেওয়া হয়।
শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে সংক্ষিপ্ত সফরে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উপসাগরীয় দেশটির ওপর হামলার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ‘যেভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই কঠিন পরিস্থিতিতে আপনারা যে সংযম ও সাহস দেখিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’


