নিউইয়র্ক: বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান ও প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির র‍্যাঙ্কিং মেম্বার গ্রেগরি মিক্স। ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় মিক্স আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব পেলে বাংলাদেশ সফর করে সেখানকার সামগ্রিক পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ এবং কংগ্রেসের মাধ্যমে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার উদ্যোগ নেবেন। গ্রেগরি মিক্স বলেন, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর তিনি আরও পাঁচ কংগ্রেসম্যানের সঙ্গে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ওই চিঠিতে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে, তা দৃশ্যমান করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। মিক্সের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং ত্রুটিপূর্ণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনরায় চালু করার মতো পদক্ষেপ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সহায়ক হবে কি না, সে বিষয়ে চিঠিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনের শাসন কার্যকর রাখা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন এই কংগ্রেসম্যান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাউয়ের বিরোধ এবং হোয়াইট হাউস ও এয়ার ফোর্স ওয়ানে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রবেশাধিকার নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানান। মিক্সের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রেও ভিন্নমত প্রকাশকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং অভিবাসনসংক্রান্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা স্তব্ধ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত নীতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। মিক্স বলেন, আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হলে যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অন্যায়, অবিচার ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি চান দেশটির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক। পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ ও উদ্বেগ সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ’৭১ ও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুল কাদের মিয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কুইন্স ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার ড. দীলিপ নাথ। বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এ মোমেন এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন। তাঁরা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও হয়রানি এবং মিথ্যা মামলার ঘটনা ঘটছে। তাঁদের দাবি, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা এবং সরকারের সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা ও চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। তাঁদের মতে, এসব পরিস্থিতি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। সভায় বক্তারা আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মধ্যবর্তী নির্বাচন আয়োজন এবং কথিত হত্যা মামলায় আটক সাংবাদিকসহ রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে কংগ্রেসের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে আসা কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্সকে উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানান সভার সভাপতি আব্দুল কাদের মিয়া। এ সময় উপস্থিত ব্যক্তিরা করতালির মাধ্যমে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। সমাবেশের মঞ্চে আরও উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. ফজলুল হক, ব্রুকলিনের বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টারের সভাপতি আলহাজ আবুল হাশেম, সমাজসংগঠক এনামুল হক শামীম, আমিনুল ইসলাম আমিন এবং নজরুল ইসলাম বাবু। মতবিনিময় সভার কো-হোস্ট ছিল যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদ, সন্দ্বীপ পৌরসভা কল্যাণ সমিতি এবং হক মেডিক্যাল অফিস। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন লেখক, কলামিস্ট ও সম্পাদক নঈম নিজাম; বিশ্ববাংলা টোয়েন্টিফোর টিভির সিইও আলিম খান আকাশ; সাংবাদিক সুলতানা রহমান; বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক লাবলু আনসার; সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেন সবুজ; জাগো প্রহরীর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ড. মাহাব্বুর রহমান টুকু; শেখ কামাল স্মৃতি পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাসুদুল হাসান; সন্দ্বীপ অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সিরাজুল মাওলা; সংগঠনটির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম বাবুল; সন্দ্বীপ পৌরসভা কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. জাফরউল্লাহ; সন্দ্বীপ এডুকেশন অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটির সভাপতি মোশারফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হামিদ ও কোষাধ্যক্ষ আহসান উল্লাহ সাকী। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন কমিউনিটি লিডার মোবাশ্বের হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদির মিয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী সরাফ সরকার, সমাজসংগঠক সাখাওয়াত আলী, ব্যবসায়ী ও সমাজসংগঠক ইফজাল চৌধুরী, চট্টগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফ, বাউরিয়া জনকল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা আবুল কাশেম, একাত্তর জেনোসাইড ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. প্রদীপ কর, কমিউনিটি লিডার আব্দুল জলিল, আফসার মোহাম্মদ, আবু তাহের এম রহমান, ইয়াসিন আরাফাত বাপ্পি, রাজনীতিক বাকের ভূঁইয়া, ডেমোক্র্যাট মোর্শেদ আলম, ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী ও ইমদাদ চৌধুরীসহ অনেকে। উপস্থিত অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন মিঠু। কংগ্রেসম্যানের নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের সমন্বয় করেন নাভার সভাপতি দীপা নাথ ও লিন্ডা র‍্যাম্পারটেব। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান সমাপনী বক্তব্যে অনুষ্ঠানের সভাপতি আব্দুল কাদের মিয়া উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, প্রিয় মাতৃভূমিকে অপশাসন থেকে মুক্ত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় তিনি জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করেন।