১১ সেপ্টেম্বরের হামলার ঠিক ৯ দিন পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন।
পরবর্তী ২৫ বছরে আটলান্টিকের উভয় পারেই বেশ কিছু গোয়েন্দা সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার ঘটনাও ঘটেছে। সাফল্যের মধ্যে রয়েছে নস্যাৎ করে দেওয়া ষড়যন্ত্র, সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার, বিচারে সোপর্দ করা এবং দণ্ড প্রদান।
পরবর্তী ২৫ বছরে আটলান্টিকের দুই পারেই গোয়েন্দা সাফল্যের পাশাপাশি বেশ কিছু ব্যর্থতার চিত্রও দেখা গেছে। নস্যাৎ হওয়া ষড়যন্ত্র, সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার, বিচারে সোপর্দকরণ এবং অপরাধীদের দণ্ড প্রদান—এসবই ছিল তাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
তবে সার্বিক চিত্রটি কী বলে? গত ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সন্ত্রাস দমন ও কৌশলগত পরিকল্পনায় কী রূপ পরিবর্তন এসেছে?
বড় গোয়েন্দা ব্যর্থতা
৯/১১ ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কল্পনাশক্তির অভাব ও মারাত্মক ব্যর্থতার। তৎকালীন সময়ে সিআইএ ও এফবিআইয়ের কাছে থাকা তথ্যগুলো সঠিকভাবে শেয়ার করা হলে এই হামলা সহজেই ঠেকানো যেত।
পরবর্তীতে প্রকাশিত '৯/১১ কমিশন রিপোর্ট'-এ মার্কিন সরকারের "কল্পনাশক্তি, নীতি, সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা"-কে দায়ী করা হয়। এতে বলা হয়, সিআইএ ও এফবিআই গোয়েন্দা তথ্য সঠিকভাবে মূল্যায়ন, পারস্পরিক আদান-প্রদান এবং হামলাটি নস্যাৎ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
পরবর্তীতে এই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা বেশ জোরদার করেছে। এখন আর যুক্তরাজ্যের এমআই৫ (MI5) ও পুলিশ কাউন্টার টেররিজমের মধ্যে পুরনো প্রতিযোগিতা নেই। আঞ্চলিক 'ফিউশন সেন্টার' ও লন্ডনের 'কাউন্টার টেররিজম অপারেশনস সেন্টার'-এর মাধ্যমে এখন এমআই৫ কর্মকর্তা, পুলিশ অফিসার, এফবিআই এজেন্ট ও জিসিএইচকিউ (GCHQ)-এর ভাষা বিশেষজ্ঞরা এক ছাদের নিচেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন।
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ও অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিতে 'ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার' গঠন এবং 'ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স' পদ সৃষ্টি করা হয়। বর্তমানে মার্কিন সিআইএ ও ব্রিটিশ এমআই৬-এর সম্পর্ক বিশ্বের সবচেয়ে নিবিড়। এর পাশাপাশি 'ফাইভ আইজ' জোটে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় হয়ে থাকে।
টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার পর থেকে গোয়েন্দা তথ্য মূল্যায়ন ও কৌশলগত পরিকল্পনায় বেশ কিছু মারাত্মক ব্যর্থতা লক্ষ্য করা গেছে। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আক্রমণের প্রাক্কালে এমআই৬ তাদের গোয়েন্দা তথ্যকে রাজনীতিকরণের সুযোগ দেয়। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে কিম ফিলবিসহ অন্যান্য সোভিয়েত চরদের বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনার পর, এটিই ছিল এমআই৬-এর জন্য সবচেয়ে বড় ভাবমূর্তি সংকট।
ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে তখনও 'গণবিধ্বংসী অস্ত্র' (WMD) আছে—এমন প্রমাণ জোগাড়ের জন্য ওয়াশিংটন থেকে তীব্র রাজনৈতিক চাপ ছিল। এর প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সরকারকে এমন কিছু গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে এমআই৬, যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়। অতীতে ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকলেও ১৯৯১ সালের গালফ ওয়ারের (উপসাগরীয় যুদ্ধ) পরপরই সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছিল।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর, এমআই৬ তাদের ফিল্ড এজেন্টদের মাধ্যমে প্রাপ্ত কাঁচা গোয়েন্দা তথ্য (CX) মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়াটি নতুন করে ঢেলে সাজায়। বর্তমানে সংস্থাটিতে এজেন্ট পরিচালকদের (যারা ইরান, উত্তর কোরিয়া বা আল-কায়েদার মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের তথ্য সংগ্রহ করেন) সঙ্গে রিপোর্ট দলের (যাদের কাজ সংগৃহীত তথ্য যাচাই-বাছাই ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করা) সুস্পষ্ট বিভাজন রয়েছে।
ইরাক যুদ্ধে ডিভিশনাল কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জেনারেল স্যার রিচার্ড শিরেফ বলেন, "২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধটি ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত। আমরা কি এই ভুল থেকে কিছু শিখতে পেরেছি? না, আমার মনে হয় শেখার ব্যাপারে আমরা ভীষণ দুর্বল। এক জন কমান্ডার হিসেবে আমার কাছে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল যে, আমরা মূলত একটি কৌশলগত ব্যর্থতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।"
ইরাক আক্রমণের পর পরবর্তীতে আবারও তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল 'বাটলার রিভিউ'। এই রিভিউতে সিদ্ধান্ত টানা হয় যে, ইরাকের কথিত গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচির বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের গোয়েন্দা তথ্যগুলো ছিল "মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং তা অসত্য বা যাচাইহীন উৎসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল।"
অন্যদিকে, সন্ত্রাসী পরিকল্পনা নস্যাৎ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এমআই৫ ও নানা সাফল্যের পাশাপাশি বেশ কিছু ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছে। ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির মহা-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা লর্ড জোনাথন ইভান্সের মতে, "৯/১১-এর হামলার পর তৎকালীন মূল্যায়ন ছিল যে, যুক্তরাজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হলো আল-কায়দা এবং তার সহযোগী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো।"
তবে সেই সময়ে ২০,০০০-এরও বেশি "সন্দেহভাজন ব্যক্তির" বিশালাকার ডাটাবেস এবং একসঙ্গে অসংখ্য তদন্ত চলায় এমআই৫-কে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতো যে, কোন সূত্রটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে তারা সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়নি।
২০০৫ সালে লন্ডনে সংঘটিত ৭/৭-এর আত্মঘাতী বোমা হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয় এমআই৫, এতে ৫২ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। এর মূল পরিকল্পনাকারী মোহাম্মদ সিদিক খানের বিষয়ে সংস্থাটি অবগত থাকলেও, তিনি কী ভয়াবহ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন—সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। ২০১৭ সালের ম্যানচেস্টার অ্যারেনা বোমা হামলাও ছিল এই সংস্থাটির আরেকটি সাম্প্রতিক বড় ব্যর্থতা।
বর্তমানে সন্ত্রাসবাদের হুমকি একদম শেষ হয়ে না গেলেও, লর্ড ইভান্সের মতে, "পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। অরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হুমকি এখনও চিন্তার বিষয়, তবে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা হুমকিগুলো এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সমপরিমাণ মারাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই হুমকিগুলো প্রধানত রাশিয়া, ইরান, তাদের প্রক্সি (সহযোগী গোষ্ঠী) এবং চীনের কাছ থেকে আসছে।"
ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে হামলার সিদ্ধান্তকেও একটি বড় গোয়েন্দা ব্যর্থতা বলা যায়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে ইরানের প্রতিশোধ নেওয়ার ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পের কাছে কোনো পাল্টা কৌশল ছিল না। ফলে ইরানের পদক্ষেপের পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি ং
নৈতিক হিসাব-নিকাশ
৯/১১ হামলার পরপরই একটি চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল যে, হয়তো শিগগিরই দ্বিতীয় দফায় আরো হামলা হতে যাচ্ছে। এমনকি আল-কায়দা নিজেও বহুতল ভবনে "বিমানের ঝাঁক" দিয়ে আক্রমণের হুমকি দিয়েছিল। এ ধরনের আক্রমণ যেকোনো মূল্যে প্রতিরোধ করার তাড়াহুড়োয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটায়। আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে সামান্যতম খবরের ভিত্তিতেই সন্দেহভাজনদের তুলে নেওয়া হতো। শত শত মানুষকে চোখ ও হাত-পা বেঁধে, নেপি পরিয়ে পৃথিবীর অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়ে কিউবার গুয়ান্তানামো বে-তে মার্কিন নৌঘাঁটির অস্থায়ী বন্দিশালায় নিয়ে আসা হয়, যেখানে তাদের কোনো রকম বিচার ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছিল।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো একে আমেরিকার নৈতিক বিবেকের ওপর এক কলঙ্ক বলে অভিহিত করেছে।
মার্কিন হেফাজতে থাকা বন্দিদের ওপর নির্যাতনের কেলেঙ্কারি পরবর্তীতে প্রকাশ্যে এলে জড়িত কিছু ব্যক্তিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়। তবে সমালোচকদের মতে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শাস্তি থেকে বেঁচে গেছেন। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র গুয়ান্তানামো বে-তে বিচারহীন আটকপ্রক্রিয়া বজায় রেখেছে এবং ২০২৫ সালে দেশটি থেকে ২০০ জনেরও বেশি লোককে এল সালভাদোরের বিতর্কিত 'সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ কেন্দ্রে' ফেরত পাঠায়।
৯/১১-পরবর্তী সময়টি ব্রিটেনের জন্যও মানবাধিকারের দিক থেকে অত্যন্ত কলঙ্কজনক ছিল। ২০০৪ সালে থাইল্যান্ড থেকে এক লিবীয় ইসলামপন্থী আবদুল হাকিম বেলহাজ ও তার স্ত্রীকে লিবিয়ায় অপহরণ ও হস্তান্তরে (রেন্ডিশন) জড়িত ছিল এমআই৬। সেখানে তিনি বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি থাকেন এবং কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনামলে চরম নির্যাতনের শিকার হন।
বিষয়টি শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে এলে ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল পার্লামেন্টে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বর্তমানে এসব গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভেতর সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে আইনজীবী বিভাগ।
রাশিয়া ও চীনের উত্থান
এমআই৬-এর সাবেক প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ঙ্গার (২০১৪-২০২০) বলেন, "আমরা এই শতাব্দীর প্রথম ২০ বছরের প্রায় পুরোটাই সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহ দমনে মনোনিবেশ করেছিলাম।" পদ ছাড়ার পরপরই এক সাহিত্য উৎসবে তিনি আরো যোগ করেন, "সামরিক শক্তি ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চীনের উত্থানকে আমরা এড়িয়ে গেছি বা বুঝতে ভুল করেছি।"
একইভাবে জেনারেল শিরেফ ২০১৬ সালে "ওয়ার উইথ রাশিয়া" নামে একটি থ্রিলার উপন্যাস লেখেন, যেখানে তিনি ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
৯/১১ এবং তার পরবর্তী "সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ"-এর সময়ে পশ্চিমা বিশ্ব যখন তালেবান, আইসিস কিংবা ইরাক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তখন রাশিয়া ও চীন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উদ্ভাবনসহ বিশাল পুনঃঅস্ত্রায়ন কর্মসূচি শুরু করে। যা পরবর্তীতে ন্যাটোর (NATO) সামরিক সুবিধাকে গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স ফার্ম 'সিবিলাইন'-এর প্রধান বিশ্লেষক স্যাম ওলসেন একমত প্রকাশ করে বলেন, "পশ্চিমাদের ভুল শুধু এটুকুই ছিল না যে ৯/১১-এর পর তারা সন্ত্রাস দমনে বিভ্রান্ত ছিল। তারা চীনের উত্থানের ধরনও ভুল বুঝেছিল এবং ধরে নিয়েছিল যে অর্থনৈতিক সংহতকরণ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাবে।"
চীন, ইরান, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য অত্যন্ত কঠিন লক্ষ্যবস্তু। ২০০১ সালে বায়োমেট্রিক ডেটা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তবে পরবর্তীতে ফেসিয়াল, আইরিস এবং চালচলন শনাক্তকরণের প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এজেন্টদের সনাক্ত না হয়ে সীমান্ত পার করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।
পশ্চিমা গোয়েন্দারা চীনকে কতটা ভালো বুঝতে পারছে?
রাশিয়ার পাশাপাশি চীনও এখন এমআই৬-এর অন্যতম প্রধান গোয়েন্দা লক্ষ্যবস্তু। সিবিলাইনের স্যাম ওলসেন বলেন, "পশ্চিমা গোয়েন্দারা চীন সম্পর্কে অনেক কিছু বোঝে। তবে আসল বিপদ হলো, তারা তথ্যের একেকটি পৃথক টুকরো দেখতে পেলেও, সবকিছু মিলিয়ে মূল চিত্রটি কী দাঁড়াচ্ছে তা সবসময় অনুধাবন করতে পারে না। চীনের শক্তি এখন আর কেবল যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সৈন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ক্রমশ সেমিকন্ডাক্টর, অতিপ্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ, ব্যাটারি, বন্দর, টেলিকমিউনিকেশন ও শিল্প সক্ষমতার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে... তাই সমস্যাটি প্রায়শই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা নয়, বরং প্রাপ্ত তথ্যের কৌশলগত বিশ্লেষণের ব্যর্থতা।"
২৫ বছর আগে ৯/১১ হামলার দিনে মার্কিন গোয়েন্দা এজেন্টদের কাছে ধাঁধার কিছু আলাদা টুকরো বা তথ্য ছিল, কিন্তু সামগ্রিকভাবে তারা সেগুলো মেলাতে এবং সামনে কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে—তা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। মূলত, কৌশলগত সুবিধার জন্য যদি তথ্যকে সঠিক উপায়ে কাজে লাগানোই না যায়, তবে কেবল চমৎকার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের আসলে কোনো মূল্য থাকে না।
চেনা রূপের বাইরের এক পৃথিবী
৯/১১-এর পর গত ২৫ বছরে গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসবাদ কেন্দ্রিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গেছে, যা এআই ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের কারণে আরো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
তবে নানা বিরোধী বক্তব্য ও স্বার্থের এই বিশ্বে গোয়েন্দা ব্যর্থতা বা কৌশলগত ভুল হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে কেবল পশ্চিমা দেশগুলোরই একচেটিয়া আধিপত্য নেই। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উদাহরণের মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার বিপর্যয়কর পূর্ণমাত্রার আক্রমণ এবং যাকে অনেকে ইসরায়েলের "নিজস্ব ৯/১১" বলে অভিহিত করে—২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে গাজা থেকে পরিচালিত হামাসের নেতৃত্বাধীন আক্রমণ।
চুড়ান্ত বিচারে, বড় বড় কৌশলগত জাতীয় সিদ্ধান্তগুলো নিয়েই প্রশ্ন উঠে আসছে। প্রেসিডেন্ট বুশের ইরাক অভিযানে ব্রিটেনের যোগ দেওয়া কি সঠিক ছিল? মার্কিন নেতৃত্বাধীন 'অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম'-এ যোগ দিয়ে দুই দশক পর তড়িঘড়ি করে তালেবানের হাতে দেশকে ফেলে চলে যাওয়া কি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত ছিল? এমন অনেক প্রশ্ন আজও উঠে যাচ্ছে।