Shibbir Ahmed প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:০৯ পিএম

শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: কিউবার বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির শাসকগোষ্ঠীর আর্থিক নেটওয়ার্ক, খনিজ সম্পদ ও জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ও একজন ব্যক্তিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (U.S. Department of State) এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ (Executive Order) ১৪৪০৪-এর আওতায় এসব নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, কিউবার সরকার দেশটির অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে দমনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ একটি সীমিত গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন ফিদেল এরনেস্তো কাস্ত্রো কালিস (Fidel Ernesto Castro Calis), যিনি সাবেক কিউবান নেতা রাউল কাস্ত্রোর নাতি। এ ছাড়া কিউবার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ব্যাংকো এক্সতেরিওর দে কিউবা (Banco Exterior de Cuba), নিকেল ও কোবাল্ট শিল্পের সঙ্গে যুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি খাতের দুটি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।
কাস্ত্রো পরিবারের আরও এক সদস্য নিষেধাজ্ঞার আওতায়
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফিদেল এরনেস্তো কাস্ত্রো কালিসকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার আইনি ভিত্তি হলো—তিনি ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো এসপিনের প্রাপ্তবয়স্ক পরিবারের সদস্য। আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো এসপিন হলেন রাউল কাস্ত্রোর ছেলে। তাঁকে এবং তাঁর ছেলে রাউল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো কালিসকে চলতি বছরের ৪ জুন নির্বাহী আদেশ ১৪৪০৪-এর আওতায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে কাস্ত্রো পরিবারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বিস্তৃত হলো। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য, কিউবার ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে লক্ষ্য করাই এই নীতির উদ্দেশ্য।
কিউবার রাষ্ট্রীয় ব্যাংকেও নিষেধাজ্ঞা
নতুন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে কিউবার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ব্যাংকো এক্সতেরিওর দে কিউবা (Banco Exterior de Cuba)। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটি করপোরেট ব্যাংকিং, বৈদেশিক বাণিজ্যের অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিউবার অর্থনীতির আর্থিক সেবা খাতে কার্যক্রম পরিচালনার কারণে ব্যাংকটিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
এর ফলে কিউবার আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন পরিচালনার ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কিউবার এই ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনকারী বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক অংশীদারদেরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে।
নিকেল ও কোবাল্ট শিল্পে চাপ
কিউবার ধাতু ও খনিজ খাতও নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হয়েছে। এ খাতের সঙ্গে যুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠান হলো এমপ্রেসা দে সার্ভিসিওস কোমানদান্তে রেনে রামোস লাতুর (Empresa de Servicios Comandante Rene Ramos Latour বা NICAROTEC) এবং এমপ্রেসা ইমপোর্তাদোরা ই আবাস্তেসেদোরা দেল নিকেল (Empresa Importadora y Abastecedora del Niquel বা CEXNI)।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, NICAROTEC কিউবার নিকেল শিল্পে ভূতাত্ত্বিক ও খনিসংক্রান্ত সহায়তা দিয়ে থাকে। অন্যদিকে CEXNI কিউবার নিকেল ও কোবাল্ট শিল্পের জন্য বিশেষায়িত কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানি ও সরবরাহ করে। কিউবার অর্থনীতিতে নিকেল গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ সম্পদ। ফলে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে দেশটির খনিজ সম্পদ উত্তোলন, শিল্প উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
জ্বালানি খাতেও নিষেধাজ্ঞা
কিউবার জ্বালানি খাতের দুটি প্রতিষ্ঠানকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। এর একটি হলো এমপ্রেসা ইমপোর্তাদোরা দে আবাস্তেসিমিয়েন্তো পারা এল পেত্রোলেও (Empresa Importadora de Abastecimiento para el Petroleo বা ABAPET)। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এটি কিউবার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ইউনিয়ন কিউবা-পেত্রোলেও (Unión Cuba-Petróleo বা CUPET)-এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।ABAPET কিউবার জ্বালানি খাতের জন্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, যন্ত্রাংশ, বিশেষায়িত সরঞ্জাম ও শিল্প উপকরণ আমদানিতে সহায়তা করে।
মার্কিন সরকারের অভিযোগ, CUPET-এর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ABAPET কিউবার জ্বালানি খাত সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া কমেরসিয়াল CUPET এসএ (Comercial CUPET S.A.)-কেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা এবং যৌথ উদ্যোগে CUPET-এর প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে কিউবার জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ, সরঞ্জাম আমদানি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নিষেধাজ্ঞার প্রভাব
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নতুন করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা কিংবা মার্কিন ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন সম্পদ ও সম্পত্তির স্বার্থ অবরুদ্ধ (Blocked) থাকবে। এসব সম্পদের বিষয়ে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরকে (Office of Foreign Assets Control বা OFAC) অবহিত করতে হবে। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত এক বা একাধিক ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ বা তার বেশি মালিকানা এককভাবে বা সম্মিলিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে সেই প্রতিষ্ঠানও অবরুদ্ধ হওয়ার আওতায় পড়বে।
মার্কিন নাগরিক, মার্কিন প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন অন্যান্য ব্যক্তির জন্য নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অর্থ, পণ্য বা সেবা নিয়ে অধিকাংশ ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ। তবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের সাধারণ বা বিশেষ অনুমোদন থাকলে নির্দিষ্ট কিছু লেনদেন করা যেতে পারে।
বিদেশি ব্যাংক ও কোম্পানির ওপরও ঝুঁকি
নতুন নিষেধাজ্ঞার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আন্তর্জাতিক প্রভাব। মার্কিন সরকার সতর্ক করেছে, কিউবার নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের লেনদেনে জড়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের ব্যক্তি, কোম্পানি এবং বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে কিউবার জ্বালানি, প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট সামগ্রী, ধাতু ও খনিজ, আর্থিক সেবা এবং নিরাপত্তা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমকে ওয়াশিংটন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
এর ফলে কিউবার সঙ্গে ব্যবসা করা বিদেশি ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোকে লেনদেনের আগে আরও কঠোর যাচাই-বাছাই করতে হতে পারে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও কিউবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে।
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে নতুন পদক্ষেপ
কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপকে দেশটির ওপর সম্পূর্ণ নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা কিউবা-সংক্রান্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর ওপর নতুন করে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যুক্ত করা হয়েছে।
কিউবার বিরুদ্ধে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার অন্যতম প্রধান কাঠামো হলো কিউবান অ্যাসেটস কন্ট্রোল রেগুলেশনস (Cuban Assets Control Regulations বা CACR)। নতুন নির্বাহী আদেশ ও সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা এই বিদ্যমান কাঠামোর পাশাপাশি কার্যকর হচ্ছে। ফলে কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর আগে থেকেই থাকা বিধিনিষেধের পাশাপাশি এখন নির্দিষ্ট ব্যক্তি, ব্যাংক ও অর্থনৈতিক খাত আরও কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ছে।
ওয়াশিংটনের লক্ষ্য কী?
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য কেবল শাস্তি দেওয়া নয়; বরং কিউবার সরকারের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, মানবাধিকার, আইনের শাসন, মুক্তবাজার, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কিউবার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই মার্কিন নীতির অন্যতম লক্ষ্য। মার্কিন প্রশাসন অভিযোগ করেছে, কিউবার সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে থাকলেও দেশটির ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সেই অর্থনৈতিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
২০২৬ সালে ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা
চলতি বছর কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে বিস্তৃত হয়েছে। মে মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ ১৪৪০৪ জারি করার পর কিউবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়।
এর আগে জুন মাসেও কিউবার ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেশটির অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত হয়। ৩ সেপ্টেম্বরের নতুন পদক্ষেপ সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ সংযোজন।
এর মাধ্যমে কিউবার ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ বিশেষ করে ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, নিকেল-কোবাল্ট, তেল ও জ্বালানি এবং বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত হলো। তবে নতুন নিষেধাজ্ঞার অর্থ এই নয় যে কিউবার সঙ্গে বিশ্বের সব ধরনের বাণিজ্য বা লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট অনুমোদন, ছাড় ও লাইসেন্সের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে কোন লেনদেন নিষিদ্ধ এবং কোনটি অনুমোদিত—তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, খাত এবং মার্কিন আইনের অধীনে প্রযোজ্য অনুমোদনের ওপর।
নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে এখন কিউবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিদেশি ব্যবসায়িক অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে এই নীতি কিউবার সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে এবং এর মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।