প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেলের স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে ফেরার ঘোষণায় ব্রিটিশ রাজ পরিবারে রীতিমতো তোলপাড়। ছয় বছর আগে রাজপ্রাসাদ, রাজপরিবার ও রাজকীয় জীবন ছেড়ে যান রাজা চার্লসের ছোট ছেলে প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান মার্কেল।
খবর প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০৮ এএম

প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেলের স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে ফেরার ঘোষণায় ব্রিটিশ রাজ পরিবারে রীতিমতো তোলপাড়। ছয় বছর আগে রাজপ্রাসাদ, রাজপরিবার ও রাজকীয় জীবন ছেড়ে যান রাজা চার্লসের ছোট ছেলে প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান মার্কেল।
রাজপুত্র ও তার স্ত্রী প্রথমে কানাডায় এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় থিতু হন। কিন্তু সন্তানদের ব্রিটিশ কারিকুলামে পড়াতে এবং ব্রিটিশ পরিবেশে বড় করতে তারা আবার যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তারা কোনো রাজকীয় দায়িত্ব পালন করবেন না। সাধারণ নাগরিকের মতোই জীবনযাপন করবেন।
সপরিবারে প্রিন্স হ্যারির যুক্তরাজ্যে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণায় রাজপরিবারের সম্পর্কের নানামুখী মাত্রা নিয়ে কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে। রাজা চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়ানার দুই ছেলের মধ্যে প্রিন্স হ্যারি ছোট। ১৯৯৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিন্সেস ডায়ানা মারা যান। এরপর প্রিন্সেস ডায়ানার দুই ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারি তাদের বাবা চার্লসকে অনুরোধ করেছিলেন, তিনি যেন ক্যামিলাকে বিয়ে না করেন।
দুই ছেলের আশঙ্কা ছিল ক্যামিলা ‘নিষ্ঠুর সৎমা’ হবেন। কিন্তু তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিয়ে চার্লস ২০০৫ সালের ৯ এপ্রিল দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ক্যামিলাকে বিয়ে করেছিলেন। এখন জানা যাচ্ছে, প্রিন্স হ্যারি ও মেগানের যুক্তরাজ্যে ফেরার ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন সেই কথিত ‘নিষ্ঠুর সৎমা’ ক্যামিলাই।
তিনিই ছোট ছেলের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব বদলাতে রাজা চার্লসকে প্রভাবিত করেছেন। সৎমা ক্যামিলা হ্যারিকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আন্তরিক হলেও তার আপন বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়াম ছোট ভাইয়ের দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে নাখোশ।
গত ১৬ আগস্ট প্রিন্স হ্যারি ও মেগান রাজা চার্লসের সঙ্গে দেখা করেন। তখন তারা তাদের যুক্তরাজ্যের ফেরার বিষয়টি রাজাকে অবহিত করেন। সেখানে রানী ক্যামিলাও উপস্থিত ছিলেন। রাজা তাদের সিদ্ধান্তে সম্মতি জানান। রানি ক্যামিলা রাজাকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে বিশেষ করে নাতি-নাতনিকে কাছে পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
গত ১৯ আগস্ট প্রিন্স হ্যারি ও মেগান তাদের স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে ফেরার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তারা এ মাসের শেষ দিকেই ফিরবেন। কারণ সেপ্টেম্বর থেকেই তাদের দুই সন্তান সাত বছরের আর্চি ও পাঁচ বছরের লিলিবেটের স্কুল শুরু হবে। তারা থাকার জন্য কটসওল্ডস এলাকায় একটা অরাজকীয় সাধারণ বাসা ঠিক করেছেন।
রাজপরিবারের একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘ক্যামিলা শান্তিতে বিশ্বাসী এবং তিনি সবকিছুর বৃহত্তর দিকটি দেখতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে রাজার নাতি-নাতনিদের সঙ্গে এবং হ্যারির ইচ্ছা থাকলে তার সঙ্গেও একটি অর্থপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।’
সূত্রটি আরো জানায়, ‘রানি রাজার ওপর এক অবিশ্বাস্য রকমের শান্ত প্রভাব ফেলে চলছেন। ক্যান্সারের সঙ্গে রাজার লড়াইয়ের পুরোটা সময় জুড়ে রানি তার প্রধান ভরসা হয়ে আছেন। এমনকি গত কয়েক বছরের নানা ঝামেলার মধ্যেও তার মনোযোগ ছিল কেবল একটি বিষয়েই; স্বামীর স্বাস্থ্য এবং তাকে তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।’
একটি সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন থেকে আসায় রানি ঐক্যের গুরুত্ব খুব ভালো করেই বোঝেন। রাজা চার্লস ও প্রিন্সেস কেট মিডলটন যখন নিজ নিজ ক্যান্সারের চিকিৎসার সময় দায়িত্ব থেকে বিরতি নিয়েছিলেন, তখন ক্যামিলা যেমন রাজতন্ত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন, তেমনই তিনি নিজের সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের সঙ্গেও একটি নিবিড় বন্ধন বজায় রেখেছেন।
অথচ প্রিন্স হ্যারি তার আত্মজীবনীমূলক বইয়ে রানি ক্যামিলাকে নিয়ে নির্মম সমালোচনা করেছিলেন। বইয়ে ক্যামিলাকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। প্রিন্স হ্যারি অভিযোগ করেছিলেন, নিজের পাবলিক ইমেজ পুনরুদ্ধার করে রানি হওয়ার পথ সুগম করার জন্য তিনি ব্যক্তিগত কথাবার্তা ফাঁস করা ও গণমাধ্যমের সঙ্গে গল্প শেয়ার করেছিলেন।
৪১ বছর বয়সী হ্যারি জানান, তিনি এবং উইলিয়াম তাদের বাবাকে ক্যামিলাকে বিয়ে না করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, কারণ তারা ভয় পাচ্ছিলেন যে ক্যামিলা হয়তো একজন ‘নিষ্ঠুর সৎমা’ হবেন। তবে যারা ক্যামিলাকে খুব কাছ থেকে চেনেন, তারা জানেন তিনি অন্যরকম।
তারা বলেন, ৭৯ বছর বয়সী ক্যামিলা এমন একজন মানুষ, যিনি মনে ক্ষোভ পুষে রাখেন না।
ক্যামিলা মনে ক্ষোভ পুষে রাখলেও হ্যারির আপন বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়াম এখনো ভাইকে ক্ষমা করতে পারেননি। প্রিন্স উইলিয়ামের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রিন্স হ্যারির প্রত্যাবর্তনে বালমোরালে পরিবারের কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে না।
সূত্রটি জানায়, ২০২০ সালে রাজপরিবারের মূল দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে রাজপরিবারের বিরুদ্ধে আনা ক্ষতিকর অভিযোগগুলোর জন্য তিনি হ্যারি-মেগানকে ক্ষমা করতে পারছেন না।
রাজপ্রাসাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রত্যাবর্তনে রাজপরিবারের মৌলিক নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন আসছে না। ছয় বছর আগে তাদের রাজকীয় দায়িত্ব ছাড়ার সময় যে চুক্তি হয়েছিল, তা বহাল থাকবে। অর্থাৎ হ্যারি ও মেগান কোনো সরকারি তহবিল বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা বা কোনো রাজকীয় দায়িত্ব পাবেন না।
একজন রাজপরিবার বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘সবাই বিষয়টি নিয়ে বেশ স্বাভাবিক ও শান্ত আছেন। ছয় বছর আগে রাজকীয় জীবন থেকে হ্যারি ও মেগানের বিদায়ের পর যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। রাজা সবসময়ই বজায় রেখেছেন যে, হ্যারি, মেগান এবং তাদের পরিবার যেখানেই বসবাস করুক না কেন, তারা পারিবারিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই থাকবেন।’
২০১৮ সালের ১৯ মে মার্কিন অভিনেত্রী মেগান মার্কেলকে বিয়ে করেছিলেন প্রিন্স হ্যারি। কিন্তু মেগান রাজপরিবারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। রাজপরিবারের কঠোর নিয়ম-কানুন, মানসিক চাপ এবং ব্রিটিশ গণমাধ্যমের অতিমাত্রায় নেতিবাচক আচরণের কারণে ২০২০ সালে হ্যারি ও মেগান রাজকীয় দায়িত্ব ছেড়ে সাধারণ জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।