NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, বুধবার, জুলাই ১, ২০২৬ | ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
Logo
logo

অবৈধ অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার সময়সীমার শেষ দিনে দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে বিক্ষোভ, নিহত অন্তত ৪


খবর   প্রকাশিত:  ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৯:০৭ এএম

অবৈধ অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার সময়সীমার শেষ দিনে দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে বিক্ষোভ, নিহত অন্তত ৪

অবৈধ অভিবাসীদের দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ার জন্য বেঁধে দেওয়া সময়সীমার শেষ দিনে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করেছেন অভিবাসীবিরোধী আন্দোলনের সমর্থকেরা। মঙ্গলবারের এসব মিছিলে অনেকের হাতে কাঠের লাঠি ও অন্যান্য অস্ত্র ছিল।

অনেকেই জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। কয়েকটি এলাকায় মিছিলকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, লুটপাট ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

 

সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন দেশের হাজারো নাগরিক দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে চলে গেছেন। কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা ও সহিংসতার কারণে নতুন করে হামলার আশঙ্কায় অনেক দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়।

নিরাপত্তার কারণে বহু বিদেশি শ্রমিকও কাজে যাননি। এ পর্যন্ত সহিংসতায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া হাজারো বিদেশি নাগরিককে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তিতেও হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
অভিবাসীবিরোধী আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হবে। বন্দরনগরী ডারবানে ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ সংগঠনের নেতা জাসিন্তা নগোবেসে বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশের সম্পদ ব্যবহার করে সব অবৈধ অভিবাসীকে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বের করে দিতে হবে। তিনি বলেন, ভবন থেকে ভবন ঘুরে তাদের বের করে দেওয়া উচিত এবং তাদের দেশ ছেড়ে যেতেই হবে।

 

ডারবানের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৩১ বছর বয়সী সিলিনডিলে খাবা বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক মানুষ কাজ পাচ্ছেন না। তার দাবি, অবৈধ বিদেশিরা চাকরি নিয়ে নিচ্ছেন, যা ন্যায্য নয়।

আগামী নভেম্বরের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে ভোট পাওয়ার জন্য কিছু রাজনীতিক বিদেশিবিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিবাসীরা এই সময়সীমাকে নিজেদের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছেন। যদিও অনেক বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল, তবে বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

 

পুলিশ জানিয়েছে, লুটপাটের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাদের পরিচয় বা মামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। দেশটির প্রধান বাণিজ্যিক শহর জোহানেসবার্গের উত্তরের উপশহর থেম্বিসায় দাঙ্গাকারীরা পুলিশ ও সন্দেহভাজন অভিবাসীদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে। শহরের কেন্দ্রীয় ব্যবসা এলাকার কাছাকাছি কয়েকটি স্থানে গুলির শব্দও শোনা যায়। জাতীয় দৈনিক 'ডেইলি ম্যাভেরিক' জানিয়েছে, জোহানেসবার্গের পূর্বাঞ্চলের বেনোনিতে প্রায় ৫০০ বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে এগিয়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কিছু যান মোতায়েন করা হয়। পরে পুলিশ গুলি ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এ বিষয়ে পুলিশের একজন মুখপাত্রের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেননি। জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসএবিসি জানিয়েছে, সোয়েটো এলাকায় বিক্ষোভকারীরা বিদেশি নাগরিকদের অস্থায়ী বসতিতে লুটপাট চালিয়েছে। এছাড়া ডারবানের কাছে পিটারম্যারিটজবার্গে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়েছে।


প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ডারবান ও জোহানেসবার্গে অনেক বাড়ির মালিক হামলার আশঙ্কায় বিদেশি ভাড়াটিয়াদের জোর করে বাসা ছাড়তে বাধ্য করেছেন। রয়টার্সের একজন প্রতিবেদক জানান, প্রায় ১০০ কঙ্গোর নাগরিক ডারবানের রাস্তায় রাত কাটাচ্ছিলেন। তাদের নেতা অভিযোগ করেন, তাদের জোরপূর্বক বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় মাঝেমধ্যে অভিবাসীদের ওপর এমন হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব হামলায় বৈধ ও অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য করা হয় না। তবে ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ সংগঠন বলছে, সাধারণ মানুষের হঠাৎ করে চালানো সহিংস হামলার দায় তাদের নয়। দুই সপ্তাহ আগে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সংগঠনটির নেতা জাসিন্তা নগোবেসে বলেন, প্রতিটি এলাকায় গিয়ে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।


 

এই বিক্ষোভে মূলত দরিদ্র ও বেকার কয়েক হাজার দক্ষিণ আফ্রিকান অংশ নেন। তারা নিজেদের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্য বিদেশিদের দায়ী করছেন। একজন সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাজার হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ। তাদের মতে, এ কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষিণ আফ্রিকার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলার সময় মানবাধিকার রক্ষাকারী দেশ হিসেবে যে সুনাম তৈরি হয়েছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আফ্রিকার অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা চাকরি নিয়ে নিচ্ছেন, অপরাধ বাড়াচ্ছেন এবং সরকারি সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছেন। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বর্ণবাদ নীতির অবসানের তিন দশক পরও দক্ষিণ আফ্রিকায় বৈষম্য রয়ে গেছে। দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বেকার। তবুও আফ্রিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হওয়ায় কাজের আশায় প্রতিবছর বহু মানুষ সেখানে অভিবাসন করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটসএসএর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৩০ লাখ অভিবাসী রয়েছেন। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় চার শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এই হার খুব বেশি নয়। 

পুলিশিং বিভাগের উপ-জাতীয় কমিশনার তেবেলো মোসিকিলি জানিয়েছেন, মার্চ মাস থেকে বিদেশিবিরোধী স্বঘোষিত রক্ষীবাহিনী সদস্যদের বিরুদ্ধে ১০৩টি ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। এদিকে, কিছু রাজনীতিবিদ সহিংসতার নিন্দা জানালেও বিক্ষোভকারীদের উদ্বেগের বিষয়টিকে সমর্থন করেছেন। সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেন, অবৈধ অভিবাসন নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের উদ্বেগ বাস্তব এবং তাদের কথা শোনা উচিত। তবে তিনি বলেন, বিক্ষোভ করার অধিকার কাউকে অন্যকে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, ভাঙচুর করা বা সহিংসতা চালানোর অনুমতি দেয় না।

দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তাদের মতে, অভিবাসন ইস্যুতে পশ্চিমা অনেক দেশও একই ধরনের উত্তেজনার মুখে রয়েছে। বিভাজনমূলক রাজনীতি এবং ভুল তথ্যের প্রচার এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।