প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দুই দিনের সরকারি সফরে গতকাল কুয়ালালামপুর গেছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান।
গতকাল বেলা ৩টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সফরে তার সঙ্গে আছেন ৮ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা। সেখান থেকে তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চারদিনের জন্য চীন সফরে যাবেন। এর আগে গতকাল রাতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এক সুধী সমাবেশে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বিশাল অভ্যর্থনা জানানো হয়। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী জুলকিফলি হাসান ও তার সহধর্মিণী। প্রধানমন্ত্রী ও তার স্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা এবং গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিক মোটর শোভাযাত্রায় কুয়ালালামপুরের শাংরি-লা হোটেলে যান। মালয়েশিয়ায় আগমন উপলক্ষে গতকাল রাতে সুধী সমাবেশে যোগ দেন তারেক রহমান। সমাবেশে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শ্রমিক, প্রবাসীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়ায় সফর উপলক্ষে বর্ণাঢ্য সাজে সেজেছে কুয়ালালামপুর। পথে পথে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং মালয়েশিয়ার পতাকা শোভা পায়। আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন। সফরে বিশেষ গুরুত্ব পাবে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু এবং অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিত করা।
বৈঠকের পর কুয়ালালামপুর থেকে বিকালে রওনা হয়ে চীনের বন্দরনগর দালিয়ানে যাবেন তিনি। ২৩ থেকে ২৬ জুন তিনি চীন সফর করবেন। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মধ্য দিয়ে দেশ দুটির সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিনিয়োগের জন্য চীনের বেসরকারি খাতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে চীনের একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথা রয়েছে এবং সেটির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সফরকালে চীন ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বেসরকারি খাতের নেতাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হবে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকালে আজ দুই দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনা হবে।
আলোচনায় থাকছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, শ্রমবাজারে সহযোগিতা, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, শিক্ষা সহযোগিতা, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং কৃষি, শিক্ষা ও জনযোগাযোগ। এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে অধিকতর সহযোগিতা স্থাপন নিয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া, আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন চাওয়া হবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়াও এই সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সংস্কৃতি বিনিময় আর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুটি দলিল সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। চীন সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান, একটি প্রটোকলসহ মোট ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। সফরকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটি তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হবে বলে পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ৮ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদার) রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমির, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার) মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণবিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার) হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে আরও রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক) তানভীর গনি এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর। মালয়েশিয়া ও চীন সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদল তুলনামূলকভাবে ছোট রাখা হয়েছে। দুই সফরেই প্রতিনিধিদলের সদস্যসংখ্যা ২৭ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফরকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এ ছাড়া ২৬ জুন তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে ২৩ থেকে ২৫ জুন অনুষ্ঠেয় ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে (সামার দাভোস ফোরাম) অংশ নেবেন। ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ ফোরামে ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের ১ হাজার ৭০০-এর বেশি প্রতিনিধি অংশ নেবেন। সেখানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়াও চীন সফরে অবকাঠামো, প্রযুক্তি, সংযোগ এবং উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা আরো গভীর করার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরা হবে। চীন সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী আগামী শুক্রবার রাতে দেশে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
গতকাল মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার প্রাক্কালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, মালয়েশিয়া-চীনের রাষ্ট্রদূতসহ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন সন্ধ্যায় চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন ২৩ জুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক করার কথা রয়েছে। ডব্লিউইএফের বার্ষিক সভা সামার দাভোসে অংশগ্রহণকারী কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করার কথা রয়েছে।
তিনি আরো জানান, চীন সফরের প্রথম দিন বিকেলে ডব্লিউইএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক একটি অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন। সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আয়োজিত স্বাগত নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন।
২৫ জুন সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রীর সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ নামে একটি বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন।
চীনের ব্যবসায়ীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরবেন। এতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাবেন তিনি। বিকেলে চীনের গ্রেট হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দেবেন তারেক রহমান। সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয় এবং ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে।
এরপর প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন। পরদিন ২৬ জুন ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করবেন। এরপর তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। ২৬ জুন বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সেখানকার বীর যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। ওই দিন বিকালে প্রধানমন্ত্রী বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন।
মালয়েশিয়ায় বন্দিদের ফেরানোর চেষ্টা করা হবে : মালয়েশিয়ায় বন্দি বাংলাদেশিদের ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বহু বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় কাজ করেন। নানান কারণে অনেক প্রবাসী এখানে কারাগারে আটকে আছেন। কীভাবে তাদের মুক্ত করা যায়, সেই চেষ্টা করা হবে।
গতকাল মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে শাংগ্রি-লা হোটেলে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনের মধ্যে থেকে প্রবাসীদের জন্য যত সুবিধা আদায় করা যায়, সবকিছু করা হবে। তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়ায় যেন অদক্ষ শ্রমিক না আসে সেজন্য টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করা হবে।


