আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বহুল আলোচিত মার্কিন ধনকুবের ও কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের নাম আগেই জড়িয়ে ছিল। এবার মার্কিন ধনকুবের এবং টেসলার কর্ণধার ইলন মাস্কের নামও এপস্টিন বিতর্কে উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, উঠে এসেছে ব্রিটেনের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নামও। মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা সম্প্রতি এই নথিগুলো প্রকাশ করেছেন।
হাউস ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাটদের মুখপাত্র সারা গেরেরো বলেছেন, ‘এটি স্পষ্ট যে এপস্টিন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও ধনী ব্যক্তিদের বন্ধু ছিলেন। প্রতিটি নতুন নথি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।’
অন্যদিকে, কমিটির রিপাবলিকান সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, ডেমোক্র্যাটরা ‘ভুক্তভোগীদের চেয়ে রাজনীতিকে’ প্রাধান্য দিচ্ছেন এবং জানিয়েছেন, শিগগিরই তারা সম্পূর্ণ নথি প্রকাশ করবেন।
জেফরি এপস্টিনের এস্টেট থেকে হাউস ওভারসাইট কমিটিতে হস্তান্তরিত নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ইলন মাস্ককে এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
তবে এর আগেও প্রিন্স অ্যান্ড্রু তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, ইলন মাস্ক অতীতে স্বীকার করেছিলেন, এপস্টিন তাকে দ্বীপে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি।
এই নথি এপস্টিনের এস্টেট থেকে পাওয়া রেকর্ডের তৃতীয় অংশ। হাউস ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যদের মতে, এতে ফোন বার্তা, বিমানের ফ্লাইট লগ, আর্থিক হিসাব এবং এপস্টিনের দৈনন্দিন কার্যক্রমের সময়সূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নথিতে মাস্ক ও প্রিন্স অ্যান্ড্রুর পাশাপাশি ইন্টারনেট উদ্যোক্তা পিটার থিয়েল, সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন এবং মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের নামও উল্লেখ রয়েছে। ২০২২ সালে বিল গেটস বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এপস্টিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকে একটি ‘ভুল’ হিসেবে স্বীকার করেছিলেন।
রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৬ ডিসেম্বর এপস্টিনের সময়সূচিতে লেখা ছিল, ‘ইলন মাস্কের দ্বীপে আসার কথা, এটা কি এখনো হচ্ছে?’ অন্যদিকে, ২০০০ সালের ১২ মে প্রিন্স অ্যান্ড্রু এপস্টিন ও তার সহযোগী জিস্লেইন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে নিউ জার্সি থেকে ফ্লোরিডা যাওয়ার একটি ফ্লাইটে ছিলেন।
জেফ্রি এডওয়ার্ড এপস্টাইন ছিলেন একজন আমেরিকান ধনকুবের এবং শিশু যৌন অপরাধী। নিউইয়র্ক সিটিতে জন্ম নেওয়া এবং ইহুদি পরিবারে বড় হওয়া এপস্টাইন তার পেশাজীবন শুরু করেছিলেন ডাল্টন স্কুলে শিক্ষক হিসেবে। ১৯৭৬ সালে স্কুল থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর তিনি ব্যাংকিং ও অর্থ খাতের দিকে মনোযোগ দেন, বিয়ার স্টার্নসে বিভিন্ন পদে কাজ করেন। পরবর্তীতে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়েন।
এপস্টাইন একটি অভিজাত সামাজিক বৃত্ত তৈরি করেছিলেন এবং সেই বৃত্তে অনেক নারী ও শিশুকে নিয়ে আসতেন, যাদের ওপর তিনি ও তার সহযোগীরা যৌন নির্যাতন চালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৫ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচ পুলিশের কাছে একজন অভিভাবক অভিযোগ করলে এপস্টাইনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছিল, এপস্টাইন তার ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে যৌন নির্যাতন করেছেন। ফেডারেল কর্মকর্তারা ৩৬ জন মেয়েকে শনাক্ত করেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন ১৪ বছরেরও কম বয়সী ছিল। তাদের ওপর এপস্টাইনের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এপস্টাইন দোষ স্বীকার করেন এবং ২০০৮ সালে ফ্লোরিডার একটি রাজ্য আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। প্রায় ১৩ মাস জেল খেটে মুক্তি পান।
এরপর ফ্লোরিডা ও নিউ ইয়র্কে নাবালকদের পাচারের অভিযোগে এপস্টাইনকে আবার গ্রেপ্তার করা হয় ২০১৯ সালের ৬ জুলাই। যৌন পাচারের অভিযোগে কারাগারে থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের আগস্টে নিউইয়র্কের একটি জেলে এপস্টিন আত্মহত্যা করেন।
মেডিক্যাল পরীক্ষক রায় দেন, তিনি ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে এপস্টাইনের আইনজীবীরা এই রায়ের বিরোধিতা করেন এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি হয়, যার ফলে অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব জন্ম নেয়। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে, ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করে এবং বলেছিলেন, এপস্টাইন তার জেল কক্ষে আত্মহত্যা করেছিলেন।


