মহাকাশে ছুটে আসছিল ভারতের একটি পুরনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। গন্তব্য বাংলাদেশের স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)।
কারণ ধ্বংসাবশেষটি বিএস-১-এর মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। মহাকাশে এই দূরত্বও বড় ঝুঁকির।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলামোটরে বিএসসিএল কার্যালয়ে ঘটনার বর্ণনা দেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ওই কয়েকটি দিন খুবই উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে।
বিএসসিএল জানায়, ধ্বংসাবশেষটি ভারতের ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের। ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণের কয়েক মাস পরই এতে সমস্যা দেখা দেয়।
সতর্কবার্তা পাওয়ার পর বিএসসিএলের প্রকৌশলীরা ধ্বংসাবশেষটির গতিপথ ও বিএস-১-এর অবস্থান বিশ্লেষণ শুরু করেন। স্যাটেলাইট সরিয়ে নিলেই যে ঝুঁকি কেটে যাবে, তা নয়। কোন দিকে কতটা সরানো হবে, নতুন অবস্থানে অন্য কোনো বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা আছে কি না এবং এতে স্যাটেলাইটের জ্বালানি কতটা ব্যয় হবে, সবই হিসাব করতে হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্ট বিএস-১-কে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে ওই অবস্থানে রাখা হয়। ধ্বংসাবশেষটি নিরাপদ দূরত্বে চলে যাওয়ার পর আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
ইমাদুর রহমান বলেন, সতর্কবার্তা পাওয়ার পর প্রকৌশলীদের ছুটি বাতিল করা হয়। ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চলে। স্পেস ট্র্যাকার থেকেও নিয়মিত ধ্বংসাবশেষটির অবস্থান জানানো হচ্ছিল। পুরো প্রক্রিয়ায় বড় কোনো ক্ষতি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান বলেন, মহাকাশে সংঘর্ষ এড়ানো শুধু স্যাটেলাইট সরিয়ে নেওয়ার বিষয় নয়। দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপদ কক্ষপথ পরিবর্তন এবং সীমিত জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টি একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। বিএস-১-এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা অল্প সময়ের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. খলিলুর রহমানও বলেন, মহাকাশে কোনো বস্তু স্যাটেলাইটের খুব কাছাকাছি চলে এলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করে দুর্ঘটনা এড়ানো জটিল কাজ। এতে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের সক্ষমতার প্রমাণ মিলেছে।
২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় বিএস-১। ২০২১ সাল থেকে স্যাটেলাইটটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বিএসসিএল। গাজীপুরের জয়দেবপুরে গ্রাউন্ড স্টেশনে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী ২৪ ঘণ্টা এর ওপর নজর রাখেন।
তবে এবারই প্রথম নয়। বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২৫ সালেও বিএস-১-এর সঙ্গে মহাকাশের অন্য বস্তুর সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে ২০২১ সালে ছিল রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইট।
মহাকাশে ক্রমেই বাড়ছে এ ধরনের ধ্বংসাবশেষের ঝুঁকি। সাম্প্রতিক ঘটনায় বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের সক্ষমতার যেমন পরীক্ষা হয়েছে, তেমনি বিএস-১-এর নিরাপত্তায় নিয়মিত মহাকাশ নজরদারি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে।


