বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘বহু সন্তান আজও অপেক্ষায় আছে, তাদের গুম হয়ে যাওয়া বাবা একদিন ফিরে এসে দরজায় কড়া নাড়বেন। বহু মা এখনো আশায় থাকেন হারিয়ে যাওয়া সন্তানটি আবার মা বলে ডাকবে। এ অপেক্ষা রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় দায়।’ তিনি বলেন, ‘গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর কষ্ট এমন গভীর, যার সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমখুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘মায়ের ডাক’ ও ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ নামে দুটি সংগঠন যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়।
বিএনপিকে অপপ্রচার কিংবা ষড়যন্ত্র করে দমিয়ে রাখা যাবে না বলে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘কৌশলের নামে গুপ্ত কিংবা সুপ্ত বেশ ধারণ করেনি বিএনপি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে দলের কর্মীরা অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন ভূমিকা রাখতে পারেন, সেই দলকে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচারে দমন করা যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের হাজার হাজার নেতা-কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, অনেককে হত্যা করা হয়েছে, হাজারের বেশি মানুষকে গুমের শিকার হতে হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি তাদের বিতর্কিত ভূমিকা দেখা গেছে। তার পরও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ধৈর্যের পরিচয় দিতে চায়।’
গুম ও হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একাত্তরে যাঁরা শহীদ হয়েছেন এ দেশ স্বাধীন করার জন্য, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, বিগত ১৬ বছরে যাঁরা গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন, ’২৪-এর আন্দোলন ও ৫ আগস্টের আন্দোলনে যাঁরা শহীদ হয়েছেন প্রতিটি অন্যায়ের বিচার করতে হলে আগামী দিনে অবশ্যই বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দরকার।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের প্রতি যাবতীয় অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে শহীদ ও গুমের শিকার হওয়াদের আত্মত্যাগ যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মরণীয় থাকে, সে লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
গুমখুনের শিকার ব্যক্তিদের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে শহীদ পরিবারদের নামে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনার নামকরণ করা হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যাঁরা গুম হয়েছেন, যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের প্রতি আগামী দিনের গণতান্ত্রিক যে রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা আমরা দেখছি, সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকারের অবশ্যই অনেক দায় এবং দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র কখনোই আপনাদের ভুলে যেতে পারে না।’
অনুষ্ঠানের শুরুতেই গুমের শিকার সন্তানের মা এসে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তারেক রহমানকে কাছে পেয়ে কান্না শুরু করেন সেই মা। তারেক রহমান তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেও কাঁদেন। এ সময় তাঁকে বারবার টিস্যু দিয়ে চোখ মুছতে দেখা যায়। তারেক রহমান বলেন, ‘কোনো কৌশলের নামে বিএনপি নেতা-কর্মীরা কখনো গুপ্ত বা সুপ্ত পরিচয় ধারণ করেননি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পাশাপাশি স্বজনহারা মানুষের পাশে দাঁড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্বজনহারা পরিবারগুলোর পাশে বিএনপি সব সময় থাকবে। রাষ্ট্র কখনোই আপনাদের ভুলে যেতে পারে না। সব শহীদের আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে বিএনপি বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।’ বিগত সরকার আমলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা সব মামলা ছিল রাজনৈতিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত-এমন মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দেওয়া প্রতিটি মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। যারা বিগত সময়ে নানাভাবে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই। গুমখুন ও নানান নির্যাতনের শিকার হয়েও বিএনপি নেতা-কর্মীরা রাজপথ ছাড়েননি।’
বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘কেউ কেউ নানান কথা ও অজুহাতে গণতন্ত্রের পথ ব্যাহত করতে চায়। যারা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করতে চায়, তারা যেন সফল হতে না পারে সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হলে তা শহীদদের প্রতি চরম অবিচার হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রপ্রিয় প্রতিটি মানুষের সামনে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ আমাদের এসেছে। কেউ কেউ বিভিন্ন রকম কথা বলে একটি অবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে এই গণতন্ত্রের পথ যেটি তৈরি হয়েছে সেটি যাতে বাধাগ্রস্ত হয়।’
প্রধান উপদেষ্টাকে তারেক রহমানের ফুলেল শুভেচ্ছা : অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি চেয়ারম্যান ও তাঁর পরিবার। গতকাল তারেক রহমানের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার হাতে ফুলেল শুভেচ্ছাটি তুলে দেন বিএনপি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার।
বিএনপির মিডিয়া সেল জানায়, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর হেয়ার রোডে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে ড. ইউনূসের হাতে ফুলেল শুভেচ্ছাটি তুলে দেন বিএনপি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার মেয়ে লামিয়া ইউনূস উপস্থিত ছিলেন।


