ভারত আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো ভারত এই সম্মেলনের আয়োজক হচ্ছে।

এবারের সম্মেলনের বিষয় হলো, ‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য গড়ে তোলা’।

 

বিশ্বজুড়ে যখন সামরিক উত্তেজনা ও বাণিজ্য বিরোধ বাড়ছে এবং বিভিন্ন দেশের ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক ও জোটের সমীকরণ বদলে যাচ্ছে, তখন এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ব্রিকস বনাম জি-৭

২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন, এই চার দেশকে নিয়ে ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকস দেশগুলোর সম্মিলিত অংশ ছিল ২০ দশমিক ৪ শতাংশ, যা জি-৭-এর তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

তবে সময়ের সঙ্গে নতুন সদস্য যুক্ত হওয়া এবং উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর দ্রুত প্রবৃদ্ধির কারণে ব্রিকসের অর্থনৈতিক শক্তি ও পরিসর দ্রুত বেড়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব জিডিপিতে অংশের দিক থেকে ২০২০ সালে ব্রিকস জি-৭-কে ছাড়িয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সাল নাগাদ বিশ্ব জিডিপিতে ব্রিকসের অংশ প্রায় ৪১ শতাংশে পৌঁছাবে। অন্যদিকে জি-৭-এর অংশ হবে প্রায় ২৮ শতাংশ।

আগামী বছরগুলোতে ব্রিকস ও জি-৭-এর মধ্যে এই অর্থনৈতিক ব্যবধান আরো বাড়তে পারে।

 

ব্রিকসের নেতৃত্বে কারা?

বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য দেশ ১১টি। তবে জোটটির অর্থনৈতিক শক্তি মূলত চীন ও ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এই দুই দেশ মিলেই ব্রিকসের মোট জিডিপির প্রায় ৭০ শতাংশের জোগান দেয়। এর মধ্যে চীনের অংশ সবচেয়ে বেশি, ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

এরপর রয়েছে ভারত, যার অংশ ২০ দশমিক ৭ শতাংশ।

 

ব্রিকসের অর্থনীতিতে রাশিয়ার অবদান ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার ৬ শতাংশ, ব্রাজিলের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সৌদি আরবের ৩ দশমিক ২ শতাংশ। অন্য সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক অবদান তুলনামূলকভাবে কম। ফলে ব্রিকসের সামগ্রিক অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চীন ও ভারতকেই দেখা হয়।

ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্রিকসের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের মোট রপ্তানির ২২ শতাংশ এবং আমদানির ৪১ শতাংশ এসেছে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য থেকে। চীন এখনো ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস।

অন্যদিকে, রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম দামে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার কারণে ভারতের বাণিজ্যে রাশিয়ার গুরুত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সব মিলিয়ে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে।

ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য মূলত কয়েকটি দেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল। চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও রাশিয়া, এই তিন দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

ব্রিকসের দেশগুলোর উদ্দেশে ভারতের মোট রপ্তানির ৬৪ শতাংশ এবং এসব দেশ থেকে ভারতের মোট আমদানির ৭৮ শতাংশই আসে এই তিন দেশের মাধ্যমে। এর মধ্যে চীন একাই ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো থেকে ভারতের মোট আমদানির ৪১ শতাংশের জোগান দেয়। এতে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে চীনের প্রভাব কতটা শক্তিশালী, তা স্পষ্ট হয়।

অন্যদিকে, ব্রিকসের দেশগুলোর মধ্যে ভারতের মোট রপ্তানির ৩৯ শতাংশ যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। মূলত মুক্তা, মূল্যবান পাথর ও গয়না রপ্তানির কারণে দেশটির সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

ব্রিকস ভারতের জন্য শুধু বাণিজ্য ও অর্থনীতির দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই জোটের সদস্য দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ভারতীয়ও বসবাস করেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রায় ৩ কোটি ৭৩ লাখ প্রবাসী ভারতীয়ের মধ্যে প্রায় ৮৯ লাখ ৮০ হাজারই ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোতে বসবাস করেন। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় বসবাস করেন। দেশ দুটি মিলিয়ে ৭০ লাখেরও বেশি ভারতীয় সেখানে বসবাস করছেন। ফলে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভারতীয় প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় গন্তব্য এই দুই দেশ।

ব্রিকসের দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশটিতে প্রায় ১৮ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করেন। ব্রিকস গঠনের দুই দশক পর এটি এখন আর শুধু উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি জোট নয়। সময়ের সঙ্গে এটি এমন একটি শক্তিশালী জোটে পরিণত হয়েছে, যার সম্মিলিত অর্থনৈতিক উৎপাদনের অংশ এখন জি-৭-এর চেয়েও বেশি।

ভারতের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব শুধু অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ, সব ক্ষেত্রেই ব্রিকস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দিকে ঝুঁকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিকসের গুরুত্ব আরো বাড়তে পারে। উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থা গঠনে এই জোট ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ব্রিকস ভারতকে তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো বড় একটি প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে।