জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির এক সংসদ সদস্যের বক্তব্য ঘিরে জাতীয় সংসদে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাও হইচই হয়েছে। আজ সোমবার সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের বিরতির আগে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
আলোচনায় গাজীপুর-২ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, “সংসদের প্রথম দিন থেকেই ‘আননেসেসারি’ জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক শুরু করা হয়েছে।” তার এই বক্তব্যের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আপত্তি জানান জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় আজ ট্রেজারি বেঞ্চের সরকার গঠন করেছেন, সেই মহান সংসদে জুলাইকে ‘আননেসেসারি’ বলা হয়েছে, জুলাই আলোচনাকে ‘আননেসেসারি’ বলা হয়েছে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
এ সময় সংসদে হইচই শুরু হয়। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা যা কিছু বলবেন, স্পিকারকে অ্যাড্রেস করে বলবেন।’
তিনি বলেন, ‘এখানে তো বিভিন্ন দলের সদস্যরা প্রতিনিধিত্ব করছেন।
স্পিকার বলেন, ‘বাকস্বাধীনতার কারণে প্রত্যেক সদস্য জাতীয় সংসদে নিজের বক্তব্য খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করতে পারেন।’
এ সময়ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে হইচই চলতে থাকলে স্পিকার বলেন, ‘যখন স্পিকার কথা বলে, অনুগ্রহ করে সবাই চুপ করে বসে থাকবেন নিজের আসনে।’
তিনি বলেন, ‘সবারই বাক স্বাধীনতা আছে।
স্পিকার বলেন, ‘সুন্দর ও শালীনভাবে যে যার বক্তব্য জাতীয় সংসদে রাখবেন, এটাই আমরা আশা করি। অহেতুক একজন বক্তাকে কেউ ডিস্টার্ব করবেন না। আপনার টার্ন যখন আসবে, আপনি আপনার বক্তব্য সুবিধামতো দেবেন।
এরপর মাগরিবের নামাজের জন্য ৩০ মিনিটের বিরতি দেওয়া হয়। বিরতির পর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেন, ‘তিনি মঞ্জুরুল করিম রনির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।’
চিফ হুইপের ভাষ্য মতে, “মঞ্জুরুল বলেছেন, তিনি জুলাই সনদকে অপ্রয়োজনীয় বলেননি; বলেছেন, ‘আননেসেসারি’ বিতর্ক করা যাবে না।” প্রয়োজন হলে বক্তব্যের ওই অংশ ‘এক্সপাঞ্জ’ (বাতিল) করার কথাও বলেন চিফ হুইপ।
পরে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ‘বিষয়টি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এর আগে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে নড়াইল-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আতাউর রহমান রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানানোর কারণে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিষয়ে তার অন্তর থেকে ‘কোনো ভালোবাসা’ তৈরি হচ্ছে না। এই রাষ্ট্রপতিই বিগত সময়ে ‘ফ্যাসিজমের’ সব কার্যক্রমকে বৈধতা দিয়েছেন।’
রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানানো নিয়ে সামনের ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি মাঝে মাঝে খেয়াল করে দেখি, উনাদের কেউ যদি একটু বেশি ধন্যবাদ দিয়ে ফেলেন, পাশের জন মুচকি হাসি দেন। তিনিও ভাবেন, এই ধন্যবাদ হয়ত তাদের জন্য ঠিক নয়।’
তিনি বলেন, ‘যে রাষ্ট্রপতি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারের অন্ধকারে রেখে হত্যা করাটাকে বৈধ করেছিল, সেই রাষ্ট্রপতিকে এই সংসদে দাঁড়িয়ে আজ ধন্যবাদ দিচ্ছি। আমি নিশ্চিত, এর মাধ্যমে বেগম জিয়ার আত্মা চরমভাবে কষ্ট পাবে।’
জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘সেজন্য এই দায়িত্ব যারা পালন করছেন, সেই বন্ধুদের অনুরোধ করব, নিশ্চয়ই আমাদের হিসাব-নিকাশ করে কথা বলা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘কুকুরে লেজ নাড়ায়, না লেজে কুকুর নাড়ায়, সেটা বুঝতে পারি না।’
এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির ভাষণ শোনার পরে আমার কাছে দুটি জিনিস মনে হয়েছে। হয় আমাদের রাষ্ট্রপতির মেরুদণ্ড অনেক শক্ত হয়েছে। না হলে মনে হয়েছে, রাষ্ট্রপতির মেরুদণ্ড কেউ বাঁকা করে দিয়েছেন। শেষটাই আমার কাছে মনে হয়েছে সবচেয়ে পারফেক্ট।’
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, একটি আদেশের বিষয়ে তিনি রাষ্ট্রপতিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি তা দিয়েছেন কি না।’
আতাউর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি নাকি তাকে জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি তো দিতে চাইনি। আমাকে দিয়ে দেয়ানো হয়’।’
তিনি বলেন, ওই ঘটনা বর্ণনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘রাজহংসকে জোর করে ডিম্ব পাড়ানো হয়েছে।’
জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আজ রাজহংস আবারও এখানে ডিম পাড়ছে কি পাড়ছে না, তা আমাদের বিশ্বাস করার সুযোগ আছে বলে মনে করি না। যে রাজহংস মালিক পরিবর্তন হলে ডিমের কালার পরিবর্তন করে, ওই রাজহংসের বক্তৃতায় আমাদের ধন্যবাদ জানানোর সুযোগ নেই।’


