khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

আগষ্ট মাস শোকের মাস : বাঙালীর শ্রেষ্ঠ ছয় সন্তানের মৃত্যুর মাস – আগস্ট মাসে বিনোদন নয়

132

মজিবুর রহমান: আমরা বাঙালী বলে যাঁদেরকে নিয়ে প্রতিনিয়ত গর্ববোধ করি, তাঁদের অধিকাংশের স্বাভাবিক মৃত্যু বা হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছিল আগস্ট মাসে । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু, কবি শামসুর রাহমান তাঁদের মধ্যে অন্যতম । এঁরাই বাঙালীর শ্রেষ্ঠ সন্তান । আমাদের গৌরব । প্রাত:স্মরণীয় ব্যক্তি । এঁদের কারণে বিশ্ব দরবারে আজ আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারি । এঁদের সম্পর্কে বাংলা ভাষাভাষিদের মাঝে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই । তবে পরবর্তী প্রজন্মের অনেকে হয়তো জানে না সুভাষ চন্দ্র বসু বা ক্ষুদিরাম বসু কে ছিলেন । কি তাদের অবদান ছিল । আমি খুব সংক্ষিপ্তাকারে বয়সানুসারে তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল ঘটনাগুলো তুলে ধরছি ।

বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু (জন্ম : ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯, মৃত্যু : ১১ আগস্ট ১৯০৮)

ক্ষুদিরাম বসু ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতের মেদিনীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন । তিনি মেদেনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়নকালে শ্রেণী শিক্ষক সত্যেন্দ্র নাথ বসুর কাছে থেকে বৃটিশদের অত্যাচারের গল্প শুনে মনে মনে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন । পরবর্তী সময় ধর্মীয়নেতা শ্রী অরবিন্দ ঘোষ এবং সিস্টার নিবেদিতার মেদিনীপুরে আগমন এবং তাঁদের কাছ থেকে বৃটিশদের অত্যাচারের ঘটনাগুলো শুনে কিশোর ক্ষুদিরাম সশস্র গোপন সংগঠনে যোগদান করেন । অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ‘বইবোমা’ তৈরী এবং ‘পিস্তল’ চালনায় দক্ষতা অর্জন করে বৃটিশদের বিরুদ্ধে সশস্র তৎপরতা শুরু করেন । কলকাতার চীফ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড সন্দেহজনক গ্রেফতারকৃত হাজার হাজার তরুণ-যুবককে বিনাকারণে জেলজুলুম দেওয়ায় বিদ্রোহী সংগঠন তাকে হত্যার দায়িত্ব ক্ষুদিরাম এবং অপর স্কুল ছাত্র প্রফুল্ল চাকীর ওপর অর্পন করে ।

08092015_05_AUGUST_MASH_SHKER_MASH

 

ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকী ৩০ এপ্রিল বিহারের মোজাফ্ফরপুরে ইওরোপিয়ান ক্লাবের কাছে সন্ধ্যা থেকে কিংসফোর্ডের ক্লাবে আসার অপেক্ষায় ওৎ পেতে থাকেন । রাত সাড়ে আটটায় কিংসফোর্ডের ফিটন গাড়িটি তাঁদের নিকটাবর্তী হলে তাঁরা বোমা ছুড়ে মারে । কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত: কিংসফোর্ড সেদিন সে গাড়িতে ছিলেন না । তবে বোমা হামলায় দুজন ইওরোপিয়ান মারা যায় । ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী দ্রুত সেখানে থেকে পালিয়ে রেল স্টেশনে গেলে সেখানে বাঙালী পুলিশের হাতে ধরা পড়েন । প্রফুল্ল চাকী পুলিশকে ঘুষি মেরে পালাতে গিয়ে আবার ধরা পড়ে । সাথে সাথে সে নিজের পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করেন । ক্ষুদিরামকে গ্রেফতার করে কলকাতায় নিলে যাওয়া হয় ।

তিনমাস প্রহসনমুলক বিচারের পর কিশোর ক্ষুদিরামের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয় । আদেশ শুনে ক্ষুদিরামের মুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে । তাঁকে হাসতে দেখে বিচারক জানতে চাইলেন, তুমি কি বুঝতে পারছো, তোমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা হবে ? ক্ষুদিরাম প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তখনো মুখে হাসির রেখা ধরে রেখেছিলেন ।অকুতভয় বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ১১ আগস্ট ভোরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয় । ফাঁসির মঞ্চেও ক্ষুদিরামের মুখে হাসি ছিল ।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (জন্ম : ৭ মে ১৮৬১, মৃত্যু : ৭ আগস্ট ১৯৪১)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ মে ১৮৬১ সালে ভারতের কলকাতা শহরে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতা এবং প্রপিতা ধর্নাঢ্য ও সংস্কৃতিবান ছিলেন । তাঁদের পরিবার ব্রাক্ষ্ম ধর্মের অনুসারী ছিলেন ।রবীন্দ্রনাথ একাধারে সঙ্গীতস্রষ্টা, কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা ও দার্শনিক ছিলেন । রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশায় ১৩টি উপন্যাস, ৯৫টি গল্প, ৩৬টি প্রবন্ধ এবং ১,৯১৫টি গান লিখেছেন । তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৫২টি, অঙ্কিত ছবির সংখ্যা প্রায় ২,০০০টি ।

রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৩ সালে খুলনায় তাঁদের জমিদারীর তহসীলদার কন্যা মৃণালিণী দেবী (ফেলি)কে বিয়ে করেন । তিনি ১৮৯০ সালে পাবনার শিলাইদহের এস্টেটের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন ।১৯০১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের বোলপুরে ‘শান্তিনিকেতন ব্রক্ষ্মচর্যাশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করে সেখানে বসবাস শুরু করেন । ১৯০২ সালে তাঁর স্ত্রী বিয়োগ ঘটে ।রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন । তাঁর লেখা অসংখ্য স্বদেশ গান বাঙালীকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিল ।সাহিত্যে অসাধারণ্যত্যের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে তাঁর রচিত ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরাজী অনুবাদের ওপর নোবেল পুরস্কার লাভ করেন ।১৯১৫ সালে বৃটিশ সরকার তাঁকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন কিন্তু ১৯১৯ সালে বৃটিশ সরকার কর্তৃক জালিয়ানওয়ালাবাগে নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে সেই উপাধি তিনি পরিত্যাগ করেন ।

১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য ‘শ্রী নিকেতন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন ।জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি মানুষের জীবনবোধ নিয়ে লেখালেখি করে করেছেন । শান্তিনিকেতনে দীর্ঘ রোগশয্যায় থাকার পর ১৯৪১ সালে তাঁকে কলকাতার পৌত্রিক বাড়িতে নিয়ে আসা হয় ।১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট যে বাড়িতে তাঁর জন্ম হয়েছিল সেখানেই তিনি দেহ ত্যাগ করেন ।১৯৪৭ সালে স্বাধীনতাউত্তর ভারতে তাঁর লেখা গান ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে, ভারত ভাগ্য বিধাতা’ জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা লাভ করে ।

১৯৭২ সালে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের অভ্যুদ্যেয়ের পর তাঁর লেখা গান ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা লাভ করে ।
সারাবিশ্বে একজন কবির লেখা গান দুটি দেশে জাতীয় সঙ্গীত বিরল ঘটনা বৈকি ।

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু (জন্ম : ২৩ জানুয়ারী ১৮৯৭, অন্তর্ধান : ১৮ আগস্ট ১৯৪৫)

সুভাষ চন্দ্র বসু ২৩ জানুয়ারী ভারতের ওড়িশা জেলার কটক শহরে সম্ভ্রান্ত বাঙালী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি শিশুকাল থেকে লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন । ১৯২০ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অর্জন করে সরকারের উচ্চপদে কর্মকর্তা নিযুক্ত হন । কিন্তু এক বছরের মাথায় বৃটিশের গোলামীর চাকরী থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ।তিনি পর পর দু’ মেয়াদে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ।

বিভিন্ন স্থানে সভা সমাবেশে সুভাষ বসুর দৃঢ় বক্তব্য ছিল– ‘অহিংসায় নয়, উদারতায় নয়, শক্তি প্রয়োগ করেই বৃটিশকে ভারত থেকে তাড়াতে হবে ।’তিনিই সর্বপ্রথম ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে জোড়ালো মত প্রকাশ করেন । পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধী ও তার সমর্থকদের সাথে ভারতের স্বাধীনতা প্রশ্নে আদর্শিক মত পার্থক্য ও অন্যান্য মতবিরোধের কারণে কংগ্রেসের দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দেন । অবশ্য এর কয়েক বছর পর ঐতিহাসিক লাহোর অধিবেশনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস স্বাধীনতার পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ।

সুভাষ বসু বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ সরকারের রোসানলে পড়ে এগারোবার জেল খেটেছেন ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সুভাষ বসু ভারতে বৃটিশদের উপর আক্রমণে সহযোগিতা করার জন্য সুকৌশলে পালিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মান ও জাপান সফর করেন ।অবশেষে জাপানের আর্থিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তায় ১৯৪৩ সালে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ এবং ‘প্রবাসী আজাদ হিন্দ সরকার’ প্রতিষ্ঠা করেন । অবশ্য তৎপূর্বে জাপানীজরা বৃটিশ অধিকৃত সিঙ্গাপুর দখলে নিলে সেখানে একত্রিশ হাজার ভারতীয় বন্দী মুক্তিলাভ করে । জাতীয়তাবাদী নেতা রাসবিহারী ১৯৪১ সালে তাঁদের নিয়ে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আমি’ (আই.এন.এ) গঠন করেন । ১৯৪৩ সালে রাসবিহারী ‘আই.এন.এ’র দায়িত্ব সুভাষ বসু হাতে অর্পন করেন । পরবর্তীতে সুভাষ বসু ‘আই.এন.এ’কে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর সাথে একীভূত করেন । এর সদস্য সংখ্যা ছিল পঁচাশি হাজার । এই ফৌজের একটি সহযোগী নারী বাহিনীও ছিল ।

সুভাষ বসু যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে বৃটিশের মিত্রবাহিনীদের পরাজিত করে ইম্ফল এবং ব্রক্ষ্মদেশ পর্যন্ত দখন করে নেন । ১৯৪৫ সালের ১৭/১৮ আগস্ট তারিখে জাপানের টোকিওতে যাবার পথে তাইওয়ানের বিমান দুর্ঘটনায় অন্তর্ধান হন । সেদিন থেকে আজ অবধি তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (জন্ম : ১৭ মার্চ ১৯২০, মৃত্যু : ১৫ আগস্ট ১৯৭৫)

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত স্বচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর শিক্ষাজীবন গোপালগঞ্জের পাবলিক স্কুলে শুরু হয় । এখানে মাধ্যমিক পাস করে কলকাতায় ইসলামীয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন । এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন । তখন থেকে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন । ১৯৪০ সালে ‘নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে’ যোগ দেন । ১৯৪৩ সালে ওই সংগঠন ছেড়ে ‘বেঙ্গল মুসলিম লীগে’ যোগ দেন । এখানেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য লাভ করেন ।

দেশ ভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ । কিন্তু পাকিস্তানের সূচনালগ্নে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু ঘোষণা করায় ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে । মিছিল, সমাবেশ ও প্রতিবাদ সভায় বঙ্গবন্ধু সহ অন্যান্য ছাত্ররা নেতৃত্ব দান করেন । বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করা হয় । ২১শে ফেব্রুয়ারী পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, গুলিতে শত শত ছাত্র আহত ও নিহত হন । বাধ্য হয়ে সরকার পিছু হটে যায় । কিন্তু বাঙালী মমতার সাথে ২১ ফেরুয়ারীকে বুকে ধারণ করে নেয় ।

পঞ্চাশের দশকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানী ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ রাখার সঙ্গে তিনিও যুক্ত ছিলেন । সে সময় তিনি আওয়ামী লীগের প্রথম যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন । ১৯৫৩ সালে মাওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে আলাদা হয়ে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ’ গঠন করে চলে গেলে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান ।
তিনি ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হয়ে জয় লাভ করে কৃষিমন্ত্রী হন । পরবর্তীতে ৫৬ সালে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান । ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক অভ্যুথ্থানের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয় । প্রায় তিন বছর তাকে কারাবন্দী করে রাখা হয় ।

১৯৬৩ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হলে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন । ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ছয় দফা উথ্থাপন করেন । এই ছয় দফাই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসনের রূপরেখা । সারা দেশে গণসংযোগের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু জনগণের সামনে ছয় দফা তুলে ধরলে ব্যাপক সাড়া পড়ে । পাকিস্তানী স্বৈরাচার সামরিক শাসক গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধু জনপ্রিয়তা দেখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী করে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করে রাখেন । কিন্তু জনগণের প্রবল আন্দোলনের মুখে সামরিক জান্তা আইয়ূব খান ১৯৬৯ সালের ২৩ ফ্রেব্রুয়ারি বিনা শর্তে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় । সেদিনই রেসকোর্স ময়দানে বিশাল সমাবেশে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে ।

বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর এক জনসভায় পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন, ‘বাংলাদেশ’ । তিনি বলেন, “একসময় এ দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইতেছে ।….. একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোনো কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্থিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই ।….. জনগণের পক্ষ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশ ।”

১৯৭০ সালে ১৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের নির্বাচনে জাতীয় গণপরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদে ২৭০টির আসনের মধ্যে ২৬৯টি আসন আওয়ামী লীগ লাভ করে । নির্বাচনের এমন অপ্রতাশিত ফলাফল দেখে সামরিকজান্তারা হতভম্ব হয়ে পড়েন । তারা নানা প্রকার কূটকৌশল প্রয়োগ করে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকেন । বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে রমনা রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো, তোমার যার যার যা-কিছু আছে, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা শত্রুর মোকাবেলা করবে ।’ মনে রাখবা, ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম । এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ।’

শুরু হলো সারা দেশব্যাপী প্রতিরোধ । সড়ক, মহাসড়কে গাছ কেটে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা হলো । শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, কল-কারখানা, ব্যাংক-বীমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ হয়ে গেল ।
সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে গেল । মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী ট্যাঙ্ক-কামান নিয়ে ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর ব্যারাক সহ সাধারণ মানুষের বাড়ি ঘরের উপর নির্বিচারে গুলি করে হত্যাযজ্ঞ চালাতে লাগলো । শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রামে তারা হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ নারী নির্যাতন করতে লাগলো । তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেশের এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করলো ।

ছাত্র-যুবক-তরুণ, কৃষক-শ্রমিক-মজুর অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লো । ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হলো, রক্ষ লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারালো ।নয় মাস সশস্র যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী পরাজয় বরণ করে ভারত-বাংলাদেশের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করলো । ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন-ভারত হয়ে ১০ জানুয়ারী বাংলাদেশে মাটিতে পদাপর্ন করেন । ওইদিন রমনা রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনস্রোত তাঁকে জাতীর জনক হিসাবে বরণ করে নেন ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু সহ তার পরিবারের সবাইকে নির্মম ভাবে হত্যা করে । যে মানুষটি জীবনভর বাঙালীর মুক্তির জন্য সামরিক জান্তার বিরোধী লড়াই করে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিলেন তাঁকে দেশটি গড়ার সুযোগ দেওয়া হলো না ।সেদিন বিপথগামী সেনারা বাঙালী জাতীর ললাটে যে কলঙ্কের দাগ লেপন করে দিয়েছিল তা কোনোদিন মুছে যাবে না । ভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা সে সময় দেশের বাইরে থাকায় সেদিন প্রাণে বেঁচে গেছেন ।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (জন্ম : ২৫ মে ১৮৯৯, মৃত্যু : ২৯ আগস্ট ১৯৭৬)

কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৫ মে ভারতের বর্ধমান জেলার চরুলিয়া গ্রামে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মসজিদের মক্তবে । কিন্তু নয় বছরের মাথায় পিতার ইন্তেকালে তাঁকে সংসারের হাল ধরতে হয় । তখন যাত্রাদলে গান গেয়ে তাঁকে জীবিকা নির্বাহ করতে হতো । সবশেষে আসানসোলে এক চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ এবং রেলের একজন খ্রীস্টান গার্ডের খানসামানের কাজ নেন ।

১৯১০ সালে নজরুল পুনরায় স্কুলে ভর্তি হন । কিন্তু কঠিন দারিদ্রতা তাঁর পড়াশোনায় বারবার বাধাগ্রস্ত করলেও শেষ পর্যন্ত দশম শ্রেণী পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন । নজরুল ১৯১৭ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক হিসাবে যোগদান করেন এবং করাচীতে বদলী হযে যান । সেখানে ধীরে ধীরে প্রমোশন হয়ে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত র্যা ঙ্ক পান । তিনি অবসর সময়ে সাহিত্য রচনা এবং সেনানিবাসের একজন পাঞ্জাবী মাওলানার কাছে ফার্সি ভাষা আয়ত্ব করেন ।

১৯২১ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হয় । নজরুল তখন কলকাতায় ফিরে আসেন । এই সময় কলকাতার সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা মুজফফর আহমেদের সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে । তারা বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি অফিসে একত্রে বসবাস করতেন । এ সময় কমরেড মুজফফরের কাছ থেকে নজরুল ইসলাম সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা লাভ করেন । পরবর্তীকালে একতা ও লাঙ্গল নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশ করেন ।

নজরুল ইসলামই প্রথম বাংলায় ইসলামী সঙ্গীত (গজল) রচনা করেন । পাশাপাশি শ্যামাসঙ্গীত, ভক্তিসঙ্গীত রচনা করেন । তিনি অসম্প্রদায়িক কবি ছিলেন । তাঁর সমসাময়িক সময়ে কেউ অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না । তাঁর লেখায়, তিনি হিন্দু-মুসলিমে গালাগালি না দেখে গলাগলি দেখতে চেয়েছেন ।নজরুল ইসলাম সরাসরি লেখনীর মাধ্যমে ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন । এ জন্য বৃটিশ সরকার তাঁর পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করেছে, প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছে, গ্রেফতার করে বিচারে এক বছর সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সময় তাঁর গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ বইটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন । উপমহাদেশে লেখালেখির জন্য প্রথম দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি হলেন কাজী নজরুল ইসলাম ।জেল থেকে ছাড়া পাবার পর তিনি কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে বৃটিশদের বিরুদ্ধে জনগণকে গানে ও কবিতার মাধ্যমে উজ্জীবিত করেছেন ।

08092015_06_AUGUST_MASH_SHKER_MASH

 

নজরুল ইসলাম প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন এবং এর অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন । বাংলা সাহিত্যে আর কোনো কবি এত গান লেখেননি । তাঁর গানগুলোর মধ্যে প্রেম, প্রকৃতি, দ্রোহ, ইসলামী, শ্যামা, ভক্তিগীতি, দেশাত্মবোধক অন্যতম । রচনা করেছেন, কবিতা, উপন্যাস, ছোট গল্প, নাটক, প্রবন্ধ । সম্পাদনা করেছেন অসংখ্য সাময়িকী ।নজরুল সমাজ ও রাষ্ট্রে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন । তাঁর গানে ও কবিতায় তা স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে । নজরুলের সংসারে কখনো স্বচ্ছলতা আসেনি । সারা জীবন তাঁকে অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে । চাকরী করেছেন গ্রামোফোন কোম্পানীতে এবং কলকাতা বেতারে । কিন্তু তাতেও সুফল আসেনি ।১৯৭২ সালের মে মাসে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বি্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কলকাতা থেকে বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করে জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করেন । দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর বাকরুদ্ধ, মানসিক ভারসাম্যহীন এই কবি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় ইন্তেকাল করেন ।

প্রধান কবি শামসুর রাহমান (জন্ম : ২৩ অক্টোবর ১৯২৯, মৃত্যু : ১৭ আগস্ট ২০০৬)

শামসুর রাহমানের জন্ম ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবরে ঢাকার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে । তাঁদের আদি বাড়ি ঢাকা শহরের মাহুতটুলিতে ।ঢাকার পোগজ স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক, এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে এম.এ পাশ করেন ।জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংবাদপত্রের সহকারী সম্পাদক ও সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন । কিশোর বয়স থেকে ছড়া ও কবিতা লেখার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন । বাঙালী বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে অনেক কবিতা তিনি লিখেছেন । পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের অন্যায়, অত্যাচার জুলুমের বিরুদ্ধে সরকারী চাকরী করেও লেখনীর মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন ।

শামসুর রাহমান বিংশ শতকের ত্রিশ দশকের পাঁচ শ্রেষ্ঠ কবির পর আধুনিক বাযলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন ।১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আদিনিবাস নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে চলে যান । সেখানে যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় আক্রান্ত ও বেদনামথিত ‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতা দুটি লেখেন ।সাম্প্রদায়িক শক্তি বার বার তাঁর বিরুদ্ধে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে । তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে খুনীরা ধারালো অস্ত্র সহ তার বাসায় হামলা করে ।

শামসুর রাহমানের প্রকাশিকগ্রন্থের সংখ্যা ৯০টি । এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদগ্রন্থ এবং শিশু-ছড়া অন্তর্ভূক্ত ।উল্লেখযোগ্য পুরস্কারপ্রাপ্তির মধ্যে– আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার (কলিকাতা), বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক । বাংলাদেশে প্রধান কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতাল ইন্তেকাল করেন ।

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed.