দেশহারা মানুষের সংগ্রামে কবিতা

0 95

মুহাম্মদ সামাদ: এই বাংলা বা ভারতবর্ষের শিশুর জন্ম-মুহূর্তের চিরায়ত ঘটনা দিয়ে আরম্ভ করি। অবুঝ বয়সে গাঁয়ের আঁতুড় ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আমি একদিন মায়ের গর্ভ থেকে মাটিতে পড়ে সদ্যপ্রসূত রক্তমাখা শিশুকে কাঁদতে দেখেছিলাম। তখনও পৃথিবীতে আসা এই নতুন শিশুর নাড়ি কাটা হয় নি বা মায়ের দেহ থেকে সে আলাদা হয় নি। অতঃপর, নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় আমার স্কুল শিক্ষক শ্রী নারায়ন চন্দ্র সূত্রধর (নারায়ন প-িত) এই নাড়ির বন্ধন ও মায়ের রক্তেভেজা আঁতুড় ঘরের মাটির সঙ্গে শিশুর আজন্ম সম্পর্কের কথা মিলিয়ে ‘নাড়ির টান’ ও ‘মাতৃভূমি’র একটা সরল ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। শিশুর জন্মের মুহূর্তের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমার প-িত স্যারের ব্যাখ্যাটি মিলে যাওয়ায় আজও আমি মাতৃভূমিকে মায়ের মমতার আধার হিসেবে অনুভব করি। অন্যদেশে থাকার কথা ভাবতে পারি না। এখন অবাক হয়ে দেখি, সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় জন্মভূমির প্রতি মানুষের নাড়ির টানের ধারণাটি প্রতিদিনই আরও স্পষ্ট হয়ে চলেছে। সেটি যেমন উৎসবে-পার্বনে প্রান্তিক মানুষের নাড়ির টানে ঘরে ফেরার মধ্যে, তেমনি প্রবাসী মানুষের দেশে ছুটে আসার মধ্যেও। এ ছাড়া, কী এক অজানা আকর্ষণে ঝড়-বন্যা-জ¦লোচ্ছ্বাসে, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সবকিছু হারিয়েও মানুষ তার মাটিতে ফিরে যেতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। তাই কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হয়: ‘জননী জন্মভূমিশ্চঃ স্বর্গাদপী গরিয়সী’ কিংবা ডি. এল. রায়ের গান: ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি/সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি’। জন্মভূমির জন্যে এই ব্যাকুলতা শুধু বাঙালির নয়, সকল জাতির দেশহারা মানুষের সংগ্রামের এ এক অভিন্ন সুর।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং সাতচল্লিশের দেশভাগের ফলে আমরা প্রজন্ম পরম্পরায় বয়ে চলেছি জন্মভূমি ও স্বজন হারানোর বেদনা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের মানুষ ঘরবাড়ি-সহায়-সম্পদ-উপাসনালয় সবকিছু ফেলে শুধু নিজেদের প্রাণটুকু নিয়ে দেশহারা হয়েছে। রুয়ান্ডা, সুদান, প্যালেস্টাইন, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশহারা মানুষের ভয়াবহ কষ্টও আমাদের উৎকণ্ঠিত করে। অন্যায় যুদ্ধ ও জাতিগত দাঙ্গায় ভূমধ্যসাগরের তীরে মরে উবু হয়ে পড়ে থাকা তিন বছরের আইলান কুর্দিসহ ফুটফুটে অবোধ শিশু, উজ্জ্বল তরুণ-তরুণী; আর তাদের রিক্ত-নিঃস্ব, বিধ্বস্ত পিতামাতা ও স্বজনদের জার্মানি-অষ্ট্রিয়াসহ ইউরোপ জুড়ে গন্তব্যহীন অনিশ্চিত কাফেলা দেখে প্রতিদিনই মা বসুধার হৃদয় আরও ভারাক্রান্ত, আরও বেদনার্ত হয়ে ওঠে। কারণ, দেশহারা মানুষেরা সর্বত্রই নির্মম ও নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ আর লুটপাটের শিকার।

অতি সম্প্রতি আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সে দেশের সেনাবাহিনী যে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে, তাতে জাতিসংঘসহ পৃথিবীর বিবেকবান মানুষ স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ। শত শত বছর ধরে, বংশানুক্রমে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘর ও সম্পদ লুণ্ঠনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সকল বিচারে তারা হারিয়েছেন তাদের জন্মসূত্রে অর্জিত নাগরিকত্বের অধিকার।

প্রসঙ্গত, সমস্যাটি রাজনৈতিক হলেও মানবিক বিবেচনায় তাদের আশ্রয় দিয়ে, একদিকে বাংলাদেশ বিশে^র প্রায় সকল রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহানুভূতি লাভ করেছে, অন্যদিকে আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা মানুষের প্রতি তাঁর আশৈশব ভালোবাসার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধিতে ভূষিত হয়ে সমগ্র পৃথিবীতে নন্দিত হয়েছেন। সে জন্যে আমরা গৌরবান্বিত।

এ সবই সাম্রাজ্যবাদী অস্ত্র ব্যবসায়ীদের আধিপত্যের সীমাহীন দৌরাত্ম, সমরতন্ত্রের ক্ষমতা লিপ্সা ও গণতন্ত্রহীনতার যোগফল মাত্র। এহেন অশুভ তৎপরতার ভার আমরা আর বইতে পারছি না! আমরা চাই, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লোকজনকে যথাশীঘ্র সসম্মানে তাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়া হোক; তাদের ওপর নির্দয় নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের বিচার হোক এবং সকল নাগরিক অধিকার বলবৎ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।

আজ ক্ষুধার কামড়ে, সমুদ্রের আগ্রাসী ঢেউয়ে বা বরফ-তুষারের হিমশীতল বিষে জর্জরিত লক্ষ কোটি দেশহারা মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টে আমরা, পৃথিবীর সকল প্রান্তের কবিরা যুগপৎ বিষণœ ও প্রতিবাদমুখর। সকল যুগে, সকল কালে অমানবিকতার বিপরীতে কবির কলমে অবিরল ঝরেছে শাণিত প্রতিবাদ, আশা, ভালোবাসা আর মানুষের জয়গান।
তাই, মধ্যযুগেই বাঙালি কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হয়Ñ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য/তাহার উপরে নাই’; বঙ্গভঙ্গের বেদনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পথে নেমে রাখিবন্ধন রচনা করেন এবং গেয়ে ওঠেন:…‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি/… মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি…’; আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চিরবিদ্রোহীকণ্ঠে ফুটে ওঠে মানবতার করুণ আর্তি:…‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,/কা-ারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ।/“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?/ কা-ারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!…’। উনিশশ একাত্তরে মার্কিন কবি এলেন গিন্সবার্গ আমাদের দেশহারা মানুষের কষ্টকে মেলে ধরেন এভাবে:…‘One Million aunts are dying for bread/One Million uncles lamenting the dead/Grandfather millions homeless and sad/Grandmother millions silently mad…’; অন্যদিকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কর্তৃক বাঙালি নিধনের প্রতিবাদে কবি শামসুর রাহমানের ক্ষুব্ধ কণ্ঠে ধ্বনিত হয়: ‘আমি অভিশাপ দিচ্ছি/আমাকে করেছে বাধ্য যারা/আমার জনক জননীর রক্তে পা ডুবিয়ে দ্র্র্রুত/সিঁড়ি ভেঙে যেতে/ভাসতে নদীতে আর বনবাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে,/অভিশাপ দিচ্ছি আজ সেই খানে-দজ্জালদের’। আর, প্যালেস্টাইনের কবি মাহমুদ দারবিশ দেশহারা মানুষের মাঝে নিজেকে একাত্ম করে তীব্র চিৎকারে ফেটে পড়েন: ‘…All the hearts of the people are my identity/So take away my passport! অথবা I learnt all the words and broke them up/To make a single word: Homeland…’।

দেশহারা দেবশিশু আইলান কুর্দির করুণ মৃত্যুকে নিয়ে আমাদের কবিরা সাহিত্য সাময়িকীর পাতা ভরিয়ে ফেলেন অশ্রু আর ক্রোধে; সদ্যজাত দেশহারা রাখাইন শিশু, নারী, অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধার রিক্ত-নিঃস্ব-অসহায় মুখের মুহ্যমান চিত্র গভীর মমতায় ফুটে উঠেছে আমাদের কবিতায়। তাই, ৩২তম জাতীয় কবিতা উৎসবের মর্মবাণীতে, কবিতায়, গানে ও কথামালায় আমরা তুলে ধরেছি দেশহারা মানুষের সংগ্রামের কথা, তাদের প্রতি আমাদের সকলের গভীর সহমর্মিতার কথা। জয় হোক দেশহারা মানুষের। জয় হোক কবিতার।

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply