অগোছালো বইমেলায় নতুন বইয়ের ঘ্রাণ

0 24

দ্বার খুললো বইমেলার। তবে খুব অগোছালো। এখনও অনেক স্টল তৈরিই হয়নি। শ’খানেক স্টল তো খোলেইনি প্রথম দিন। মেলার কোনায় কোনায় অন্ধকার। আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা হয়নি এখনও। যারা স্টল খুলেছেন সেসব স্টলে এখনও বই সাজানো চলছে। মেলায় ঢুকলেই ধুলোয় পা মাখামাখি হয়ে যায়। তবুও মন ভালো হয়ে যায়। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ সব আকর্ষণ কেড়ে নেয়। তাই ধুলো জড়ানো পথ মাড়িয়ে স্টলে স্টলে মণি-মাণিক্য কুড়াতে ব্যস্ত দেখা গেল পাঠকদের।

বাঙালির জীবনে ফিরে এলো নতুন বইয়ের গন্ধ জড়ানো মাদকতাময় মাস। ফিরে এলো বইমেলা। প্রথম দিনেই কিন্তু অনেক ভালো ভালো বই চলে এসেছে মেলায়। মুহম্মদ জাফর ইকবালের সাইক্লোন চলে এসেছে তাম্রলিপির স্টলে। সময় প্রকাশনীতে পাওয়া যাচ্ছে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ‘সংকট ও সুযোগ’ বইটি। মাওলা ব্রাদার্স এনেছে সরদার আবদুর রহমানের ‘হিমালয়ের ভাটিতে ভারতের নদী-নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প ও বাংলাদেশের অবস্থান’ বইটি। সৈয়দ শামসুল হকের নতুন কবিতার বই ‘উত্কট তন্দ্রার নিচে’ এনেছে অন্যপ্রকাশ, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স এনেছে অলকানন্দা প্যাটেলের ‘পৃথিবীর পথে হেঁটে’ প্রভৃতি।

ধীরে ধীরে বইমেলার চরিত্র বদলাচ্ছে। পরিধি বাড়ছে, বাড়ছে বইয়ের প্রকাশনা। পাঠকের আগ্রহ বিভিন্ন দিকে ধাবিত হচ্ছে। শুধু গল্প, উপন্যাস কবিতা ও প্রবন্ধে থেমে নেই। সে কারণে বই বৈচিত্র্য বেড়েছে। যারা তরুণরা বই পড়ছে না বলে ‘হায় হায়’ করেন তাদের মিথ্যে প্রমাণ করে বিকেলে বইমেলা ভরে উঠেছিল তরুণ-তরুণীদের পদচারণায়। স্টলগুলোতে বিক্রেতাদের বই গোছাবেন নাকি বিক্রি করবেন এমন মধুর সমস্যাতেও পড়তে দেখা গেল। অনেকে খোঁজ করছেন তার প্রিয় লেখকটির বই এসেছে কি না। প্রথম দিনেই প্রিয় লেখকের বইটি হাতে পাবার আগ্রহ। হোক অল্প কিন্তু বই বিক্রি শুরু হয়ে গেছে স্টলগুলোতে। প্রিয় লেখকের নতুন বইয়ের মন মাতানো ঘ্রাণ বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন সবাই।

‘মেলা স্মার্ট হয়েছে’:সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটগুলো দিয়ে ঢুকলে প্রথমেই বিভিন্ন প্যাভিলিয়ন। তারপর সারি সারি স্টল। এবার প্যাভিলয়নের সংখ্যা বেড়েছে। যার কারণে মেলা আরো দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠবে। প্যাভিলিয়নগুলোকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে স্টল। চওড়া পথ রয়েছে। সুতরাং প্রস্তুতি খুব খারাপ নয় মেলা কর্তৃপক্ষের।

প্রথম দিনেই মেলায় এসেছিলেন জনপ্রিয় লেখক ইমদাদুল হক মিলন। বললেন, প্রথম দিনেই মেলা ঠিক বোঝা যায় না। খানিক অগোছালো থাকে। তবে মেলা স্মার্ট হয়েছে। এবার মেলার বিন্যাস চমত্কার হয়েছে, পরিধি বেড়েছে। প্যাভিলিয়ন বেড়েছে। এসব উদ্যোগ পাঠককে ঘুরে ফিরে স্বাচ্ছন্দ্যে বই কিনতে সহযোগিতা করবে।

অন্যপ্রকাশের অন্যতম স্বত্বাধিকারী ও জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম বললেন, মেলা গুছিয়ে উঠতে সময় লাগে। তবে স্টলের বিন্যাস ও আলোর ব্যবস্থা সুন্দর হয়েছে। এখনো অনেক কিছুই অগোছালো রয়ে গেছে। মেলা কর্তৃপক্ষ দ্রুত সেসব সমস্যা কাটিয়ে উঠবেন বলে আশা করেন তিনি। তবে আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক ওসমান গণি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, পরিকল্পনাহীন বিশৃংখল মেলা হয়েছে। কোনায় কোনায় খাবারের দোকান। মেলা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থাকবে। অনেক প্যাঁচঘোচের ডিজাইন করা হয়েছে। যা পাঠকদের অসুবিধায় ফেলবে।

এদিকে গতকাল মেলা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় ১০০টি স্টল এখনও পরিপূর্ণভাবে চালু করতে পারেনি স্টল মালিকরা। অনেকগুলো স্টলেই দেখা যায়, এখনও চলছে রঙের কাজ। সে সঙ্গে মেলা প্রাঙ্গণের এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে স্টলের সজ্জায় ব্যবহূত সরঞ্জাম। সে সঙ্গে মেলার দর্শনার্থীদের জন্য এখনও চালু হয়নি টয়লেট। এর পাশাপাশি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বহেড়াতলায় অবস্থিত লিটলম্যাগ চত্বরটিতে কোনো স্টল চালু হয়নি।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. জালাল আহমেদ বলেন, মেলার নীতিমালা অনুযায়ী, ৩০ জানুয়ারির মধ্যে মেলার স্টল সজ্জার কাজ করার কথা। যারা করেনি, আশা করি তারা শুক্রবারের মধ্যে স্টল চালু করবেন। না করলে নীতিমালা অনুযায়ী, আমরা স্টল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেবো। লিটলম্যাগ চত্বরের বিষয়ে তিনি বলেন, এ চত্বরটি প্রথমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছিল। কিন্তু পরে লিটলম্যাগের স্বত্বাধিকারীদের দাবির

মুখে সেটি বহেড়াতলায় স্থানান্তর করা হয়। সেজন্য কিছু কাজ এখনও বাকি। শুক্রবারের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

তিনশ নতুন বই:এখনও তথ্য কেন্দ্র চালু হয়নি। তবে প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনুমানিক তিন শতাধিক নতুন বই চলে এসেছে মেলায়। আগামী প্রকাশনী থেকে এসেছে আসাদুজ্জামান আসাদের ‘ইতিহাসের নির্মাতার মৃত্যু’, হেলাল উদ্দিন আহমেদের ‘করাপশন ইন বাংলাদেশ: কজেজ, কস্টস অ্যান্ড রিমেডিজ’, বিমলেন্দু হালদারের ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা: অতীত ও বর্তমান’, হাসনাত আবদুল হাইয়ের উপন্যাস ‘সময় অসময়’, দেবাশীষ ঘোষের ‘ক্ষোভ’। অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে শাহাবুদ্দীন নাগরীর ‘জোত্স্নাভর্তি ক্যারাভানে আমি নেই’, মোস্তফা কামালের ‘চন্দ্রমুখীর সুইসাইড নোট’। বিদ্যাপ্রকাশ এনেছে মোহিত কামালের ‘দুমুখো আগুন’। কথাপ্রকাশ থেকে এসেছে শিহাব শাহরিয়ার সম্পাদিত ‘জীবনানন্দ দাশ: গ্রন্থিত ও অগ্রন্থিত কবিতাসমগ্র’, ড.মাহবুবুল হকের ‘তিন জন আধুনিক কবি’, সৈয়দ আজিজুল হকের ‘মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ছোটগল্প : সমাজ চেতনা ও জীবনের রূপায়ন’, যতীন সরকারের ‘মুক্তবুদ্ধির চড়াই উতরাই’। হাসান আজিজুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের আলাপচারিতার সংকলন নিয়ে ‘আমার ইলিয়াস’ শিরোনামে বইটি এসেছে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে। এই প্রকাশনী থেকে এসেছে মোহাম্মদ রফিকের ‘কবিতা সমগ্র’, রিজিয়া রহমানের ‘মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস’, শ্রীনাথ চন্দের ‘ব্রাহ্মসমাজের চল্লিশ বত্সর’। অন্বেষা প্রকাশনা থেকে এসেছে আবদুল গাফফার রণির ‘কৃষ্ণগহ্বর’ শিরোনামের সায়েন্স ফিকশন বইটি, এসেছে ইসমাইল সাদীর ‘সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় প্রেম ও নিসর্গ’। বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে এসেছে হরিশংকর জলদাসের ‘ক্ষরণ’, ক্রিস্টোফারের বেনিনজারের ‘তরুণ স্থপতিকে লেখা পত্রাবলী’, আবু ইসহাক হোসেনের ‘বাংলার রেনেসাঁস ও লালন ফকির’, মোজাফ্ফর হোসেনের ‘বিশ্বসাহিত্যের কথা’। যোগীন্দ্রনাথ সমাদ্দারের ‘প্রাচীন ভারত’, জোয়াকিম জোসেফের ‘হিস্টরি অব দ্য পর্তুগিজ ই বেঙ্গল’, শিরিন আখতারের ‘সুবে বাংলার জমিদার ও জমিদারী’ বইগুলো এসেছে দিব্যপ্রকাশ থেকে। ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে এসেছে নূরুল আনোয়ারের ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকান্ড: দুর্যোধনটি কে?’, বুলবুল সারওয়ারের ‘মহাভারতের পথে : এক’, তাম্রলিপি থেকে গুলতেকিন খানের ‘চৌকাঠ’, আহসান হাবীবের ‘সত্যি অ্যাডভেঞ্চার’ প্রকাশিত হয়েছে। অবসর থেকে এসেছে হুমায়ূন আহমেদের ‘সেরা সাত মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস’। কাকলী প্রকাশনী থেকে এসেছে সুমন্ত আসলামের ‘তুমি আছো তাই’। অনিন্দ্যপ্রকাশ থেকে এসেছে আহমদ রফিকের ‘কবিতার বিভিন্ন ভাষা’, দ্বিজেন শর্মার ‘নিসর্গকথা’। অনন্যা থেকে এসেছে ইমদাদুল হক মিলনের ‘একটি রহস্য উপন্যাস’।

আজ শিশু প্রহর:অমর একুশে গ্রন্থমেলার দ্বিতীয় দিন আজ শুক্রবার ছুটির দিনে রয়েছে শিশু প্রহর। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুরা তাদের অভিভাবক নিয়ে মেলায় আসতে পারবেন। দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা উন্মুক্ত থাকবে বড়দের জন্য।

আজকের অনুষ্ঠান:আজ শুক্রবার বিকাল ৪টা গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘শহিদ নূতনচন্দ্র সিংহ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সজিব কুমার ঘোষ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন মহীবুল আজিজ, প্রফুল্ল চন্দ্র সিংহ এবং রাশেদ রউফ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আবদুল মান্নান। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply