মহাবিদ্রোহী মধুসূদন ও তাঁর মৃত্যুহীন মহাকাব্য

50

সৈয়দ জাহিদ হাসান : বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের (১৮২৪-১৮৭৩) আবির্ভাব নব প্রভাতে অরুণোদয়ের সঙ্গে তুল্য। পূর্বাকাশে সূর্যোদয় হলে যেমন অন্ধকার দূর হয়ে দশদিগন্ত আলোয় ভরে ওঠে, মধুসূদনের আবির্ভাবও ছিল নবোদিত তিমিরবিদারী দিনমণির মতো। তিনি এলেন আর খান খান করে ভেঙে পড়ল মধ্য যুগের একই বৃত্তে আটকা পড়া বাংলা কবিতার ছন্দ। তিনি এলেন আর বাংলা নাটক হেসে উঠল সার্থকতার হাসি। প্রহসন বলি আর পত্রকাব্যই বলি সবকিছুই দত্তকুলোদ্ভব কবি মধুসূদনের দান। বাংলা সাহিত্যের একমাত্র সার্থক মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ও তাঁর সৃষ্টি। সনেট, গীতি কবিতা, নীতিগর্ভ কাব্য কি নেই তাঁর ঝলমলে ঝুলিতে!

তাঁর অনিন্দ্যসুন্দর প্রতিভা ছাড়া নতুন পথে বাংলা সাহিত্যের যাত্রা ছিল অসম্ভব। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জায়গায় অত্যন্ত সফল ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বাংলা সাহিত্যের সুধাপায়ী যারা, তাদেরও কিছু দায় আছে মধুসূদনের প্রতি। দুর্মর মেধাবী এই কবি আজ শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। আজ সময় এসেছে মধুসূদনকে নতুন দৃষ্টি দিয়ে দেখে নতুন করে অনুসন্ধান করার। এই অবশ্য কর্তব্য, শ্রমসাধ্য কাজটি যত দ্রুত আমরা সম্পন্ন করতে পারবÑ ততই বাঙালি ও বাংলা সাহিত্যের জন্য মঙ্গল। বাংলা সাহিত্য প্রেমী লেখক-পাঠককে সেই মঙ্গল পথের পথিক হওয়া জরুরি।

কবি হিসেবে মধুসূদনের যাত্রা শুরু ১৮৪৯ সালে “The captive ladie” ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। মধু কবির সৃষ্টিকর্মকে সামনে রেখে যদি তার জীবনের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যায় ১৮৫০ এর দশক ছিল ইংরেজিতে লেখা মৌলিক ও অনুবাদকর্ম প্রকাশের দশক (দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া) আর ১৮৬০-এর দশক ছিল তাঁর কালজয়ী বাংলা লেখা প্রকাশের মাহেন্দ্রক্ষণ। উনিশ শতকের ষাটের দশক কেবল মধুসূদনেরই দখলে ছিল এ কথা বললে মোটেই অত্যুক্তি হয় না। কেননা এই দশক জুড়েই প্রকাশিত হয় তাঁরÑ একেই কি বলে সভ্যতা (১৮৬০), বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০), পদ্মাবতী নাটক (১৮৬০), তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০), মেঘনাদবধ কাব্য ১ম খ- ও ২য় খ- (১৮৬১), ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১), কৃষ্ণকুমারী নাটক (১৮৬১), বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২), চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৯৬৬)। মাত্র আট বছরের মতো তিনি বাংলা সাহিত্য চর্চা করেছেন। এই আট বছরে তিনি বাংলা কবিতা ও নাটকে যে সাফল্য দেখিয়েছেন তা কেবল পাঠকের বিস্ময়ই উদ্রেক করে না, পাঠককে বিমোহিতও করে।

‘মেঘনাদবধ কাব্য’ মাইকেল মধুসূদন দত্তের সর্বাধিক পঠিত, সর্বাধিক আলোচিত-সমালোচিত ও বিস্ময়কর মহাকাব্য। মেঘনাদবধ কাব্য আর মাইকেল মধুসূদন দত্ত অর্থাৎ সৃষ্টিকর্ম ও স্রষ্টা একে-অপরের গৌরবের কারণ। বিশাল, বিপুল সৃজনক্ষমতা, ইতিহাস-ঐতিহ্য-পুরাণজ্ঞান আর বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে অগাধ পা-িত্য না থাকলে কোনো কবির পক্ষে এ রকম অতুলনীয় মহাকাব্য সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। মাইকেল মধুসূদনের অভিজাত ও অহংকারী ব্যক্তিত্বে এই সবগুলো গুণই ছিল। তাই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে এমন অলৌকিক মহাকাব্য সৃষ্টি করা। তা নাহলে আযৌবন ইংরেজি সাহিত্য চর্চা করা একজন উদ্ধত, বাংলা না-জানা বাঙালির পক্ষে এমন অত্যাশ্চর্য মহাকাব্য রচনা করা সম্ভবপর ছিল না।

‘মেঘনাদবধ কাব্য’ নয়টি সর্গ সম্বলিত, যতি স্বাধীন, প্রবহমান, অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত। কাব্যটির প্রথম সংস্করণ দুই খ-ে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম খ- প্রকাশিত হয় ৪ জানুয়ারি, ১৮৬১ সালে। এই খ-ে মোট ৫টি সর্গ ছিল (১ম থেকে ৫ম সর্গ)। পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিলÑ ১৩১। দ্বিতীয় খ- ১৮৬১ সালেই প্রকাশিত হয় শেষ চারটা সর্গ নিয়ে। দ্বিতীয় খ-ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিলÑ ১০৪। মধুসূদনের জীবদ্দশায় মেঘনাদবধ কাব্যের ৬টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ৬ষ্ঠ সংস্করণে দুই খ- এক সঙ্গে প্রকাশিত হয় ২০ জুলাই, ১৮৬৯ সালে। তখন এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩২০। রাজা দিগম্বর মিত্র এই কাব্যের প্রথম সংস্করণের ব্যয়ভার বহন করেন বলে মাইকেল মধুসূদন দত্ত রাজা দিগম্বর মিত্রকেই এই কাব্য উৎসর্গ করেন (প্রথম খ-ের মঙ্গলাচরণে সেই কথাই লিপিবদ্ধ আছে)। কিন্তু কবি’র ইউরোপ প্রবাস কালে রাজা দিগম্বর মিত্রের সঙ্গে কবি’র মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়, যার ফলে কাব্যের তৃতীয় সংস্করণে উৎসর্গ পত্র থেকে রাজা দিগম্বর মিত্রের নাম বর্জন করা হয়।

মেঘনাদবধ কাব্যের নয়টি সর্গ জুড়ে ও স্বর্গ-মর্ত-পাতাল ভেদ করে যে কাহিনী শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে তা মূলত মহাকবি বাল্মীকির ‘রামায়ণ’ হতে সংগৃহীত। ‘রামায়ণে’ উল্লিখিত রাম-রাবণের যুদ্ধ ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ নবপ্রাণ লাভ করেছে। সেই সঙ্গে পাশ্চাত্য মহাকবিদের রুচিবোধ ও কাব্যশৈলী যোগ হয়ে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ হয়ে উঠেছে কালজয়ী।

লঙ্কার রাজা রাবণ, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন নিয়ে তার সুখের সংসার। রাবণ ‘রামায়ণে’ রাক্ষস হলেও ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ তিনি মানবিক গুণসম্পন্ন একজন প্রজাবৎসল-দেশপ্রেমিক রাজা। তিনি পত্মীপ্রেমে মুগ্ধ ও বিগলিত, পুত্রস্নেহে অন্ধ ও হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। যেকোনো গার্হস্থ্য মানুষের জন্য এই গুণগুলো চরিত্রভূষণ। অন্যদিকে রাম অযোধ্যারাজ দশরথের ভাগ্য বিড়াম্বিত পুত্র। তিনি সতী-সাধ্বী স্ত্রী সীতাকে নিয়ে পিতৃশর্ত রক্ষার্থে পঞ্চবটী বনে নির্বাসিত। সঙ্গে আছে চিরানুগত বৈমাত্রেয় ভ্রাতা লক্ষ্মণ। রাবণের বিধবা ভগিনী শূর্পণখা রামকে পতিত্বে বরণ করার বাসনা প্রকাশ করলে তিনি প্রত্যাখ্যাত হন এবং লক্ষ্মণ শূর্পণখার কর্ণ-নাসিকা ছেদন পূর্বক অপমান করে তাড়িয়ে দেন। বোনের এই দুর্গতি দেখে রাবণ অস্থির হয়ে ওঠেন এবং সীতাকে কৌশলে অপহরণ করে অশোকবনে বন্দী করে রাখেন। এরপর সীতাকে উদ্ধারের জন্য রাম-লক্ষ্মণ লঙ্কার রাজা রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং যুদ্ধে জয়ী হয়ে সীতাকে উদ্ধার করেন। সংক্ষেপে এই হলো ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র কাহিনীসূত্র।

এখানে একটি কথা না বললেই নয়Ñ যদিও মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘রামায়ণ’ হতে তার কাহিনীর ‘বীজ’ সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু রামায়ণের পুনর্পাঠ নয়; তিনি গড়তে চেয়েছেন এক নতুন উপাখ্যান। সেই উপাখ্যানের ভেতরে তিনি এমন কিছু চেতনা সৃষ্টি করেছেন যেগুলো উপলব্ধি করতে না পারলে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ পাঠ করাই বৃথা হয়ে যায়। তাই আমি মনে করি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ পাঠে লেখকের চেয়ে পাঠকেরই দায় বেশি।

অনেক সমালোচকই মধুসূদন প্রসঙ্গে বলে থাকেনÑ তিনি ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। আসলেই কি তাই? ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ কোনো কিছুই নতুন নয়Ñ সবকিছুই পুরাতন ও প্রচলিত। মধুসূদন এই কাব্যে কোনো কিছুই ভাঙেননি, ভাঙতে তার খুব বেশি যে আগ্রহ ছিল তাও নয়। তিনি অনেক কিছুই ভাঙতে পারতেন কিন্তু সেই ভাঙনের খেলা নিজে না খেলে ছেড়ে দিয়েছেন পাঠকের হাতে। পাঠকের উপরেই নির্ভর করে এই কাব্যের সার্থকতা-ব্যর্থতা। এক এক করে যদি আমরা কিছু নমুনা সংগ্রহ করি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ থেকে তাহলে দেখব এই কাব্য তৈরি হয়েছে প্রথাকে মেনে। প্রথার বিরুদ্ধে এই কাব্য এক পাও এদিক-সেদিক যায়নি। বলা হয়ে থাকে ‘রাক্ষস রাবণ’কে মানবীয় চরিত্রে চিত্রণ মধুসূদনের অমরকীর্তি। কিন্তু রাবণকে মানবীয় গুণে বিভূষিত না করেও যেই গুণগুলো মধুসূদন রাবণ চরিত্রে আরোপ করেছেন সেই গুণগুলোর জন্য রাক্ষস রাবণ কি আমাদের সহানুভূতি পেতে পারত না? বস্তু কখনোই গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো বস্তুগত গুণ। রাবণ কি রাক্ষস না মানুষ সেটা বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য হলোÑ যে রাবণকে তিনি তার কাব্যে নায়ক হিসেবে (যদিও নায়ক সমস্যা মেঘনাদবধ কাব্যে একটি বিতর্কিত বিষয়) অঙ্কন করেছেন সেই চরিত্রটি যথার্থভাবে বিকশিত হয়েছে কিনা। লঙ্কায় রাবণের পরিবার ছাড়া আর সকলেই কিন্তু রাক্ষসই রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, মধুসূদনও তার কাব্যেÑ রাবণকে ‘রাক্ষসেশ্বর’, ‘রাক্ষসপতি’, ‘রক্ষোদলপতি’ ইত্যাদি বলে সম্বোধন করেছেন। সুতরাং ‘রামায়ণে’ যে রাবণ রাক্ষস ছিল ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ও সে রাক্ষসই রয়ে গেছে। রামায়ণের রাক্ষস রাবণের জন্য আমাদের কোনো করুণা হয় না, কিন্তু মধুসূদনের রাক্ষস রাবণের জন্য আমাদের অন্তর করুণারসে সিক্ত হয়ে যায়। রামভক্ত বাল্মীকির দৃষ্টিতে ছিল দেবতা রামের মহিমা কীর্তন; কিন্তু রেনেসাঁস যুগের দাবি অনুযায়ী মধুসূদনের সৃষ্টিতে ছিল নতুন জীবনাকাক্সক্ষার সন্ধান। পৌরাণিক যুগের আরণ্যক স্বাপ্নিকের ভ্রান্ত দুঃস্বপ্নের মধ্যে মধুসূদন তার চিন্তাকে বদ্ধ না রেখে তিনি কামনা করছিলেন আধুনিক জীবনমান। এই জন্য পুরাণ দিয়েই তিনি পুরাণ ভাঙতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিজে সেই ভাঙনের মধ্যে না থেকে দায় চাপিয়েছেন পাঠকের উপর। যে পাঠক এই সত্যটুকু গভীর দৃষ্টি দিয়ে না দেখতে পারবে, তার পক্ষে এই অমর কাব্যের মর্মোদ্ধার প্রায় অপূর্ণ রয়ে যাবে।

মধুসূদন ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ যতগুলো চরিত্র এঁকেছেন এক কথায় সবগুলোই সার্থকতার আলোতে উদ্ভাসিত। যার যার জায়গায় সেই সেই চরিত্র দাঁড়িয়ে আছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে। কারো বলার উপায় নেই অমুক চরিত্রের অমুক ত্রুটি সেই চরিত্রের মহিমা ম্ল¬ান করে দিয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সবগুলো চরিত্রই পরাধীন। আপাত দৃষ্টিতে চরিত্রগুলোকে তেজোদীপ্ত, বলশালী, সর্বজয়ী মনে হলেও কেউই নিজের বলে বলীয়ান নয়Ñ পরোক্ষ শক্তির উপর নির্ভরশীল। রাম নিজেই ভগবানের অবতার, তবু লক্ষ্মণের প্রাণ ভিক্ষার জন্য তাকে যেতে হয় প্রেতপুরীতে। রাবণ যদিও অপরাজেয় যোদ্ধা কিন্তু তবু তিনি বিষ্ণুর বরপ্রার্থী। ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদ সেও তার শক্তির জন্য নির্ভরশীল নিকুম্ভিলা যজ্ঞের উপর। এত সুন্দর যে প্রমীলা সেও অসহায় মেঘনাদের বিরহভারে।

আসলে প্রতিটি চরিত্রের ভেতর দিয়ে মধুসূদন দেখাতে চেয়েছেনÑ গ্রিক ট্র্যাজেডিতে যার নাম ‘নিয়তিবাদ’ ভারতীয় পুরাণে তা-ই দেখা দিয়েছিল ‘ঈশ্বরবাদ’ হয়ে। দুটি জিনিস মূলত একই। তবে দুই রকমের পাত্রে থাকার ফলে দুই রকম রঙ ধারণ করেছে। কেউ যদি বলার চেষ্টা করেন মধুসূদন ‘ধর্মদ্রোহী’ বা ‘ঈশ্বরদ্রোহী’ ছিলেন তাহলে বোধহয় বলা উচিত তিনি কিছুতেই ‘দ্রোহ’ প্রকাশ করেননি। তবে দ্রোহ প্রকাশের জায়গাগুলো তিনি শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। সেই চিহ্নিত জায়গায় আঘাত করাই বর্তমান পাঠকের কাজ।

‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র নবম সর্গ নিঃসন্দেহে অশ্রুধৌত। এই সর্গের কবিদত্ত নাম ‘সংস্ক্রিয়া’, ‘সংস্ক্রিয়া’ শব্দের অর্থ সংস্কার কাজ বা পরিমার্জন ক্রিয়া। সর্গ শিরোনাম দেখেই বুঝা যায় এখানে মূলত রক্ষো-কুল-গৌরব-তিলক মৃত মেঘনাদের সৎকার ক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। মৃতের সৎকার সর্বধর্মেই পালনীয়। কিন্তু যেই বিষয়টি আধুনিক পাঠককে সবচেয়ে বেশি আহত করে তাহলো দানবনন্দিনী-রক্ষোকুল-বধু মেঘনাদপতœী-প্রমীলার ‘সহমরণ’। মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশের একত্রিশ বছর আগে রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩১) হিন্দু সমাজে প্রচলিত সহমরণ প্রথা (সতীদাহ প্রথা) রোধ করার জন্য হিন্দু শাস্ত্রসম্মত যুক্তি উপস্থাপন করেন। লর্ড বেন্টিংক ৪ ডিসেম্বর ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কেন মধুসূদনের মতো একজন আধুনিক রুচিসম্মত মানুষ প্রমীলাকে সহমরণ দিতে বাধ্য হলেন এ প্রশ্ন অনেকের মনেই উত্থাপিত হয়।

অনেক চিন্তা ভাবনা করেই মধুসূদন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেননা ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ একটি শব্দও অবান্তর আবেগে উচ্চারিত হয়নি। সেখানে রহিত হয়ে যাওয়া পুরাতন প্রথাকে টেনে এনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করা মধুসূদনের উদ্দেশ্য নয়। মধুসূদনের উদ্দেশ্য ছিল পাঠকের বোধে নাড়া দিয়ে সুপ্ত চিন্তাকে উজ্জীবিত করা। মেঘনাদের মৃত্যুর পরে প্রমীলার সামনে আর কি কি বিকল্প থাকতে পারত যদি আমরা হিসেব করে দেখিÑ তাহলে দেখবÑ (১) পতিহত্যার প্রতিশোধার্থে যুদ্ধে গমন, প্রাণ ত্যাগ অথবা যুদ্ধবন্দী জীবন, (২) দ্বিতীয় পতি গ্রহণ বা বিধবা জীবনযাপন, (৩) আত্মহত্যা। কিন্তু এই বিকল্পগুলোর একটিও কি পাঠককে এতটা নাড়া দিত যতটা নাড়া দেয় প্রমীলার স্বেচ্ছায় চিতারোহণ। প্রমীলার সহমরণে মধুসূদন তিনটি কাজ খুব সচেতনভাবে করেছেনÑ (১) হিন্দু শাস্ত্রের নির্মম কুসংস্কারের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ, (২) প্রথানুসরণ, (৩) পাঠকের মনে নানামুখী প্রশ্নের জন্মদান বা চিন্তাশক্তির বিকাশ।

আমি পূর্বেই বলেছি মধুসূদন ছিলেন নমুনাসংগ্রাহক। তিনি কোনো কিছুই ভাঙেননিÑ তবে সবকিছুকেই ভাঙার উপযোগী করে রেখে গেছেন উত্তরসূরিদের জন্য। কেন মধুসূদন ভাঙতে পেরেও কোনো কিছু ভাঙলেন না এই প্রশ্ন উত্থাপিত হলে বলতেই হয়Ñ মাইকেল মধুসূদন দত্ত জানতেনÑ সামনে এমন দিন আসছে সে যুগে সবকিছুই ভেঙে চৌচির হয়ে যাবে। তখন সবাই শুধু ভাঙতে চাইবে কিন্তু কি ভাঙবে, কেন ভাঙবে তা বুঝবে না। তাই তিনি ছন্দ ভেঙেছেন, চরিত্র ভেঙেছেন, ভাষা ভেঙেছেনÑ কিন্তু প্রথা ভাঙেননি। এক জীবনে মধুসূদন প্রথা ভাঙার কম চেষ্টা করেননি। প্রথা ভাঙতে গিয়ে যেটুকু বদনাম তিনি নিজের জীবনে সঞ্চয় করেছেনÑ ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ রচনা করে তারচেয়ে বহুগুণ সুনাম তিনি অর্জন করেছেন। মধুসূদনের চরিত্রে ভাঙার অহংকার ছিল, মানার বিষয় ছিল না। কিন্তু যখন তিনি বুঝলেন মনুষ্যসমাজ ভাঙার চেয়ে মানতেই বেশি ভালোবাসে তখন তিনি মানুষের রুচিকে সরাসরি আঘাত না করে এমন এক কৌশল অবলম্বন করেন যা কেবল তারাই বুঝবে যারা তাঁর বিপ্লবী চিন্তার ভাষা বুঝতে সক্ষম।

‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ পৃথিবীর সকল শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যের মাধুর্য আছে। সেই মাধুর্যকে কৃপণ বা ক্ষীণদৃষ্টির মানুষেরা বলেন ‘ঋণ’। উন্মুক্ত প্রকৃতিতে ফুলের বক্ষ থেকে ভ্রমর ‘মধু’কে ঋণ হিসেবে নেয় না, বায়ু প্রবাহের কাছেও ঋণী নয় সমুদ্রের ঊর্মিমালা। চাঁদ ঋণী রাতের কাছে, নাকি চাঁদই ঋণী করেছে রাতকে? এ প্রশ্ন যেমন অপ্রাসঙ্গিক, তদ্রƒপ শিল্পরাজ্যেও ‘ঋণ’ শব্দটি পরিত্যাজ্য। মধুসূদন সেই কবি যে কবিকে সৃষ্টির জন্য কারো কাছে ঋণ নিতে হয় না। তিনি নিজেই ছিলেন এক মহান দাতা। ভারতবর্ষের তো নয়ই, পৃথিবীর খুব কম কবিই আছেন বিশ্বসাহিত্যে যার দখল মধুসূদনের সমপর্যায়ে।

শুধু কবি হওয়ার জন্য তেরো-চৌদ্দটি ভাষা পৃথিবীর আর কোনো কবি স্বেচ্ছায় আয়ত্ত করেছিলেন বলে খুব একটা চোখে পড়ে না। যে কবি বিশ্ব সাহিত্যের অপার সৌন্দর্য সব সময় মাথায় নিয়ে বেড়িয়েছেন তার কাছে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ রচনা একই সাথে সামান্য ও অসামান্য ঘটনা। সামান্য এই অর্থে যে এই কাব্যটিতেই স্থান পেতে পারত নতুন জীবন প্রত্যাশী বাঙালি জাতির জীবনমান ও সংস্কৃতি। এই কাব্যটিতে নির্মিত হতে পারত বাঙালি জাতির রুচিবোধ। কিন্তু সেই ধীর-স্থির মনোযোগ থেকে এই কাব্যটি বঞ্চিত। অসামান্য এই অর্থে যে ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ যা কিছু আছে তা-ই আগামী দিনের কবি ও কবিতার জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে। কাব্য-রচনা আবেগের বিষয় নয়, চর্চা ও চিন্তার বিষয়Ñ এই কথাটাই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অমূল্য সম্পদ অনুসন্ধান করে খুঁজে এনেছেন মধুসূদন। এ যুগের আধুনিক কবিরা সেই অনুসন্ধানের পথেই অক্লান্ত পরিব্রাজক। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ রূপকে, প্রতীকে, উপমায়, চিত্রকল্পে অনেক কথাই বলেছেনÑ সেগুলোকে খুঁজে বের করে যথার্থ ব্যাখ্যাদানই এ সময়ের গবেষক ও পাঠকের দায়। এ দায় আমাদের নিতেই হবে। মহাবিদ্রোহী পূর্বসূরির জন্য অনুসন্ধানী উত্তরসূরিকে এই অমূল্য শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করা অবশ্য কর্তব্য।

syedjahidhasan29@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed.