রেকর্ড ব্যবধানে শ্রীলংকাকে হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে বাংলাদেশ

29

ঢাকা : ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে তৃতীয় ম্যাচে শ্রীলংকাকে ১৬৩ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে স্বাগতিক বাংলাদেশ। নিজেদের ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে রান বিবেচনায় সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড গড়লো টাইগাররা। বাংলাদেশের আগের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয় ছিলো ১৬০ রানে। এর আগে ২০১২ সালে খুলনায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই জয় তুলে নিয়েছিল টাইগাররা।

আজ এই জয় দিয়ে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের শ্রীলংকাকে লজ্জার হার উপহার দিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে পৌঁছে গেল টাইগাররা। লিগ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়েকে ৮ উইকেটে হারানোয় ২ খেলায় ১০ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে বাংলাদেশ। আর ২ খেলায় অংশ নিয়ে জিম্বাবুয়ে ৪ ও শ্রীলংকার সংগ্রহ শূন্য পয়েন্ট ।

টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচের মত আজও টস ভাগ্যে জয় পান বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঐ ম্যাচে প্রথমে বোলিং করলেও এবার প্রথমে ব্যাট করার সিদ্বান্ত নেন তিনি। অধিনায়কের সিদ্বান্তকে যথার্থ প্রমাণ করেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও আনামুল হক বিজয়।

শ্রীলংকার বোলারদের বিপক্ষে মারমুখী মেজাজে ছিলেন বিজয়। তাই বিজয়ের ব্যাটে চড়েই রানের চাকা ঘুড়ছিলো বাংলাদেশের। অন্যপ্রান্তে ব্যাট হাতে খানিকটা মন্থর ছিলেন তামিম। মূলত বিজয়কে সঙ্গ দিতেই নিজেকে সংযত রেখেছিলেন তিনি। তাই রান তোলার গতি ধরে রেখে ১০ ওভারে বিনা উইকেটে দলের রান ৫০ রানে নিয়ে যান তামিম-বিজয়।

Bangladesh’s Shakib Al Hasan, right, and teammate Tamim Iqbal run between the wickets during the Tri-Nation one-day international cricket series against Sri Lanka in Dhaka, Bangladesh, Friday, Jan. 19, 2018.

তবে দলীয় ৭১ রানে বিচ্ছিন্ন হতে হয় তামিম-বিজয়কে। ৩টি চার ও ১টি ছক্কায় ৩৭ বলে ৩৫ রান তুলে শ্রীলংকার মিডিয়াম পেসার থিসারা পেরেরার শিকার হন বিজয়। এরপর ক্রিজে তামিমের সঙ্গী হন সাকিব আল হাসান।আগের ম্যাচেও উইকেটে জমে গিয়েও নিজেদের জুটির রান বড় করতে পারেননি তামিম ও সাকিব। তবে এবার নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করেছেন দুই বন্ধু তামিম ও সাকিব। প্রতিপক্ষ বোলারদের বিপক্ষে মারমুখী মেজাজেই ছিলেন তারা। এ জুটির কল্যাণেই বড় সংগ্রহের ভীত পেয়ে যায় বাংলাদেশ।

দলকে ভালো অবস্থায় নিতে গিয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৪০তম ও শ্রীলংকার বিপক্ষে চতুর্থ হাফ-সেঞ্চুরির স্বাদ নেন তামিম। সেঞ্চুরির পথে এগোতে তিনি। কিন্তু আগের ম্যাচের স্কোরেই থেমে যেতে হয় তাকে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আগের ম্যাচে ৮৪ রানে অপরাজিত থাকলেও এবার ঐ স্কোরেই থেমে যেতে হয় তাকে। ৭টি চার ও ২টি ছক্কায় ১০২ বলে নিজের ইনিংস সাজান তামিম। সাকিবের সাথে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ৮৬ বলে ৯৯ রান যোগ করেন তামিম। সেখানে তার অবদান ছিলো ৫০ বলে ৫৪ এবং সাকিবের সংগ্রহ ছিলো ৩৬ বলে ৪০ রান।

Bangladesh’s Mustafizur Rahman (R) plays a shot as Sri Lanka’s Niroshan Dickwella looks on during the third one day international (ODI) cricket match in the Tri-Nations Series between Bangladesh and Sri Lanka at the Sher-e-Bangla National Cricket Stadium in Dhaka on January 19, 2018.

দলীয় ১৭০ রানে তামিমের বিদায়টা ক্ষতি করেনি বাংলাদেশকে। কারণ সাকিব ও মুশফিকুর রহিম দলের স্কোর সচল রাখেন। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৩৬তম ও শ্রীলংকার বিপক্ষে ষষ্ঠ হাফ-সেঞ্চুরি তুলেও নেন সাকিব। তবে ৬৭ রানে গিয়ে থামতে হয় সাকিবকে। ৭টি চারের সহায়তায় নিজের ৬৩ বলের ইনিংসটি সাজান তিনি।

সাকিবের বিদায়ের মাহমুুদুল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে চতুর্থ উইকেটেও হাফ-সেঞ্চুরির জুটি গড়েন মুশফিকুর। মাত্র ৪৪ বল মোকাবেলা করে ৫০ রান যোগ করেন তারা। ২টি চার ও ১টি ছক্কায় ২৩ বলে ২৪ রান করে মাহমুদুল্লাহ ফিরে গেলেও, দলকে বড় স্কোরের পথেই রেখেছিলেন মুশফিকুর।

কিন্তু শ্রীলংকার পেরেরার দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে ৬২ রানেই থেমে যান মুশফিক। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ২৮তম ও শ্রীলংকার বিপক্ষে দ্বিতীয় হাফ-সেঞ্চুরি পাওয়া ইনিংসে ৫২ বল মোকাবেলায় ৪টি চার ও ১টি ছক্কা মারেন মুশি।
মুশফিকুরের আউটের পর উইকেট গিয়ে দ্রুতই বিদায় নেন মাশরাফি ও নাসির হোসেন। ম্যাশ ৬ ও নাসির শুন্য হাতে ফিরেন। তবে শেষদিকে ১২ বলে ২৪ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলে বাংলাদেশকে ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ৩২০ রানে পৌঁছে দেন হার্ড-হিটার সাব্বির রহমান। এই নিয়ে দ্বাদশবারের মত তিনশ’ বা ততোধিক দলীয় রান সংগ্রহ করলো বাংলাদেশ। শ্রীলংকার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ।

Bangladesh cricketer Shakib Al Hasan plays a shot during the third one day international (ODI) cricket match of the Tri-Nations Series between Bangladesh and Sri Lanka at the Sher-e-Bangla National Cricket Stadium in Dhaka on January 19, 2018.

সাব্বিরের ছোট্ট ইনিংসে ৩টি চার ও ১টি ছক্কা ছিলো। অন্যপ্রান্তে ৫ বলে ৬ রানে অপরাজিত ছিলেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। শ্রীলংকার পেরেরা ৩টি ও ফার্নান্দো ২টি উইকেট নেন।

জয়ের জন্য ৩২১ রানের বড় টার্গেটে খেলতে নেমে ইনিংসের তৃতীয় ওভারেই প্রথম উইকেট হারিয়ে বসে শ্রীলংকা। অবশ্য আগের ওভারেই উইকেট শিকার করে ফেলেছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। কিন্তু রিভিউ নিয়ে ঐ যাত্রায় বেঁচে যান লংকান ওপেনার উপুল থারাঙ্গা। তবে উইকেট শিকারের আনন্দে মাততে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি বাংলাদেশকে। নাসিরের ঘুর্ণিতে সামলাতে না পেরে মাত্র ১ রানে বোল্ড হয়ে ফিরে যান কুশল পেরেরা।

এরপর দ্বিতীয় উইকেটে দলকে টেনে নেয়া চেষ্টা করেন থারাঙ্গা ও কুশল মেন্ডিস। কিন্তু জুটিতে ৪১ রানের বেশি যোগ করতে পারেননি তারা। বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফির ডেলিভারিতেই ফিরতে হয় থারাঙ্গাকে। ৩৫ বলে ২৫ রান করে মাহমুদুল্লাহকে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন থারাঙ্গা।

থারাঙ্গাকে তুলে নেয়ার পর মেন্ডিসকে শিকার করেন মাশরাফি। ১৯ রান করেন মেন্ডিস। ৬২ রানে তৃতীয় উইকেট হারানোর পর ঘুড়ে দাড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেও সফল হয়নি শ্রীলংকার ব্যাটসম্যানরা। কারণ বাংলাদেশ বোলারদের নৈপুণ্যে শ্রীলংকার পরের দিকের ব্যাটসম্যানদের কেউই বড় ইনিংস খেলতে পারেনি। ফলে ৩২ দশমিক ২ ওভারে ১৫৭ রানেই গুটিয়ে যায় শ্রীলংকার ইনিংস।

Bangladesh’s Tamim Iqbal plays a shot during the Tri-Nation one-day international cricket series against Sri Lanka in Dhaka, Bangladesh, Friday, Jan. 19, 2018.

পরের দিকে দলের পক্ষে থিসারা পেরেরা ১৪ বলে ২৯ ও অধিনায়ক দিনেশ চান্ডিমাল ২৮ রান করেন। বাংলাদেশের সাকিব ৩টি, মাশরাফি ও রুবেল ২টি করে উইকেট নেন। ম্যাচের সেরা হয়েছেন বাংলাদেশের সাকিব।আগামী ২৩ জানুয়ারি ফিরতি লিগে জিম্বাবুয়ের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। আর ২১ জানুয়ারি ফিরতি লিগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামবে শ্রীলংকা।

বাংলাদেশ ইনিংস :
তামিম ইকবাল ক ডিকবেলা ব ধনঞ্জয়া ৮৪
এনামুল হক ক ডিকবেলা ব থিসারা পেরেরা ৩৫
সাকিব আল হাসান ক এন্ড ব গুনারতেœ ৬৭
মুশফিকুর রহিম বোল্ড ব থিসারা পেরেরা ৬২
মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ক থিসারা পেরেরা ব প্রদীপ ২৪
সাব্বির রহমান অপরাজিত ২৪
মাশরাফি বিন মর্তুজা ক ধনানঞ্জয়া ব প্রদীপ ৬
নাসির হোসেন এলবিডব্লু ব পেরেরা ০
মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন অপরাজিত ৬
অতিরিক্ত (বা-৪, লে বা-১, ও-৭) ১২
মোট (৭ উইকেটে, ৫০ ওভার) ৩২০
উইকেট পতন : ১/৭১ (এনামুল), ২/১৭০ (তামিম), ৩/২২৭ (সাকিব), ৪/২৭৭ (মাহমুদুল্লাহ), ৫/২৮৪ (মুশফিক), ৬/২৯৭ (মাশরাফি), ৭/২৯৮ (নাসির)।
শ্রীলংকা বোলিং :
লাকমল : ৯-০-৬০-০ (ও-১),
ফার্নান্দো : ১০-০-৬৬-২ (ও-১),
ধনঞ্জয়া : ১০-০-৪০-১ (ও-২),
পেরেরা : ৯-০-৬০-৩ (ও-৩),
গুনারতেœ : ৫-০-৩৮-১,
ডি সিলভা : ৭-০-৫১-০।
শ্রীলংকা ইনিংস :
কুশল পেরেরা বোল্ড ব নাসির ১
থারাঙ্গা ক মাহমুদুল্লাহ ব মাশরাফি ২৫
কুশল মেন্ডিস ক রুবেল ব মাশরাফি ১৯
নিরোশান ডিকবেলা বোল্ড ব মুস্তাফিজুর ১৬
দিনেশ চান্ডিমাল রান আউট (সাকিব) ২৮
আসেলা গুনারত্নে ক সাইফউদ্দিন ব সাকিব ১৬
থিসারা পেরেরা ক মাহমুদুল্লাহ ব সাকিব ২৯
হাসারাঙ্গা ডি সিলভা ক মুশফিকুর ব সাকিব ০
আকিলা ধনঞ্জয়া ক সাকিব ব রুবেল ১৪
সুরাঙ্গা লাকমল বোল্ড ব রুবেল ১
ফার্নান্দো অপরাজিত ০
অতিরিক্ত (লে বা-৬, নো-১, ও-১) ৮
মোট (অলআউট, ৩২.২ ওভার) ১৫৭
উইকেট পতন : ১/২ (পেরেরা), ২/৪৩ (থারাঙ্গা), ৩/৬২ (মেন্ডিস), ৪/৮৫ (ডিকবেলা), ৫/১০৬ (চান্ডিমাল), ৬/১১৭ (গুনারতেœ), ৭/১১৭ (ডি সিলভা), ৮/১৫০ (পেরেরা), ৯/১৫২ (লাকমল), ১০/১৫৭ (ধনঞ্জয়া)।
বাংলাদেশ বোলিং :
নাসির হোসেন : ৪-০-২০-১,
মাশরাফি বিন মর্তুজা : ৮-১-৩০-২ (নো-১),
রুবেল হোসেন : ৫.২-০-২০-২ (ও-১),
মুস্তাফিজুর রহমান : ৫-০-২০-১,
সাকিব আল হাসান : ৮-১-৪৭-৩,
মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন : ২-০-১৪-০।
ফল : বাংলাদেশ ১৬৩ রানে জয়ী।
ম্যাচ সেরা : সাকিব আল হাসান (বাংলাদেশ)।

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed.