khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

প্রশাসন নির্ভর রাজনীতি : সংস্কৃতির ভগ্নদশা, আস্কারা পাচ্ছে মৌলবাদ

0 329

সৈয়দ জাহিদ হাসান : সংস্কৃতির চর্চা বলতে শুধু নাচ-গানের চর্চাকেই বোঝায় না। ‘সংস্কৃতি’ কথাটার মানে আরো ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের দেশে বর্তমানে সংস্কৃতির পরিচর্যা শূন্যের কোটায় এসে পৌঁছেছে এ কথা বললে কে কি বলবেন জানি না তবে এ কথাই এখন চরমসত্য। কোণঠাসা হতে হতে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গন এই মুহূর্তে এতটাই রুগ্ন যে কোনো চিকিৎসা দিয়েই আর তাকে স্বাস্থ্যবান করা যাবে না বলেই কোনো কোনো সংস্কৃতিকর্মীর দৃঢ় বিশ্বাস। কেন এমন হলো? কারা পরিকল্পনা করে হত্যার জন্য বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছে বাঙালি জাতির সংস্কৃতিকে? সংস্কৃতিকে কৌশলে হত্যা করে কারা এদেশে মৌলবাদের বীজ বুনতে চায়? মৌলবাদ বিস্তারে যারা মূলধন বিনিয়োগ করছেÑ তারা কারা? এগুলোর অনেকটাই মীমাংসিত প্রশ্ন। কিন্তু মীমাংসিত হলেও তা জনসমক্ষে উচ্চারণ করা বিপদজনক। কেননা তাতে প্রাণ হারানোর সম্ভাবনা শত ভাগ।

বাংলাদেশের মানুষ মিথ্যা রটনাকে ভীষণ গুরুত্ব দেয়। একবার কোনো কথাকে একটু কায়দা করে প্রচার করতে পারলেই হলো তাহলেই তা জনশ্রুতিতে রূপ নেয় এবং এই জনশ্রুতি কতটা জীবনঘাতী হতে পারে তার প্রমাণ আছে। মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায় ও তাঁকে চাঁদে দেখার গুজবে। সাঈদীকে যে চাঁদে দেখা যেতে পারে না, দেখার কোনো যৌক্তিক কারণও নেই এ কথা হুজুগে বাঙালির মাথায় আসেনি। সেদিন একটি মিথ্যা রটনায় ভর করে সমগ্র বাংলাদেশে যে বিশৃঙ্খল ও প্রাণঘাতী সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল মৌলবাদী গোষ্ঠী এদেশের মানুষ তা কোনোদিন ভুলবে না।

বিশুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চায় মানুষের চেতনার সুপরিবর্তন হয়। ধর্মান্ধতা তখনই লোপ পায় যখন মানুষ যুক্তিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক ও ধর্মনিরপেক্ষ আচরণে অভ্যস্ত হয়। বাংলাদেশে একসময় ঘরে ঘরে সংস্কৃতি চর্চা হতো। পুঁথিপাঠ, লাঠিখেলা, পশুর লড়াই, গান-বাজনা, যাত্রা-নাটক, ধামাইল, আড়ং ঋতু ভেদে এগুলো সারা বছরই উপভোগ করা যেতো। আমি আমার শৈশবে কাউলিবেড়া, মালী গ্রাম ও আজিমনগর বাজারে ১৫দিন  ১ মাস ব্যাপী যাত্রা উৎসব দেখেছি। ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ, ২১ ফেব্রুয়ারি উপভোগ করেছি চেখ জুড়ানো মন ভোলানো নাটক। ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প। ত্রিশ বছর আগে যেসব জায়গায় বাউল গান, বিচার গান, যাত্রা-নাটক, কবির লড়াই, সার্কাস হতো এখন সেখানে মহাসমারোহে আয়োজিত হয় ইসলামী জলসার নামে মৌলবাদে উদ্বুদ্ধকরণ মহড়া দেওয়া হয় সংস্কৃতিবিরোধী জিহাদি বক্তৃতা। রবি-নজরুলকে প্রকাশ্যে কাফের মুরতাদ বলা হয়।

বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ৩০ বছর আগেও মসজিদ খুব কমই দেখা যেতো। আরবি বাত-চিত শোনা যেত না। তখনকার দিনে বেশিরভাগ নামাজি ছিলেন কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়া কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষ। এই নিরক্ষর নামাজিরা জুম্মার নামাজই শুধু জামায়াতে পড়ার চেষ্টা করতো। জুম্মার নামাজ ছাড়া অন্য ওয়াক্তের নামাজ একা একা ঘরের মধ্যেই সেরে নিতো। আমার বাবা-মাকে চিরদিন এভাবেই দেখেছি। নিরক্ষর গ্রামবাসীরা নামাজি হলেও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে তাদের ছিল প্রচ- আগ্রহ। তারা নামাজও পড়তো, আবার রাতভর গান-বাজনাও শুনতো। সে সময়ে গ্রামীণ পরিবেশে ধর্মে আর সংস্কৃতিতে তেমন কোনো সংঘর্ষ আমার চোখে পড়েনি। আজকের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। শুধু আলাদাই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভীষণ মারমুখী। বিশেষ করে যেসব নিরক্ষর বা কমশিক্ষিত যুবক তথাকথিত ধর্মকর্মে নিয়োজিত তারা আপাদমস্তক আগ্রাসী। কেন এমন হচ্ছেÑ তার কিছু কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। এগুলো জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে ঘুরে সনাক্ত করা। মাঠ পর্যায়ের কোনো গবেষণার যদি মূল্য থাকে তাহলে আমার এই ক্ষেত্রসমীক্ষাও মূল্য পাবে বলেই আমার বিশ্বাস।

সব প্রগতিশীল মানুষেরই ধারণা আওয়ামী লীগ সরকার ‘সংস্কৃতি-বান্ধব’ সরকার। এই সরকারের আমলে বাংলার সংস্কৃতি চাঙ্গা হয়। মূল্য পায় সংস্কৃতি-কর্মীরা। এ কথার সত্যতা এক সময় ছিল কিনা জানি না, তবে আজকের বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ‘সংস্কৃতি-বান্ধব’ চরিত্র প্রচার শুধুই কথার কথা। বর্তমানে অবাধ সংস্কৃতি-চর্চা মোটেই সহজ কাজ নয়। যারা সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত কেবল তারাই জানেন কতটা মুমূর্ষু অবস্থায় আছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি। উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ২০১৭ সালের ১৩ থেকে ১৭ এপ্রিল বাংলা একাডেমি চতুর্থ সামার স্কুল আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপের আয়োজন করে। এই ওয়ার্কশপে ১৭ জন প্রশিক্ষণার্থী ফোকলোর বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৭ জনের মধ্যে আমিও ছিলাম। আমাদের প্রশিক্ষক ছিলেন দেশ-বিদেশের নামকরা ফোকলোর বিশেষজ্ঞগণ। সরকারের দুই-একজন মাননীয় মন্ত্রীও এসেছিলেন ওয়ার্কশপের উদ্বোধনী ও সমাপনী দিনে। সামার স্কুলের ক্ষেত্র সমীক্ষার কাজে নরসিংহদী যেতে হয় আমাদের। ওখানে গিয়ে আমরা যাত্রা দেখি এবং যাত্রাশিল্পীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। যাত্রাশিল্পীদের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে আমরা এমন এমন গোপন তথ্য পাইÑ যা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি।

সাক্ষাৎকার প্রদানকালে যাত্রাশিল্পী, যাত্রার আয়োজক ও সাজঘরের মালিকগণ বলছিলেনÑ মানুষ যাত্রা দেখতে চায় কিন্তু প্রশাসনের বাধায় মানুষ যাত্রা দেখতে পারছে না। যাত্রা উৎসবের আয়োজন করতে গেলে বর্তমানে যে পরিমাণ প্রশাসনিক বাধা আসে, তা অতিক্রম করা হিমালয় ডিঙানোর চেয়েও কঠিন। অথচ কিছুদিন আগেও তা ছিল না। একই কথার প্রতিধ্বনি পেয়েছি যশোর মনিরামপুরের যাত্রাভিনেত্রী পারুলের কণ্ঠে। তিনিও অভিযোগ করেন, এদেশে ইচ্ছে করলেই ধর্মীয় মোড়কে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানো যায়, জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করা যায়, কিন্তু মানুষের মাঝে দেশপ্রেমিক সিরাজদ্দৌলা, ক্ষুদিরাম বসু, সূর্যসেন বা লালন ফকিরের কথা বলা যায় না। মানুষ এগুলো শুনতে চায়, বুঝতে চায়, কিন্তু এগুলো শোনাতে গেলে পদে পদে আসে প্রশাসনিক বাধা। শত শত বাধার মধ্যে বন্দি হয়ে পড়েছে আমাদের সংস্কৃতি। ভেড়ামারার জীবন বাউল ও কিরণ বাউলের সঙ্গে ১লা কার্তিক (১৪২৪) কথা হলো ছেঁউড়িয়ায়। তারা দুজনেই বললেনÑ টেলিভিশনে বাউল গান, যাত্রা গান, পালাগান শুনে যদি ভাবেন এদেশের সংস্কৃতির অবস্থা খুব ভালো তাহলে ভুল করবেন। বর্তমানে বাংলার লোকসংস্কৃতি যে কি পরিমাণ নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যে আছে তা বলে বোঝানো যাবে না। তারা বলেনÑ বাংলাদেশে এখন ভালো আছে মৌলবাদ। যারা মৌলবাদ প্রচার করে তাদের কোথাও কোনো সমস্যা নেই। তারা টেলিভিশন-রেডিওতে আছে, আবার পাড়া-মহল্লা-শহরে-বন্দরেও আছে। এখন বাউল গানেও সরকারের অনুমতি লাগে, মাইক বাজানোর পারমিশন নিতে হয়, কিন্তু মৌলবাদীদের অনুষ্ঠানে চল্লিশ প্রহর, পঞ্চাশ প্রহর মাইক বাজানোর কোনো অনুমতি লাগে না। থানায়ও যোগাযোগ করতে হয় না। খুব আফসোস করেই কথাগুলো বলছিলেন জীবন আর কিরণ।

নারায়ণগঞ্জের সস্তাপুরে ‘বারামখানা’ নামে একটা বাউল আশ্রম আছে। সেখানে পাঁচ-ছদিন আগে বর্ষীয়ান রাজন ফকিরের সঙ্গে কথা হলোÑ তিনি বললেন, সৌদি আরব বুঝেছে কিন্তু বাংলাদেশ বুঝতে পারছে না। অথচ আমরাই আজ শিল্প-সাহিত্যে-মানবিকতায়-আধুনিকতায় সেরা হতে পারতাম যদি উদার মনে বাংলায় সংস্কৃতিকে বাংলার মানুষের হাতে ছেড়ে দিতাম। আইন দিয়ে, ক্রশফায়ার দিয়ে জঙ্গি-মারা যাবে কিন্তু মৌলবাদ রুখা যাবে না। মৌলবাদ রুখতে হলে সংস্কৃতিকে অবাধ করে দিতে হবে। মতবাদের বিপক্ষে মতবাদ দিয়েই লড়তে হয়। বাঙালি সংস্কৃতিকে অবরুদ্ধ করে মৌলবাদ নির্মূলের নামে সরকার যে নাটক করছে তা আসলে এক রকমের প্রহসন। আওয়ামী লীগের আমলে বাংলার মানুষ এই প্রহসন দেখতে চায়নি কিন্তু সারা বাংলাদেশে এখন এই প্রহসনই মঞ্চস্থ হচ্ছে। সংস্কৃতির প্রচার-প্রসার উন্মুক্ত করে দিলে মানুষ দেশপ্রেমিক হবে, মানববাদী হবে, সহনশীল হবে। সর্বোপরি আওয়ামী লীগেরই লাভ হবে। নিরাপত্তার ভয় দেখিয়ে সংস্কৃতির বিস্তারে আওয়ামী লীগ বাধার সৃষ্টি করেছে। এই জন্য তাকে পরিণামে দুঃখ পেতে হবে। যারা অন্ধধার্মিকÑ তারা কোনোদিন আওয়ামী লীগকে ভোট দেয় না, ভবিষ্যতেও দিবে না। এদের সংখ্যা যাতে আর বাড়তে না পারে সেই জন্য এখনই সংস্কৃতিমান, প্রগতিশীলদের বেশি বেশি গ্রামে-গঞ্জে-শহরে ছড়িয়ে পড়া দরকার। শুধু উন্নয়নের ভাষণ দিলে হবে না। শিকড় কাটা গাছ বেশি দিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। নিজস্ব সংস্কৃতির শিকড় কেটে দিয়ে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটিয়ে উন্নয়নের সড়কে বেশি দিন টিকে থাকা যাবে না। সড়কে যেকোনো সময় ফাটল ধরবে। ইরাক, সিরিয়া, মিশরের দিকে তাকান, ওখানে যা হচ্ছে এখানেও একদিন তাই হবে। শুধু রাজন ফকির নয়। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে এরকম ক্ষোভ আছে। আওয়ামী লীগ সরকার যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন চানÑ তাহলে তাকে একই সঙ্গে দুটো কাজ করা এখন ভীষণ জরুরি। এক. দৈশিক অবকাঠামো তথা জীবনমান উন্নতকরণ, দুই. বাঙালি-সংস্কৃতি বিস্তারে সর্বশক্তি নিয়োগ তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদে জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ। রবিবার পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্চারিত প্রতিপাদ্য হলোÑ ‘জঙ্গিবাদ মাদকের প্রতিকার, বাংলাদেশ পুলিশের অঙ্গীকার।’ কথা হলো জঙ্গিবাদ ও মাদককে নিয়ন্ত্রণ কেবল পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সংস্কৃতির বিকাশ না ঘটিয়ে মানুষের মধ্যে জঙ্গিবাদ জিইয়ে রাখার ব্যবস্থা করে কখনোই জঙ্গিবাদ দমন সম্ভব নয়। বিশুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা করার সুযোগ করে দিলে দেশ থেকে জঙ্গিবাদ ও মাদক এমনিতেই নির্মূল হয়ে যাবে। যারা অপরাধ বিশেষজ্ঞ তারা অন্তত এমনটাই মনে করেন। কিন্তু যে ওঝা ভূত তাড়াবে তাকেই যদি ভূতে পায়, তাহলে ভূত ছাড়াবে কে?

লেখক : কবি ও কথাশিল্পী।
syedjahidhasan29@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply